ফাগুনের আগুন ভয়ঙ্কর!

13

তুষার দেব

বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ফাল্গুন মাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটলে তা দ্রæত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ শুষ্ক আবহাওয়ার এই সময়ে প্রকৃতিতে ‘পাগলা হাওয়া’ বিরাজ করে। অন্য অনুঘটকের পাশাপাশি বাতাসের গতি বেশি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠে। এই সময়ে অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
রাজধানীর বেইলি রোডে বহুতল ভবনে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ব্যাপক প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনা চট্টগ্রামের জনমানুষের মনেও দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে অগ্নি-দুর্ঘটনার অত্যধিক ঝুঁকিতে থাকা শত শত স্থাপনার বাসিন্দাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এমনিতেই শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিতভাবেই অগ্নিকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি অগ্নি-দুর্ঘটনার অত্যধিক ঝুঁকিতে থাকা রিয়াজউদ্দিন বাজারের পোশাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘রাজস্থান’ এর গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে সংঘটিত অগ্নিকান্ডে আনুমানিক দশ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এসব পণ্য মজুদ করা হয়েছিল। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুনে ঈদের ঝলমলে বাহারি পোশাক আগুনে ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়। একইভাবে গত ২ ফেব্রæয়ারি নগরীর সবচেয়ে জনবহুল ও ব্যস্ততম জহুর হকার্স মার্কেটের পণ্যের গুদামে অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শুষ্ক মৌসুমজুড়ে অগ্নি-দুর্ঘটনা এড়াতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জেলার আনোয়ারায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তিনটি রাইস মিলসহ সাতটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। উপজেলার বটতলী রুস্তমহাটে এ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, স্থানীয় জামাল উদ্দীনের রাইস মিল থেকে লাকড়ির মেশিনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হয়ে এই আগুনের সুত্রপাত হয়। খবর পেয়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আনোয়ারার দুটি ও কর্ণফুলী মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের একটিসহ মোট তিনটি ইউনিট যোগ দেয়। স্থানীয় লোকজন এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা টানা প্রায় তিনঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এতে পুড়ে যাওয়া সাতটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি আনুমানিক দেড় কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। ক্ষয়ক্ষতির শিকার ব্যক্তিরা হলেন দৌলত রাইস মিলের মালিক মো. দৌলত খান, হুরে জাহান রাইস মিলের মালিক গোলাম মোহাম্মদ, জামাল উদ্দীন রাইস মিলের মালিক মো. জামাল উদ্দীন, আল বয়ান স্টোরের মালিক মাওলানা নাছিম, স্মার্ট টেক ফার্মেসি ও অনিক ফার্মেসি। এর আগের দিন ২৬ জানুয়ারি দিবাগত রাতে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি মুন্সেফ বাজারের পূর্বে অবস্থিত বড়ুয়া পাড়ায় আগুন লেগে ছয়টি বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন, স্থানীয় সুধীর বড়ুয়া, রনধীর বড়ুয়া, স্বপন বড়ুয়া, রুপন কান্তি বড়ুয়া, মিলন বড়ুয়া ও দীপন বড়ুয়ার পরিবার। ক্ষতিগ্রস্তরা দাবি করেছেন, আগুনে তাদের প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় রনধীর বড়ুয়ার রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা টিনের ছাউনিযুক্ত বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর স্থানীয়রা অনেক চেষ্টা করেও আগুন নেভাতে পারেনি। চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় সবকিছু। খবর পেয়ে দূরবর্তী সাতকানিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলেও ততক্ষণে বসতঘরসহ কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, নগরীর শতাধিক মার্কেট অগ্নি-দুর্ঘটনার অতি ঝুঁকিতে রয়েছে। অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে প্রতিবছরই কোনো না কোনো মার্কেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এতে সম্পদের পাশাপাশি ঘটেছে প্রাণহানিও। বারবার অগ্নিকান্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলেও পর্যাপ্ত অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থা নেই বেশির ভাগ মার্কেটে। নগরীর অন্তত ৪৫টি মার্কেট ও ১০টি বাজারের বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এসব বাজারের রাস্তা ও গলিগুলো সরু। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এসব এলাকায় অগ্নিনির্বাপক গাড়ি ও যন্ত্রপাতি নিয়ে দ্রুত পৌঁছানোও কঠিন। এছাড়া উৎস না থাকায় পানিও পাওয়া যায় না।
বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসাবে, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার ৭৮৩ টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকান্ডের ৮৮৭টি ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। শতকরা হিসেবে যা প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া ৩৯০টি সিগারেট ও ১৪৭টি চুলার আগুন থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে। একইসময়ে চট্টগ্রাম জেলায় ১৭০টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে অগ্নিকান্ড ঘটে ১৩২টি। এছাড়া বিভাগের আওতাধীন কুমিল্লায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে ৬৩৫টি, নোয়াখালীতে ২৯৮টি, রাঙামাটিতে ১০৭টি, বান্দরবানে ৪০টি ও কক্সবাজারে ১৭৯টি। গত এক বছরে চট্টগ্রামে আগুনে ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার টাকার সম্পদ। শুধু চট্টগ্রামে গত এক বছরে আগুনে মারা গেছেন সাতজন। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন। বিভাগওয়ারী হিসাবে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় একই সময়ে আগুনে ক্ষতির শিকার হয়েছে শত কোটি টাকার সম্পদ। এ সময়ে আগুনে মারা গেছেন ৭৫ জন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। ২০২২ সালে ১ হাজার ৬১৩ টি আগুনের ঘটনা ঘটেছিল চট্টগ্রাম বিভাগে। এসব ঘটনায় দগ্ধ হন ৪২ জন, মারা যান ১৪ জন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিভাগীয় উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত বছর যেসব অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে তার বেশির ভাগই বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। যার অন্যতম কারণ ওভারলোডিং। দেখা গেছে, বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক চুলা, ফ্রিজসহ বিদ্যুৎচালিত বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বৈদ্যুতিক ক্যাবল যেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো উপযুক্ত মানের নয় বা লোড নিতে পারছে না। ফলে আগুনের সূত্রপাত হচ্ছে সেখান থেকেই। এছাড়া বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক যে সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা হয়না। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে সেখান থেকে সৃষ্ট গোলযোগেও অগ্নিকান্ডের ঘটনা বাড়ছে।