ফররুখ আহমদের অসমাপ্ত উপন্যাস এবং কিছু কথা

18

 

বাংলা সাহিত্যে এক বিরল কাব্যপ্রতিভা ফররুখ আহমদ (১০ জুন ১৯১৮-১৯ অক্টোবর ১৯৭৪)। ইসলামী রেনেসাঁর কবি, গণজাগরণের কবি, গণতন্ত্রের কবি, ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্যের কবি, মন্বন্তের কবি সর্বোপরি মানবতার কবি হিসেবে খ্যাত হয়েছেন চল্লিশের দশকের নিঃশব্দ পথচারী এই মহান কবি। তাঁর সাহিত্যে অসাধারণ মৌলিকত্ব ছিল। রবীন্দ্র ও নজরুল-উত্তর যুগে চল্লিশের দশকে তাঁর সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার অবদানে বাংলা কাব্য-সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন। যার কারণে তাঁকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে অবিহিত করা হয়। তিনি চলে গেছেন। রেখে গেছেন বিশাল সাহিত্যভান্ডার।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী পদচারণা মানুষকে বিস্ময় ও বিমুগ্ধ করে। কবি শামসুর রাহমানের মতে “তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। না, ভুল বললাম। নিঃস্ব কথাটা তার সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। তার মানসিক ঐশ্বর্যের কোনও কমতি ছিল না। তিনি রেখে গেছেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ, যেগুলি পঠিত হবে দীর্ঘকাল। তার বহু পঙ্ক্তি বারবার গুঞ্জরিত হবে কাব্যপিপাসুদের স্মৃতিতে”। কবিতা, গীতি-কবিতা, সনেট, মহাকাব্য, ব্যঙ্গ-কবিতা, নাটক, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গনাটক ও শিশুতোষ ছড়া-কবিতা ইত্যাদি বিভিন্ন কাব্যাঙ্গিকে তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। এছাড়া তাঁর গল্প এবং উপন্যাসেও (অসমাপ্ত) পাওয়া যায় পান্ডিত্যের ছাপ। সৌন্দর্য, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, রোমান্টিকতা, প্রেম, ভালোবাসা, অনুরাগ, উদাস জীবনের বাসনা, স্বদেশ সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য, ইসলামের নিগুঢ় তত্ত¡, মানব মুক্তির আকাক্সক্ষা, নিপিড়িতের জয়গান, মুসলমানদের হারনো গৌরব প্রভৃতি বিষয় ফুটে উঠে এসেছে এই আপোষহীন কবির লেখায়। বাস্তব জীবনে নিজস্ব জীবনাচারেও আদর্শিক চেতনাকে ধারন করেছিলেন তিনি। যেটা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল অনন্য উচ্চতায়।
১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত “ফররুখআহমদের গল্প” প্রকাশিত হলে আমরা বিস্মিত হই। আর উপন্যাসের কথা উঠলে তো বিস্মিতের অন্ত থাকে না। একইভাবে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম ১৯৭২ সালে সুকুমার ঘোষ এবং সুবিনয় মুস্তাফী সম্পাদিত “জীবনানন্দ দাশের গল্প” কিংবা ১৯৭১ সালে যুগান্তর চক্রবর্তী সম্পাদিত “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা” যখন প্রকাশিত হয়েছিল। কারণ আমরা ফররুখআহমদ ও জীবনান্দ দাশকে কবি এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঔপন্যাসিক হিসেবেই জানি। ফররুখআহমদ এবং জীবনানন্দ দাশ যে গল্প-উপন্যাস লিখতে পারেন কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে কবিতা লিখতে পারেন তা আমরা কল্পনাই করিনি। স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত খ্যাতির আড়ালে লোকচক্ষুর অন্তরালে হয়েছে তাঁদের এসব সৃষ্টিকর্ম।
বাংলা ১৩৪৪ সনের শ্রাবণ মাসে বুলবুল পত্রিকায় “রাত্রি” নামক সনেট কবিতা প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে ফররুখআহমদের পদার্পন হলেও পরের মাসে মাসিক মোহাম্মদী’তে “অন্তর্লীন” নামক গল্প প্রকাশিশ হয় কবির। বছর তিনেকের মধ্যে তাঁর প্রায় পাঁচটি গল্প প্রকাশিত হয় বুলবুল ও মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। ১৩৪৪-১৩৪৬ সনের মধ্যে লিখিত গল্পপর্বের পর কবিকে আর তেমন গল্প লেখায় দেখা যায়নি। এর প্রায় বছর দশেক পরে কাজি আফসারউদ্দিন আহমদ স¤পাদিত “মৃত্তিকা” পত্রিকায় “সিকান্দার শা-র ঘোড়া” নামে কবির একটি অসম্পূর্ণ কথাসাহিত্যিক গদ্য প্রকাশিত হয়। সাত পৃষ্ঠার ঐ রচনায়- “এ কোন দেশ?” আর “সীমানা” নামে দুটি পরিচ্ছেদ ছিল এবং রচনাটির শেষে লেখা ছিল “ক্রমশঃ”। তবে লেখাটির পরবর্তী কোনো পরিচ্ছেদ পত্রিকায় আর বেরোয়নি। সমসাময়িক কবি সৈয়দ আলী আহসান ফররুখ-সংক্রান্ত একটি স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন যে, ফররুখের “সিকান্দার শা-র ঘোড়া” লেখা হচ্ছিলো উপন্যাস হিশেবে। “মৃত্তিকা” পত্রিকায় ঐ অসম্পূর্ণ উপন্যাসের সাত পৃষ্ঠা ছাপা হয়েছিল। ঐ সাত পৃষ্ঠায় উপন্যাসের দুটি পরিচ্ছেদ ছাপা হয়েছিল : “এ কোন দেশ?” আর “সীমানা”। পরবর্তীতে লেখাটি ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত “ফররুখআহমদ রচনাবলী” দ্বিতীয় খন্ডে সংকলিত হয়।
প্রথম জীবনে ফররুখআহমদের কবিতার চাইতে গল্পই বেশি শক্তিশালী ছিল বলে সাক্ষ্য পাই। আশ্চার্যজনক হলেও সত্য যে, ফররুখআহমদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সমকালীন সমালোচকের দৃষ্টি প্রথমে পড়ে কথাসাহিত্যের প্রতি, কবিতার প্রতি নয়। অল্প কয়েকটি গল্প লিখেই তিনি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। ১৯৩৯ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের কথাসাহিত্য শাখার সভাপতির অভিভাষণে খান সাহেব মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লাহ বলেন, তরুণ কথাসাহিত্যিকদের মধ্যেও কয়েকজনের উদ্যম আশাপ্রদ বলিয়া মনে হইতেছে। আবু রুশদ, ফররুখআহমদ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, নাজীরুল ইসলাম প্রভৃতির রচনা সাময়িক সাহিত্যের পৃষ্ঠায় ইতস্তত ছড়াইয়া আছে বটে, কিন্তু এ স¤পর্কে ইহাদের নাম উল্লেখ না করিলে আমাদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে বলিয়া মনে হয়। কারণ সত্য সত্যই ইহাদের মধ্যে শক্তির পরিচয় লক্ষ্য করা যায়। [মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬] উত্তরকালে এঁদের মধ্যে আবু রুশদ ও আবুজাফর শামসুদ্দীন গল্প-উপন্যাসে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেও ফররুখআহমদ কবিতার রাজ্যে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে নাজীরুল ইসলাম স্বনিযুক্ত হন প্রবন্ধ সাহিত্যে। সাহিত্যের ইতিহাসে এমন রদবদল প্রায়-ই দেখা যায়। সৃষ্টিশীলতাকে নির্দিষ্ট কোনো ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না। নিজস্ব স্রোতে তাঁরা গড়ে নেয় নিজের গতিপথ। বাল্যবন্ধু কাজী নজরুল ইসলাম এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে আমরা এমনই ঘটনা লক্ষ্য করি।
“সিকান্দার শা-র ঘোড়া” উপন্যাসটি পিতৃহারা দুইসন্তান রুস্তম এবং সিকান্দার শা, তাদের মা, রুস্তমের ছোটো মামা সিরাজ, বড় মামা ফরিদ সাহেব ও উনার বউ এবং রুস্তমের সমবয়সী তাদের মেয়ে নার্গিসকে নিয়েই এগিয়েছে। ঘটনার পরম্পরায় রুস্তসমকেই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হিসেবেই মনে হয়। রুস্তম খুব বোকাসোকা এবং তার ছোটোভাই সিকান্দার শা খুব চঞ্চল প্রকৃতির। সিকান্দার শা বড় ভাই রুস্তমকে ঘোড়া বানিয়ে পিঠের উপর সওয়ার হয় এবং ঘোড়ার মত ব্যবহার করে। এমন একটা ঘটনার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের শুরু। রুস্তমের বোকা বোকা ভাব দেখে তার মা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। তাঁর উৎকণ্ঠার শেষ নেই। এমনকি মায়ের কান্নাও চলে আসে এই ভেবে যে, শুধু সিকান্দারই নয়, সুযোগ পেলে পাড়ার অন্যান্য ছেলেরাও ওর পিঠে কখন চেপে বসে। এদিকে ছেলে বড়ও হচ্ছে। তার পড়ালেখা করতে হবে। চালাক হতে হবে। কিন্তু মা তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে কোথাও যেতে দিতে চায় না। অন্যদিকে রুস্তমের মামা বারবার তগাদা দিচ্ছে তাকে দূর শহর তথা কলকাতায় পাঠিয়ে দিতে। নিশ্চয়তা অনিশ্চয়তার দোলাচলে অবশেষে সিদ্ধান্ত হল তাকে শহরে মামার কাছে পাঠানো হবে। অনেক জল্পনা-কল্পনা, ভয় আর শঙ্কা নিয়ে সিকান্দার শা-র ঘোড়া ছোটোমামা সিরাজের সাথে এক জামানা পার হয়ে হয়ে আরেক জামানায় পা ফেলেছে।
শুরু হয় রুস্তমের শহুরে জীবন। বড় মামা ফরিদ সাহেব খুব কড়ালোক- নিয়ম শৃঙ্খলায় কঠোর। অন্যদিকে মামি সৌখিন ও রূপচর্চায় ব্যকুল। কাঠিণ্যের মাঝেও রুস্তমের বড় মামাকেই বেশি ভালো লাগে। অন্যদিকে মামাতো বোন নার্গিসের হাবভাব দেখে তার কাছে যেতে ভয় পায় রুস্তম। তাই তার সাথেও ভাব জমে না রুস্তমের। এই এক নিঃসঙ্গ জীবন। কিছুদিন পর রুস্তমকে নিয়ে যাওয়া হয় স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। সে নার্গিসের সমবয়সী হলেও নিরেট হাবাগোবা আর অন্যমনস্কতার কারণে তাকে সবচেয়ে নিচু শ্রেণিতে ভর্তি করাতে বাধ্য হয় যেখানে নার্গিস পড়ে ক্লাস ত্রিতে। মামী এই খবর শুনে এমন হাসি দেয় লেখকের ভাষায়- আনন্দ প্রকাশ করা ছাড়াও আর এক রকম হাসি আছে : তুমি যদি কাউকে ঠকাতে পারো তাহলেই তোমার মুখে সেই হাসি ফুটবে। এই থেকে বুঝা যায় মামী কী ধরণের হাসি হেসেছিলেন। দিন যায়। স্কুলের ভালোলাগা সময় আস্তে আস্তে ফুরিয়ে যায়। মাস্টারেরা পড়া জিজ্ঞেস করলে পড়া পারে না রুস্তম। এতে শাস্তির মুখোমুখী হতে হয় তাকে। একদিন স্কুল ছুটির পর অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথ হারিয়ে ফেলে রুস্তম। পথ হারিয়ে রাস্তায় পাগলের মত দৌড়াতে দৌড়াতে একটা লোকের সাথে তার ধাক্কা লাগে। লোকটিকে পরিচয় আর ঠিকানা দিলে সেই লোকটি রুস্তমকে তার মামার বাসায় পৌঁছে দেয়। সে বাসায় এলে কারও কোনো ভাবোধোয় নেই। শুধু বড় মামা-ই দৌড়ে এসে তাকে কোলে নেয়। এটা দেখে বুঝতে পারে বড় মামা কঠিন হলেও তাকে কতটা ভালোবাসে। এভাবেই চলতে থাকে রুস্তমের শহুরে জীবন। হঠাৎ একদিন তার নতুন এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়। নাম ফিরোজ। বয়সে রুস্তমের চেয়ে অনেক বড়। তার বড় ভাই আবার ছবি আঁকে। আপনজনের সাথে এমন অপূর্ণ স¤পর্কই রুস্তমকে হয়তো এমন অসম বন্ধুত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিন সে রুস্তমকে অনেকগুলো ছবি দেখায়- ফুল আর গাছের। তবে কয়েকটা ন্যাংটা মেয়ের ছবি দেখালে তার ভালো লাগেনি এবং বোকাসোকা স্বভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করে- এই বুঝি খুব গরীব মানুষের ছবি-। এভাবেই জীবন বাস্তবতার কঠিন মায়াজালে বেড়ে উঠা সহজ সরল জীবনের নান্দনিক প্রতিনিধি রুস্তমের পরিণতি না লেখে তথা “সিকান্দার শা-র ঘোড়া” উপন্যাসটি অসমাপ্ত রেখে লোকান্তর হয় প্রিয় কবি ফররুখআহমদ।