ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের কারিগরি সক্ষমতা নেই সিটি কর্পোরেশনের

57

ওয়াসিম আহমেদ

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে অভিযোগ উঠে, বহদ্দারহাট এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের র‌্যাম্পের দুইটি পিলারে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে র‌্যাম্পটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। কোনো ধরনের কারিগরি পরীক্ষা না করেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় সংস্থাটি। তারই প্রেক্ষিতে সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীসহ ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন শেষে জানায় এটি ফাটল নয় কনস্ট্রাকশন জয়েন্ট।
তাতেও ভরসা না পেয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বিশেষজ্ঞের জন্য চুয়েট ও সওজের দ্বারস্থ হয়েছে কর্পোরেশন। ধোয়া-মোছা, রঙ করার মত সাধারণ কিছু কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে চসিকের ‘মেইনটেন্যান্স’। সড়ক উন্নয়ন ও মেরামত নিয়ে অভিজ্ঞ কর্পোরেশন এখন নতুন ‘কনসেপ্ট’ ফ্লাইওভার ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কর্পোরেশনে আটজন তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী, আট ডিভিশনের বারজন নির্বাহী প্রকৌশলী রয়েছে। এ ছাড়াও নির্ধারিত অর্গানোগ্রামের চেয়ে বেশি সংখ্যক সহকারী প্রকৌশলী, উপ সহকারী প্রকৌশলী ও সুপারভাইজার রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন এতদিন সড়ক সংশ্লিষ্ট কাজ করে আসছে। এতে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দুটোই রয়েছে। ফ্লাইওভারের মত আধুনিক সড়ক মেরামত করার মত দক্ষ জনবল ও অভিজ্ঞতা সিটি কপোরেশনের নেই। ফলে ফ্লাইওভারের দুর্ঘটনা ঘটতেই অন্যসংস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে হচ্ছে চসিকের।
শুধু এ ঘটনায় নয়, নালায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর মৃত্যুতেও সিডিএ’কে চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগ। মূলত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবনতায় জনদুর্ভোগ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়সারা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে চসিক। এমনটাই মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
গত মঙ্গলবার প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি তো প্রকৌশলী না। ফাটলের সুনির্দিষ্ট কারণ আমি বলতে পারবো না। এখানে প্রকৌশল দৃষ্টিকোণ থেকে কি হয়েছে, না হয়েছে এটা আমার থেকে আমাদের প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন। তারা কারিগরী বিষয় ভালো জানেন।’
মেয়রের এমন বক্তব্যের দুইঘণ্টা শেষ না হতেই কারিগরি কোনো ব্যাখ্যা বা মতামত না দিয়েই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) উদ্দেশ্যে ‘স্বভাবগতই’ চিঠি দেয় সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম। ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের হক মার্কেট সংলগ্ন দুইটি পিলারে ফাটল সৃষ্টির কারণে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেকোন সময় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি। তাই ফাটল সৃষ্টির কারণ তদন্তপূর্বক বের করে মেরামত করার নির্দেশনা দেয় অফিসিয়ালি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সিটি কর্পোরেশন। পিলারের ফাটল সৃষ্টি হয়েছে নাকি কানেকশন জয়েন্ট এটি নির্ণয় করার মত সক্ষমতা কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের নেই। মূলত দায় এড়াতে এমন চিঠি প্রেরণ স্বভাবগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের সিটি কর্পোরেশন সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও অধ্যাদেশসম‚হ একীভ‚ত, অভিন্ন এবং সমন্বিতকরণকল্পে প্রণীত আইনের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, কর্পোরেশন নগরীর অধিবাসী এবং নগরীতে আগন্তুকদের আরাম ও সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এ আইন অনুসারে ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর নগরীর বহদ্দারহাটের এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ওভারপাস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে হস্তান্তর করে সিডিএ। হস্তান্তরের ১৮ মাস পার হলেও ফ্লাইওভার ব্যবস্থাপনা করতে কোনো ধরনের গবেষণা বা কারিগরি জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়নি চসিক।
এসব বিষয় নিয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিকের সাথে যোগযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটু ঝামেলায় আছি। তাড়াতাড়ি শেষ করেন।’ সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা থাকলেও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাই চুয়েট ও সওজের প্রতিনিধি দিয়ে ফাটলের কারণ ও করণীয় জানতে চিঠি দিয়েছি। যেখানে আমাদেরও কোনো প্রতিনিধি নেই।’
নগরীর চার ফ্লাইওভার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোন কোন দায়িত্ব পালন করবে কর্পোরেশন? এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফাটল নির্ণয় ব্যবস্থাপনা নয়। রং উঠে গেলে রং লাগানো, কার্পেটিংয়ের প্রলেপ লাগানো, আলোকায়নের জন্য বাতি লাগানো।’ ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে সিটি কর্পোরেশন কতটুকু প্রস্তুত জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একটি ফ্লাইওভার করলে অন্তত ৫০ বছর পর এমন প্রশ্ন আসে। একটি বাড়ি করলেও বিশাল সময় পার হওয়ার পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। তাছাড়া বিষয়টি তদন্তাধীন হওয়ায় কোনো ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়।’ উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট ব্যস্ততম মুরাদপুর মোড়ে পা পিছলে সড়ক লাগোয়া চশমা খালে পড়ে নিখোঁজ হন সবজি বিক্রেতা ছালেহ আহমেদ (৩০)। এখনো তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার ছেলেকে চাকরি দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। এর আগে ৩০ জুন অটোরিকশাসহ পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কোনো ঘটনারই তদন্ত হয়নি। এরপর গত ২৭ সেপ্টেম্বর নগরের আগ্রাবাদের মাজার গেট এলাকায় নালায় পড়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া (১৯)। এ ঘটনায়ও একদিন পর সিডিএকে চিঠি দিয়ে দায় সারে সংস্থাটি।