বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ গ্রেপ্তার

গত ২৫ বছর ধরে ভারতে পালিয়ে ছিলেন ফাঁসির সেলে রাখা হয়েছে, রায় কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

46

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে পলাতক অন্যতম আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, মঙ্গলবার ভোর আনুমানিক ৩টার দিকে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিস) ইউনিটের একটি বিশেষ দল মিরপুর সাড়ে ১১ এলাকা থেকে মাজেদকে গ্রেপ্তার করে।
দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তোলা হলে বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত এই দন্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। খবর বিডিনিউজের
সে সময় এজলাসে উপস্থিত আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, আদালতে মাজেদের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবী ও পাজামা। তার ওপরে বুলেট প্রূফ ভেস্ট ও মাথায় হেলমেট ছিল। কঠগড়ায় তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়নি।
আদালতে কোনো আইনজীবী মাজেদের পক্ষে দাঁড়াননি বলে জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার জাফর হোসেন। তিনি বলেন, আদালতের আদেশের পরপরই মাজেদকে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগে সকালে আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
মাজেদ ভারতে পালিয়ে আছেন বলে এর আগে বিভিন্ন সময়ে খবর এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। তাকে সেখান থেকে পাঠানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাকে বাংলাদেশেই পেয়েছি। হয়ত করোনার ভয়ে চলে এসেছে।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এরপর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে এই হত্যাকান্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারের পথ খোলে। মামলার পর বিচার শুরু হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর ফের শ্লথ হয়ে যায় মামলার গতি।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে দন্ডিত পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হয় সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি)।
কিন্তু ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া ছয় আসামি বিদেশে পলাতক থাকেন। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোল থেকে রেড নোটিশ জারি করে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করা হচ্ছিল।
এরা হলেন- খন্দকার আবদুর রশিদ, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান।
এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নূর চৌধুরীর কানাডায় অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা সরকার আগেই জানিয়েছিল। তাদের ফিরিয়ে এনে দন্ড কার্যকর করতে সরকারের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার তরফ থেকে সাড়া মেলেনি। বাকিদের মধ্যে মাজেদ ভারতে এবং মোসলেম উদ্দিন পাকিস্তানে আছেন বলে তথ্য ছিল ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) কাছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হলে ভারত বলেছিল, মাজেদ তাদের দেশে নেই। আর পাকিস্তান কোনো জবাব দেয়নি।
রশিদ ও ডালিমের অবস্থানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনও মেলেনি বলে গতবছর জানিয়েছিলেন এনসিবি’র দায়িত্বে থাকা সহকারী মহা পরিদর্শক মহিউল ইসলাম।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ গত ২৫ বছর ধরে ভারতে পালিয়ে ছিলেন। করোনাভাইরাস আতঙ্কে সেখান থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। দেশে ফেরার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের কলকাতায় আবদুল মাজেদ নিজেকে আবদুল মজিদ পরিচয় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। এর আগে লিবিয়া ও পাকিস্তানে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে আবদুল মাজেদ প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে সিটিটিসি’র দায়িত্বশীল সূত্র। জানা গেছে, ভারত থেকে পালিয়ে তিনি প্রথমে যান লিবিয়ায়। সেখান থেকে আসেন পাকিস্তানে। লিবিয়া ও পাকিস্তানে সুবিধা করতে না পেরে আবারও ভারতে ফিরে আসেন। বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করার পর গত ৩-৪ বছর ধরে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন তিনি।
দীর্ঘদিন কলকাতায় অবস্থান করার সময় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ তেমন কিছু করতেন না। বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগযোগ ছিল তার। করোনাভাইরাস আতঙ্কে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফেরার পর মিরপুর ডিওএইচএস-এর এক নম্বর সড়কের ১০/এ বাসায় ওঠেন।
সিটিটিসির উপ-কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, আবদুল মাজেদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এরপর আমাদের গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আটক করা হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি আবদুল মাজেদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা আসামির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছি।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, আদালতে আবদুল মাজেদকে ধানমন্ডি থানার ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় (সন্দেহমূলক) বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রেফারেন্সসহ গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয় এবং গ্রেপ্তারের পর কারাগারে রাখার আবেদন করে পুলিশ। আবেদন মঞ্জুর করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আব্দুল মাজেদকে বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) ফাঁসির সেলে রাখা হয়েছে।
ক্যাপ্টেন মাজেদকে গ্রেপ্তারের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভিডিও বার্তায় বলেন, আমরা দীর্ঘদিন দন্ডপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দন্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তাদেরই একজন ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ আমাদের পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। আমরা কিছুক্ষণ আগে তাকে আদালতে সোপর্দ করেছি। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার স্ত্রী সালেহা বেগম। বাড়ি নম্বর ১০/এ, রোড নম্বর ০১, ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকা। তিনি সেখানে বসবাস করতেন। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে তার সব তথ্য ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকান্ডের সময় দন্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, নূর ও রিসালদার মোসলেহউদ্দিন এই তিন জনের অবস্থান ছিল। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। মাজেদ তখন লেফটেন্যান্ট ছিলেন। এই খুনি শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনেই অংশগ্রহণ করেননি, তিনি জেলহত্যায়ও অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এরপর আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে ১৯৯৭ সালে, তার আগেই তিনি আত্মগোপন করেন। আমাদের গোয়েন্দাদের তৎপরতা ছিল তাকে ধরার জন্য। গোয়েন্দা বাহিনী এবং যারা যারা তাকে গ্রেপ্তারের কাজে ছিল, তারা সবাই ভালো কাজ করেছে বলে আমি মনে করি।
রায় কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এখন আব্দুল মাজেদের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করার জন্য আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে। এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই রায় কার্যকর করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের গুলশানের আবাসিক অফিস থেকে একটি ভিডিও বার্তায় এ কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, তিনি কারাগারে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারেন কি-না, এমন প্রশ্ন আমার কাছে এসেছে। আব্দুল মাজেদকে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ফাঁসির দন্ডে দন্ডাত আসামি। ফাঁসির দন্ডে দন্ডাত আসামিদের সলিটারি কনফাইনমেন্টে রাখা হয়। আব্দুল মাজেদকে সলিটারি কনফাইনমেন্টে রাখা হবে। এ হিসেবে তিনি করোনা ভাইরাস ছড়ানোর কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি করবেন না।