প্রেমের সুরভি শিখা দীর্ঘদিন জ্বলে

17

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

প্রেমের সুরভি শিখা দীর্ঘদিন জ্বলে, স্বর্গ হতে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে। আসলে প্রেম চিরন্তন, প্রেম শাশ^ত, প্রেম মানে না কোন রীতিনীতি, শৃঙ্খল। তার নাই কোন স্থান-কাল-পাত্রভেদ তত্ত্ব, তার নাই কোন ধনী-গরীব, ধর্ম-বর্ণ বিশেষত্ব। তাইতো সে পেরেছে নিজের মোবাইলফোন চোরের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে নিমেষেই। কথাটিতে এক বিন্দু মিথ্যা নাই কোন মতেই। ব্রাজিলের সুন্দরী তরুণী এমান্যুয়েলা তার জ¦লন্ত প্রমাণ খোদ নিজেই। একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তার মুঠোফোনটি চুরি হয়েযায়। যে সেটি চুরি করেছিল সেই চোর নিজেও ছিল বয়সে বেশ তরুণ যুবক। পরবর্তীতে ফোনটি দেখতে গিয়ে তাতে মেয়েটির ছবি দেখে তার মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। কারণ এত সুন্দরী মেয়ে সে আগে কখনো দেখেনি। এমনিতে তার দিনগুলো অতি খারাপ যাচ্ছিল, কারণ তার কোন প্রেমিকা নেই। তাই ফোনে এমান্যুয়েলার ছবি দেখে সে তাকে খোঁজা শুরু করল এবং একদিন তার দেখা পেয়ে গেল। ভাল লাগা থেকে দ্রুত ভালোবাসায় রূপ নিল সম্পর্ক। তারপর দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করে অবশেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল দুজনে। সুতরাং প্রেম মানে না কোন জাত-পাত, বাধাবিঘ্ন। জানে শুধু স্বর্গ হতে আসে সে স্বর্গে যায় চলে, হেহেহে।
বড়ই অদ্ভুত জিনিস এই প্রেম, যে কোন সময় যে কারো সাথে হয়ে যেতে পারে তা। এবং একবার হয়ে গেলে পরে, তখন আর কোন বাধাই সে মানে না। যেমন মানেনি বিহারের বেত্তিয়ার চম্পারনের মেয়ে প্রীতি কুমারী। পাশের গ্রামের রাজকুমারের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এখন প্রেম তো মানে না কোন নিয়ম, বাধা, শৃঙ্খল। মন তো ছুটে যেতে চায় প্রেমিকের সান্নিধ্যে। কিন্তু সমাজ বলেও তো একটি কথা আছে। তাকে অমান্য করে কেমনে? একে তো ভারতীয় সংস্কৃতি অতি রক্ষণশীল, তারোপর একজন নারী। সমাজের সামনে ময়মুরুব্বির দৃষ্টিগোচরে প্রেমিকের সাথে ঢলাঢলি করে কেমনে? লাজ-লজ্জা বলে তো একটা কথা আছে। তাই সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে পন্থায় রাতের আঁধারে গ্রামের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে প্রীতি পীরিতে নিয়োজিত হতো প্রেমিকের সাথে নিয়মিত। বিষয়টা কি, প্রতিদিন সন্ধ্যায় কেবলই বিদ্যুৎ চলে যায়, বিদ্যুৎ চলে যায়? ভাবতে লাগল গ্রামবাসীরা এবং কারণ উদঘাটনে অনুসন্ধানে নেমে পড়ে সকলে। সাতদিনের একান্ত প্রচেষ্টায় রহস্য উন্মোচিত হল, কিন্তু সবাই ভেবেছিল কাজটা রাজকুমারই করত তাই সকলে মিলে তাকে কিছুটা উত্তমমধ্যম দিল। পরে যখন আসল দোষী ধরা পড়ল সবাই মিলে তাদের বিয়ে পড়িয়ে দিল। রাজকুমার প্রথম কিছুটা অমত করেছিল, কারণ গ্রামের জামাইকে মেরেছে, এই অভিমানে আরকি, হিহিহিহি।
তাহলে বুঝুন এবার প্রেম মানুষকে কত উন্মাদ, কত দুঃসাহসী বানাতে পারে যাজ্জন্য সে অন্ধকার রাতে চলমান বিদ্যুৎকে পর্যন্ত ভয় করে না। এখানে এসে মনে পড়ে গেল গ্রীক মিথের সেই বিখ্যাত কাহিনী আফ্রোডাইট-অ্যাডোনিস প্রেমোপাখ্যান। লোকচক্ষুর অন্তরালে সন্ধ্যার আঁধারে খরস্রোতা আইডা পাড়ি দিয়ে আফ্রোডাইট প্রেমের তীব্র আকর্ষণে ছুটে আসত অ্যাডোনিসের কাছে। প্রতি সন্ধ্যায় অন্ধকার গাঢ় হওয়ার পর অ্যাডোনিস মশাল উঁচিয়ে আইডার তীরে এসে দাঁড়াত। অপর পার হতে আফ্রোডাইট নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারপর মশালের আলো লক্ষ্য করে নদীর তীব্রস্রোতে সাঁতার কেটে অ্যাডোনিসের কাছে এসে নিজেকে সমর্পন করত। আরঅ্যাডোনিসের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে আফ্রোডাইট তখন ভুলেই যেত খরস্রোতা আইডার সকল নির্যাতন। ফিরে পেত যেন আবার নদী পার হওয়ার দ্বিগুণ শক্তি। মনেহয় ঠিক তেমন রাজকুমারের প্রেমের পরশ পেয়ে প্রীতি কুমারী ভুলে যেত বিদ্যুৎ লাইন কাটার সেই ভয়ানক স্মৃতি, এবং সেই সাথে দ্বিগুণ উৎসাহে ফিরে পেত পরদিন লাইন কাটার আবার দ্বিগুণ শক্তি, হিহিহি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, প্রেমে সে এতই মত্তছিল যে একটি বারের জন্য সে ভাবতে পারেনি সাক্ষাৎ মৃত্যু সেখানে তার অপেক্ষায় অধীর হয়ে তাজ্জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গোনত। কখন তার একটি কুসুম ক্ষণিকের ভুল হয় আর সেই সুযোগে সে অবলীলায় তার ঘাড় মটকাতে পারে।
আসলে যে বলা হয় প্রেম মানুষকে অন্ধ করে দেয়, এটাই তার জাজ্বল্যমান নজির। আর সে নজির কেবল নদী পাড়ি দেয়া আর বিদ্যুৎ লাইন কাটাতে সীমাবদ্ধ নাই। বাধা এলে প্রেমের তরে প্রতিপক্ষের দাঁতেরপাটি পর্যন্ত উপড়ে ফেলা যায় এবং সেটাই এখন দেশের টক অফ দ্যা কান্ট্রি। মহাসমারোহে দেশে এখন চলছে ত্রিভুজ প্রেমের দুর্দান্ত উপাখ্যান। সে এক দুর্ধর্ষগল্প, রোমান্স, সাসপেন্স, ট্রাজেডি, কমেডি, হারমোনি, সব একসাথে। বাহ্ এ যেন সেই রোমানার বাহারÑস্বামী আছে ঘরে, স্ত্রী গেল কলিকের সাথে ডাক্তারখানায়।
আজব কাÐ, স্বামী চিনে না তার বিবিকে, বিবি চিনে না তার স্বামীকে। বিবির কলিক নিয়ে কি ঘটনা ঘটল, স্বামী গিয়ে তার কলিককে ধরে মারল। ধামধুম আর কি কি হলো, স্বামী-বিবি দুজনের। ভারতীয় বাংলা গান ‘ছেলে চিনে না তার বাবাকে’র প্যারোডি, হিহি। স্বামী অবশ্য এসেছিলেন দোর্দন্ডপ্রতাপে চেলাচামুন্ডা সাথেকরে। এবার গল্পে এলো রিভেঞ্জ, কলিক তার সাঙ্গপাঙ্গ ডেকে এনে চেলাচামুন্ডাদের কষে দিল ডলা। ডলার চোটে দাঁতেরপাটি উপড়ে গেল চেলার। এবার ঘটনা নিল আরেক মোড়, গল্পে এল সাসপেন্স। বিবি এসে স্বামীকে করল দোষী, ফলে স্বামীর গলায় পড়ল গিয়ে রশি। তাহলে বুঝুন এবার, কি দুর্বার প্রেমের উর্বর কাহিনী। হায়রে দুনিয়া, কূল পাইনা ভাবিয়া, স্ত্রী হইয়া স্বামীকে বানাল আসামি, বন্ধু লইয়া ঘুরে দিবসযামী। এটাই হলো হালের নিয়ম খান্দানী।
এই যে উপমাটি উপস্থাপন করলাম, তার বাস্তব চরিত্রগুলো দেশের বর্তমান হালের এলিট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তবে এলিট বলুন আর ভ্যালিড বলুন ইগো ম্যাটার যখন এসে যায় তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, হায়েনা বনে যায়। আর তা যদি হয় বউয়ের পরকীয়া বিষয়ক তখন তা হয় আরো ভয়ানক। কারণ সেটা হয় তখন, বউ যখন বন্ধু লইয়া আমার চক্ষুর সামনে দিয়া ডাক্তারখানা ছুইট্টা যায় ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়। ফলে প্রেমের নাম বেদনা, হাহাহা। অবশ্য পরকীয়া-প্রেম নয়, কারণ তাতে কল্যাণ নেই। প্রেমের মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে। যে সম্পর্কের মাঝে কল্যাণ থাকে না সেটা প্রেম হয় না। প্রেম হল পবিত্র, প্রেম দিয়ে যা হয় অস্ত্র দিয়ে তা হয় না। প্রেম দিয়ে করা যায় বিশ্ব জয় তাই প্রেম কখনো ফেলনা কিছু নয়। সেজন্য বলা হয় প্রেম অতি ব্যাপক বিষয় কারণ প্রেম খালি মানবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি গোটা বিশ্বময় বিস্তৃত। নর-নারীতে যেমন প্রেম হয় তেমন মানবে-দানবেও প্রেম হতে পারে। যেমন পশুর জন্য প্রেম, পাখির জন্য প্রেম, গাছপালা, পাহাড়-পর্বতের প্রতি প্রেম-এসব অতি বাস্তব বিষয়। এই যেমন সেদিন একটি বানর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সীতাকুন্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এল। দেখুন কি কান্ড, আমি তো দেখেই থ বনে গেলাম। বানর কেমনে চিকিৎসা নিতে আসে? তা’ও পালিত না, বন্য বানর। তার মাথায় কেমন করে এই বুদ্ধি এলো, কার কাছে সে এটা শিখল?
একটি স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের কাজ কি বা সেটা জিনিসটা কি, সেই বোধটা বানরটার মধ্যে এল কেমনে? সম্ভবত মানবরা স্মার্টে প্রবেশ করেছে তাই দানবরা এনালগে ঢুকেছে, হেহেহে যুগের তাছির। বানরটি ক্ষত নিয়ে যখন হাসপাতালে এসে ঘুরাঘুরি করতে লাগল, এক ডাক্তার তা দেখে তাকে চিকিৎসা দিলেন। পরদিন বানরটি আবার এল, ডাক্তার আবার চিকিৎসা দিলেন, এভাবে তিনদিন চলল। ভেবে দেখুন বানরের কি বুদ্ধি। এরমধ্যে আরেক কান্ড ঘটে গেল, এই কদিনে ডাক্তার বানরটির প্রেমে পড়েগেলেন। বানরটির জন্য তাঁর মনে ভীষণ মায়ার সৃষ্টি হল। তিনি যখন দেখলেন দিনদিন বানরটার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে, দ্রুত তিনি তাকে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন, অনেক চিকিৎসা দিলেন। আরো যারা ডাক্তার ছিলেন সকলে মিলে তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাঁচাতে পারলেন না। ফলে ডাক্তারের মনটা একদম ভেঙ্গে গেল, মনে তিনি ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর মনে হল তিনি তাঁর এক অতি নিকট জনকে হারিয়েছেন, যে ছিল কিনা তাঁর আত্মার আত্মীয়। অথচ মাত্র তিন দিনের পরিচয়, তা’ও আবার কোন মানুষ না, একটা পশু। এরইমধ্যে বানরটা তাঁর এত প্রিয় হল কেমন করে? এটাকে বলে লাভ এট ফার্স্ট সাইট, আর এটা এমনে এমনে আসে না। তজ্জন্যে অবজেক্টের বিশেষ কোন বুদ্ধিদীপ্ত ভিন্ন মাত্রার আচরণ কিংবা গুণ সাবজেক্টের গোচরিভূত হতে হয়। তাহলে সহজেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, যা বানরটির ক্ষেত্রে হয়েছে।
অবশ্য দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সবসময় দৃশ্যমান আচরণের প্রয়োজন হয়, এটা কিন্তু ঠিক নয়। অনেক সময় মানুষের অদৃশ্য আচরণও অন্যের সমবেদনা জাগাতে পারে। যা পেরেছেন দিল্লীর রোহিনীর অশীতিপর বৃদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার এম রামকৃষ্ণ। তিনি গেলেন ছেলের বাড়ি বেড়াতে। এদিকে খালি ঘর পেয়ে আরো ভালো করে তা খালি করতে ঢুকল চোর। ঢুকেই দেখে ঘরে কিছু নাই, আলমারি খালি, চোর তখন একটি পাঁশশ রুপির নোট আলমারিতে রেখে চলে গেল। মনে হয় খালি ঘর এখানে বৃদ্ধের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছে, যা তার প্রতি চোরের প্রেম সৃষ্টি করেছে, হেহেহে। অতএব কিসেই যে কার প্রতি কখন কে মজে যায় বলা মুশকিল। একেকজন একেক কারণে একেকজনের প্রতি অনুরক্ত হতে পারে। তবে বাইডেন কিসের আকর্ষণে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এমন ভক্ত হয়ে গেলেন বুঝলামনা। যাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা উঠেপড়ে লেগেছে তাকে দেখেই একের পর এক সেলফি তোলা শুরু করল, কারিশমাটা কি? আসলে এটি সেই কারিশমা যার গুণে ডাক্তার বানরের প্রেমে পড়েছিলেন। সেই একই কারণে মনেহয় জি টুয়েন্টি সম্মেলনে বাইডেনও প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত হয়ে গেছেন, সেই সাথে ঋষি সুনাকও। তবে এসকল হাই প্রোফাইল আয়োজনে অতি উৎসাহীদের না নেয়াই উত্তম। কেন তা বললাম শুনুন।
জহির সাহেব জীবনে বড়সফল একজন মানুষ। ধনে, মানে, জনে, মনে সবদিক থেকে তিনি সর্বাত্মক সার্থক। তাঁর রয়েছে সেসাথে নিজেকে জাহির করার আবার বড় একটি লোভ। সেই সুবাদে কাজকারবার, জনসেবা, সমাজ সেবার পাশাপাশি কিছু সংস্কৃতিক কর্মকান্ডও তিনি মাঝেসাঁঝে করে থাকেন। দু-চারজন মোসাহেব সর্বদা তাঁর আশেপাশে থাকে, তাদের কাজ কেবল সাহেবের প্রশংসা করা। একদিন এক আয়োজনে তিনি একটি গান করলেন। বড় মিষ্টি গান, দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ধন্য ধন্য পড়ে গেল।
জহির সাহেব তো খুশীতে গদগদ। সাংবাদিকরা ছুটে এসে, ‘স্যার এত কাজ করার পর আপনি সংস্কৃতিক চর্চা করার সময় কেমনে পান?’ গদগদ হালেই তিনি, ‘সবকিছু থেকে সময় বের করে নিতে হয় আরকি।’ কিন্তু এত কষ্ট আপনি করেন কেমনে স্যার?স্যারের কষ্টের কথা শুনে মোসাহেবদের একজন ছুটে এসে, ‘বলেন কি স্যারের কষ্ট, স্যার কষ্ট করলে আমরা আছি কেন?স্যার খালি ফটোশুট করেন। এই যে আজ স্যার গান করলেন, স্যার শুধু ঠোঁট মিলিয়েছেন, কাজ তো হয়েছে সব পর্দার পেছনে!’- কাজেই বুঝা গেল মাসী, অতি উৎসাহী রঙভরা আয়োজনে করে দিল হিসি, হিহিহিহি।
লেখক : কলামিস্ট