প্রিয় নবী (দ.)’র বিদায় বেলায়

2

 

উম্মল মোমেনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, হিজরী একাদশ সালে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করলেন। অতঃপর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু মুয়াইহিবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাকে ইহজগতের ও পর জগতের রতœভাÐার দেয়া হয়েছে। আবু মুয়াহিবা বললেন, ইয়া রাসুলুল্লা! আপনি দু’টি কালের ভাÐারসমূহের মধ্যে কোনটি গ্রহণ করলেন ? প্রিয় নবী (দ.) ইরশাদ করলেন, আল্লাহর সাক্ষাতের পর বেহেশত পছন্দ করেছি। এরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেছেন, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোন নবী ইহকাল হতে বিদায় গ্রহণ করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত বেহেস্তের তাঁর মর্যাদার স্থান স্বচক্ষে দেখতে পায় না। মহান আল্লাহ পাক আমাকে ক্ষমতা দিয়েছেন চাইলে দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করি অথবা রোগ মুক্ত হই। অসুস্থ অবস্থায় হুজুর (দ.) তাঁর মাতা মোবারক হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)’র জানুর উপর রাখলেন এবং দৃষ্টি দিলেন ঘরের ছাদের দিকে। অতঃপর উচ্চারণ করলেন, ‘আল্লাহুম্মা রফীকে আ’লা’। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন এতে আমি বুঝেনিলাম তাঁকে বিদায়ের সংবাদ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ যে কলেমা পাক তিনি উচ্চারণ করেছেন সেটি ‘আল্লাহুম্মা রকীকে আলা’ অর্থাৎ আল্লাহর কাছে যাওয়াকে তিনি পছন্দ করেছেন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিবেন, তা তিনি যে জানতেন অসংখ্য হাদিস তার প্রমাণ বহন করে। তাঁর ওফাতের পূর্বে মুয়াজ ইবনে জবলকে ইয়ামনের গভর্নর নিযুক্ত করে দীর্ঘ উপদেশের পর বললেন, মুয়াজ, তোমার আমার সাক্ষাৎ আর যদি সম্ভব হতো, তাহলে আমার উপদেশ হতো সংক্ষিপ্ত। কিন্তু আমরা আর মহাপ্রলয়ের শেষ রজনী পর্যন্ত পরস্পর মিলিত হতে পারবো না। মুয়াজ (রা.) ইয়ামন যাত্রার কিছুদিন পরই প্রিয় নবী (দ.)’র ওফাত হয়।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে অসুস্থতা অবস্থায় প্রাণপ্রিয় মেয়ে হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.) কে কাছে ডাকলেন এবং তাঁর কানে কানে কিছু গুপ্তকথা বললেন, ফাতেমা (রা.) তা শুনে কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর তাঁর কানে আরো কিছু কথা বললে তিনি হাসতে লাগলেন। এই হাসি কান্নার রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে হযরত ফাতেমা (রা.) বললেন, আমি এর রহস্য প্রকাশ করতে চাই না। প্রিয় নবী (দ.)’র ইন্তেকালের পর হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এ রহস্য সম্পর্কে ফাতেমা (রা.)’র নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমবার প্রিয় নবী (দ.) আমাকে বললেন, পূর্বে জিবরাইল প্রতিবছর আমার নিকট একবার কোরআন নিয়ে আসতো, এবছর দু’বার নিয়ে এসেছেন। এতে আমি বুঝতে পারলাম আমার বিদায় আসন্ন। একথা শুনে আমি কাঁদতে থাকি। দ্বিতীয়বার আমার কানে যখন বললেন, তুমি আমার উম্মতের নেত্রী হবে। সর্ব প্রথম মহিলা জান্নাতে প্রবেশ করার অধিকারী তুমিই হবে। একথা শুনে খুশি হলাম।
নবী কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) বর্ণনা করেছেন, প্রিয় নবী (দ.)’র ইন্তেকালের পূর্বে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিলাম, তখন আমি দেখলাম এক ব্যক্তি এসে ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলা বায়তিন্নবুয়ত’ বলে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কী রোগী দেখতে এসেছেন। হুজুর (দ.)কে আরাম করতে দিন, তিনি ইবাদতে নিয়োজিত আছেন। লোকটি বললেন, আমাকে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি প্রদান করুন। তখন প্রিয় নবী (দ.) চোখ খুলে বললেন, তুমি কার সাথে কথা বলছ জান ? আমি বললাম না। রাসুল (দ.) বললেন উনি হলো মালুকুল মাওত। তাঁকে ভিতরে আসার অনুমতি দাও। হযরত আজরাইল (আ.) ভিতরে এসে ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহু’ বললেন। মালাকুল মওত ফরমায়াছেন, আল্লাহর কসম আমি আগে কখনও কারো রুহ নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিনি এবং ভবিষ্যতেও করবো না।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর গোসল দেয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তাঁকে কী সাধারণ মুসলমানদের মত উলঙ্গ অবস্থায় গোসল দিবা না কাপড় পরিহিত অবস্থায় দিবে। তখন উপস্থিত সকলের ঘুম আসে এবং তাদের কানে শুনতে পায়, ‘তোমরা রাসুল (দ.)কে জামা আবৃত অবস্থায় গোসল দাও।
হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করলেন, রাসুল (দ.) আমাকে বলে গিয়েছেন আমি যেন তাঁর গোসলের দায়িত্ব গ্রহণ করি। কারণ প্রিয় নবী (দ.)’র নির্দেশ হলো আমার গুপ্ত অঙ্গের প্রতি তুমি ছাড়া যে ব্যক্তির দৃষ্টি পড়বে সে অন্ধ হয়ে যাবে।
খলিফাতুল মোসলেমিন হযরত আলী (রা.)’র নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, প্রখর স্মরণশক্তি ও অধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করলে কী ভাবে ? তিনি বলে ছিলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (দ.)কে গোসল দেয়ার কালে অল্প পানি তাঁর চোখের মধ্যে দেখতে পাই, তা আমি ফেলে না দিয়ে পান করে ফেলি বলেই এ মহান অর্জন সম্ভব হয়।
হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (দ.)’র ইন্তেকালের পর গোসল দেয়ার সময় দেখতে পেলাম , তাঁর দেহ মোবারকে কোন ধরনের ময়লা নেই এবং আমি বললাম, হুজুর (দ.)’র জীবন ও বিদায় কতই না পবিত্র। তিনি আরো বর্ণনা করেন, প্রিয় নবী (দ.)’র গোসলের সময় অদৃশ্য হতে সাহায্য আসছিল। তাঁর দেহ মোবারক ওলটপালন করার সময় অদৃশ্য হতে কাজ করতে দেখেছি।
প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের খবর বিখ্যাত সাহাবী হযরত মুয়াজিন ইবনে জায়েদ আনসারী (রা.) যখন শুনতে পেয়ে চরম আহত হয়ে বেদনাবিধুর মনে দোয়া করতে লাগলেন, ‘প্রভু তুমি আমাকে অন্ধ করে দাও। এই পৃথিবীর মধ্যে থাকার যোগ্য আমি নই। সাথে সাথে তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন। এমন দোয়া কোন করলেন, তাঁর সাথে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, প্রিয় নবী (দ.)’র পর এখন আমার চোখ দিয়ে কিছু দেখার ইচ্ছে আমার আর নেই। ( সহায়ক গ্রন্থ : শাওয়াহেদুন নবুওত, লেখক-আল্লামা আবদুর রহমান জামী (রা.)।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক