ফার্মেসিতে ভেজাল ওষুধের আড়ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে

2

দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি ওষুধের দোকানে ভেজাল ওষুধ। মাঝেমধ্যে ওষুধ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে থলের বিড়াল বের হতে দেখা গেলেও গণমাধ্যমে কয়েকদিন হৈচৈ-এর পর যে কদু সেই লাউ-এ থেকে যায়। এবারও এর ব্যত্যয় হবে বলে মনে হয়না। বুধবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ওষুধের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের হাজারী গলি এলাকায় ৫০ ফার্মেসি ভেজাল ওষুধের আড়ত। এসব দোকানে লাখ লাখ টাকার নকল-ভেজাল ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকারি ওষুধ বেচাকেনা হচ্ছে। অবাধে বিক্রি হচ্ছে আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধও। করোনা মহামারির সুযোগ নিয়ে এসব ওষুধ বেচাকেনা করতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এখানকার অসাধু ব্যবসায়ীরা। ঠিক একই অবস্থা রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ওষুধ মার্কেটগুলোতে। গত বছর মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে মানুষ যখন জীবন বাঁচার যুদ্ধে চিকিৎসক আর হাসপাতালে ছুটছিল তখন অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি করে মানুষের জীবনকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলে। ওই সময় চট্টগ্রামে খুলশীসহ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নকল ও ভেজাল ওষুধসহ করোনা টেস্টেও নকল কিট উদ্ধার করেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও র‌্যাব। এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে গতবছর নভেম্বর মাসে হাইকোর্টে জনৈক আইনজীবী ফার্মেসিতে ভেজাল ওষুধ সংরক্ষণ ও বিক্রি বন্ধ চেয়ে রিট করলে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ কেউ ভেজাল ওষুধ বিক্রি করলে তাদের যাবজ্জীবন কারাদÐ বা মৃত্যুদÐ দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। এ সময় আদালত আরো বলেন, কোনো ফার্মেসিতে ভেজাল ওষুধ পাওয়া গেলে মোবাইল কোর্টের দেয়া সাত দিনের সাজা একেবারেই কম হয়ে যাচ্ছে। তাই একবার পাওয়ার পর যদি দ্বিতীয়বার কোনো ফার্মেসিতে ভেজাল ওষুধ পাওয়া যায় তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হবে। যেখানে যাবজ্জীবন কারাদÐ বা মৃত্যুদÐের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে এ নির্দেশনা আমলে নিয়ে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা তা আমাদের জানা নেই। ফলে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে আবারও ভেজাল ও নকল ওষুধের আড়ত খুলে বসছে। একটি আধুনিক ও সভ্য জাতির জন্য এটি কল্পনাও করা যায় না। এ ভেজাল ওষুধ খেয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করলে এর দায় কে নেবে-এটিই এখন প্রশ্ন। পূর্বদেশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাজারী লেইন ও আশপাশের মার্কেটের অসাধু ব্যবসায়ীদের নকল-ভেজাল ওষুধ ধ্বংস করতে এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে গত ১৪ এপ্রিল সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করেছে হাজারী লেইন ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, করোনা মহামারির সুযোগ নিয়ে হাজারী লেইন ও আশপাশের মার্কেটের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নকল-ভেজাল, সরকারি ও অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করছে। এসব ওষুধ জনগণের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাজারী লেইন ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, যারা এ ধরনের ওষুধ বিক্রি করছেন, তারা আগামী সাত দিনের মধ্যে নিজ উদ্যোগে তা ধ্বংস করবেন। অন্যথায় হাজারী লেইনে ঐতিহ্যের স্বার্থে প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এজন্য ওষুধ ব্যবসায়ীদের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন ব্যবসায়ী নেতারা। হিসাব অনুযায়ী ২১ এপ্রিল একসপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে। এখন দেখার বিষয় সমিতির নির্দেশনা কখন কার্যকর হয়। তবে এক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের দায় এড়ানোর কোন সুয়োগ নেই। আমরা মনে করি, ওষুধ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হলে কোন অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল বা নকল ওষুধ বিক্রি, মজুদ বা তৈরি করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির ভেতরে বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতায় ভুগতে থাকা মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় আছে। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারের বেশির ভাগই বন্ধ। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চলছে চিকিৎসার বড় অংশ। ফলে করোনাভাইরাস ছাড়াও অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও বাসাবাড়ি এখন হয়ে পড়েছে এক ধরনের চিকিৎসাকেন্দ্র। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হাসপাতালের সামনে বা হাসপাতালকেন্দ্রিক ওষুধের দোকানগুলোতে এখন ভিড় কমে আবাসিক এলাকার আশপাশের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ বিক্রির রমরমা অবস্থা। এমন সুযোগ নিয়ে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায়। এ অবস্থায় কোন ছাড় নয়, কঠোর হাতে আইনি পদক্ষেপই পারে মানুষের জীবন বাঁচাতে।