প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী

2

 

আগামী ২০২৩ সাল হতে জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় প্রাথমিক হতে অষ্টমশ্রেণি পর্যন্ত কোন পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। ২০১০ সালে অনুমোদিত শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে প্রাথমিক পর্যায় ধরে অষ্টম শ্রেণির পূর্বে কোন পাবলিক পরীক্ষা তথা সার্টিফিকেট পরীক্ষা রাখা হয়নি। শিক্ষানীতি শিক্ষাসম্পর্কিত যুগোপযোগী একটি চলমান প্রক্রিয়া। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষানীতি ২০১০ মন্ত্রীপরিষদ ও সংসদে অনুমোদন করেছিলেন। কোন অজানা কারণে শিক্ষানীতি ২০১০ এখনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চালু করা হয়নি। হয়তো শিক্ষানীতি ২০১০ এর মধ্যে জাতীয় শিক্ষার উন্নতি অগ্রগতি এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, শিক্ষানীতি সার্বজনীন, বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুগোপযোগী শিক্ষা বিষয়ক একটি ব্যবস্থাপত্র। এতে কিছু সমস্যা হয়তো আছে। সমস্যা থাকলে তা সংশোধন করা যায়। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন খাত হিসেবে চিহ্নিত করে সার্বিক শিক্ষা জাতীয়করণের পরামর্শ রয়েছে। প্রত্যেক আধুনিক দেশে জাতীয় শিক্ষানীতির ভিত্তিতে দেশসমূহের শিক্ষা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পঞ্চাশ বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও দেশে কোন শিক্ষানীতি প্রবর্তন করা হয়ে উঠেনি। যার ফরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা হ য ব র ল অবস্থা বিরাজ করছে। একদিকে সাধারণ শিক্ষা, অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা, একদিকে কেজি স্কুল অন্যদিকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, একদিকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা। ফলে দেশে নানা মনমানসিকতা ও বিচিত্র রকমের শিক্ষিত বের হচ্ছে দেশের শিক্ষালয় হতে। যার কারণে আমাদের জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ হতে দেশপ্রেমিক, নৈতিক, মানবতাবাদী নাগরিক সৃষ্টির বিপরীতে, দেশদ্রোহী, অনৈতিক, দুর্নীতিবাজ, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থবাদী লোক বের হচ্ছে অহরহ।
বিগত ২০২০ সালের মার্চ হতে ১৮ মাসের অধিক সময় করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ ছিল। সমগ্রদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মুখথবড়ে পড়েছিল। কোভিড-১৯ জনিত কারণে শ্রেণিকার্যক্রম বন্ধ ছিল। শিক্ষামন্ত্রণালয় যদিও বলেছে অনলাইন এবং এসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষাকে সচল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একাডেমিক শিক্ষা শ্রেণি কার্যক্রম ছাড়া চলতে পারে না। অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রমে দেখা যায় মাত্র ১০ শতাংশের ও কিছু কম শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষায় উপকৃত হয়েছে মাত্র। সার্বিক ভাবে বিগত ১৮ মাসে দেশের শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়। অবশেষে সীমিত ভাবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুলে দেয়া হলেও পূর্ণমাত্রায় শিক্ষা কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। ইতোমধ্যে সরকারি ঘোষণা এসেছে আগামী ২১ অক্টোবর থেকে দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে ডিগ্রিপর্যায়ের সকল শ্রেণি কার্যক্রম খুলে দেয়া হবে। এর ফলে ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসবে। প্রাথমিক হতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় চালু করা প্রয়োজন মনে করে দেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়ার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহও খুলে যাচ্ছে। বিষয়টা সমগ্র জাতির জন্য আশাব্যঞ্জক।
করোনা ভাইরাস দেশ হতে একেবারে চলে যায়নি, শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কমেছে মাত্র। এমতাবস্থায় নামমাত্র এস এস সি ও এইচ এস সি পরীক্ষা অনুুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সামনে ডিসেম্বর মাস। ডিসেম্বরে দেশের প্রাথমিক হতে নবম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল ও মাদ্রাসায় বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। জানুয়ারি থেকে দেশে নতুন শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়। সীমিতভাবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি বিষয়ে নানা প্রশ্ন এখনো উঁকিঝুঁকি মরছে। তাই ২০২১ সালের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা কেন্দ্রিয়ভাবে না নেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একটি প্রস্তাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠালে প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন করেন। এজন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই। আসলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট পরীক্ষার মুখোমুখি করা অযৌক্তিক। সার্বিক বিবেচনায় ২০২৩ সালে প্রাথমিক হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষা উঠিয়ে দেয়া উদ্যোগ সময়োচিত। মন্ত্রণালয় বর্তমানে যে পদ্ধতিতে মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ শ্রেণিতে প্রমোশন চিন্তা করেছে তা বজায় রেখে ২০২২ সালের প্রাথমিক হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষাসমূহও বাতিল করা যায়।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে জগাখিচুড়ি অবস্থা চলছে তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলে বাতিল করে শিক্ষানীতি ২০১০ দেশে বাস্তবায়ন করতে পারেন। সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি ছাড়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চলছে বলেই দেশের শিক্ষার মান যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি দেশে সম-মনমানসিকতার নীতিবাদী শিক্ষিত লোক তৈরি হচ্ছে না। দেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে শিক্ষা বিষয়ে একটি আমূল পরিবর্তন সাধন সম্ভব। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করে, শিক্ষাকে উন্নয়নখাতে হিসেবে ধরে, দেশের সার্বিক শিক্ষার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করলে এ দেশ সমগ্র বিশ্বে দ্রুত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এতে সন্দেহ নেই।