প্রাণবন্ত শিক্ষক রশিদ স্যারের মৃত্যু

107

 

রশিদ স্যারের ইন্তেকালের খবর শুনে খুবই খারাপ লাগল/ কারণ তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক/ ২৮ জুন ২০২১ সাল সকাল সাড়ে দশটায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। রশিদ স্যারের নাম ড.মুহাম্মদ রশিদ বাড়ি মোহাম্মদপুর, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের অসাধারণ খ্যাতিমান প্রফেসর। ১৯৮১ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিভাগে বিএ অর্নাস ১ম বর্ষে ভর্তি হই। তখন আমার মন ভাল ছিল না। কারণ ইংরেজি বিভাগ আমার প্রথম পছন্দ। যদি তা না হয় অন্তত বাংলা বিভাগে পড়াশুনা করব। এর পেছনে কারণ হল- আমি মাদরাসায় পড়া অবস্থায় শেক্স পিয়ার, এডগার এলেন পো, র্জজ গার্ডন বায়রন, পর্সি বিস শেলী, জন কীটস সহ ইংরেজি সাহিত্যের অনেকের জীবনী ও সাহিত্যকর্ম স্টাডি করি। একই সাথে বাংলা সাহিত্যের উপর প্রচুর লেখাপড়া করি। কেউ আমাকে পড়তে বলে নি, মনের খেয়ালে পড়েছি। মনের ভেতর দুর্বার ইচ্ছা- একদিন নামকরা লেখক হব। এই জন্যই নিজেকে তৈরী করছিলাম। দুর্ভাগ্য মাদরাসা থেকে এসেছি বলে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইংরেজি বিভাগ ও বাংলা বিভাগে আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে দেয় নি। সুতরাং ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে আরবি বিভাগে ভর্তি হই। পরের বৎসর আবার চেষ্টা করব, ইংরেজি অথবা বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার। যদি ওদিকে চান্স পাই তাহলে আরবি বিভাগ ত্যাগ করব। এরূপ মানসিকতায় ক্লাসে প্রাণহীন ভাবে উপস্থিত থাকতাম। কিন্তু একদিন আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মত একটা কাজ হল। আমার প্রাণহীন দেহে আচমকা প্রাণ এনে দিলেন রশিদ স্যার। এটা ছিল আমাদের জন্য রশিদ স্যারের প্রথম ক্লাস। সবুজ বৃক্ষের ছায়াঘেরা পাহাড়ের সাথে লাগানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ। ভবনের মাঝামাঝি ৩য় তলায় আমাদের ক্লাস রুম। সেদিন ছিল কাআব বিন যুহাইরের কবিতার ক্লাস। এ ছিলো জাহিলি যুগের এক খ্যাতিমান কবির আরবি কাব্য। (অবশ্য পরে কাআব বিন যুহাইর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।) ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চে আমি বসা। বই খুলব ভাব। এমন সময় স্যার ক্লাসে ঢুকলেন।
পরনে হালকা নীল র্শাট। চোখে মুখে তরতাজা হাসি খুশি ও ভাব- গাম্ভির্যের আকর্ষণীয় ছাপ। স্যার লেকচার শুরু করলেন। আমি চমকে উঠলাম। উপক্রমনিকায় বলা স্যারের কথায় অসাধারণ জ্ঞানের দ্যুতি ছিল। এবার স্যার শুরু করলেন-
বানত সুয়াদু ফাকা লবিল য়াওমা মাবতুলু- অনুবাদ, কাব্যিক ব্যঞ্জনা, কবির কল্পনা ও পটভূমি এত চমৎকার পড়াচ্ছিলেন যে, আমার হৃদয় নেচে উঠল। তখনই হঠাৎ মনে হল আমি কেন বাংলার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বুদ্ধদেব বসু, প্রভাত কুমার, তারাশংকর পড়ার জন্য পাগল হচ্ছি, কেন আমি ইংরেজি সাহিত্যের শেকস পিয়ার, সমারসেট মম, পড়ার জন্য ব্যাকুল হচ্ছি, আরবি সাহিত্যও তো বেশ সমৃদ্ধ। তখন থেকেই রশিদ স্যারের ক্লাস আমার কাছে ছিল মনোমুগ্ধকর। সে সময় আরবি বিভাগে আমাদের অন্যান্য সকল শিক্ষকই খুবই জ্ঞানী- গুণী ছিলেন। সকলেই ভাল পড়াতেন।
ক্লাসে আমার পারফরম্যান্স কেমন ছিল জানি না। ১ম বর্ষ অর্নাস পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট আশাতীত ভালো হলো। দ্বিতীয় বর্ষ ক্লাস করতে না করতে রশিদ স্যার একদিন ডেকে আমার পরিচয় জেনে নিলেন। আমার প্রতি স্নেহ পরশ বুলিয়ে দিলেন। রশিদ স্যার ক্লাসে থাকতেন ভাব গম্ভীর। ক্লাসের বাহিরে যেন সকলের কত আপন। তাঁর আচরণে সরল বন্ধুত্ব প্রকাশ পেত। স্যার তখন পিএইচডি গবেষণায় কর্মরত। একদিন আমাকে বললেন বাসায় আসিস। তোর সাথে একটু কথা আছে। বাসায় গেলাম। স্যার আমাকে বললেন, আমি তোদের বাড়িতে যাবো। তোর মা কিছু বলবে না তো? আমি অবাক হলাম। খুশিও হলাম। আমি নিশ্চিত জানি, রশিদ স্যার আমার বাড়িতে গেলে আমার মা বাবা পরম যত্নে আতিথেয়তা করবেন। আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম, স্যার এ তো সৌভাগ্যের কথা। আমার মা খুবই খুশি হবেন। আপনি আমাদের বাড়িতে গেলে। স্যার, একটু হাসলেন। আমার জবাব শুনে খুশি হলেন। এবার বললেন-
তোদের বাড়ি থেকে মির্জাখীল দরবার শরীফ কাছে না? আমি বললাম, মাত্র ১ কিলোমিটার। স্যার বললেন, আমি ঐ দরবারে যাবো। আমার কাজ আছে। আমি ওখান থেকে ফিকহ শাস্ত্রের কিতাব সংগ্রহ করব। বুঝতে পারলাম, গবেষণার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য স্যার সাতকানিয়ার মির্জাখীল যাবেন। স্যারের গবেষণা অভিসন্ধর্ভের শিরোনাম Muslim Contribution to the Fish literature in Bengal. কথা মতে, তিনি একদিন আমাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসলেন। রাত্রে আমাদের বাড়ীতে থাকলেন। পরদিন সকালে আমি ও স্যার মির্জাখীল দরবারে গেলাম। এভাবে স্যারের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতে করতে স্যারের বন্ধুসুলভ আন্তরিকতার জালে আবদ্ধ হয়ে সত্যি আমি স্যারের একজন ভক্ত খাদেম হয়ে গেলাম। যাওয়া আসা, কাজকর্মে সব মিলিয়ে স্যারের তিন ছেলে ও এক মেয়ে আমার ভাই বোনে পরিণত হল। স্যারের বড় ছেলে শামিম বর্তমানে ডাক্তার। দ্বিতীয় ছেলে নাসিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক, তৃতীয় ছেলে শিবলী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মেয়ে চঞ্চু দর্শনে অনার্স মাস্টার্স পাস। মার্ক টোয়েনের লাইব্রেরীর কথা সৈয়দ মুজতবা আলী তার ‘বই কেনা” প্রবন্ধে লিখেছেন মার্ক টোয়েনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ছিল বিশাল। তবে সাজানো গোছানো নয়। আলমিরা বা সেলফের বালাই ছিল। সারা ঘরময় ছড়িয়ে ছিল বই আর বই। রশিদ স্যার ও ছিলেন দারুন বই প্রেমী। স্যারের ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে ছিল অসংখ্য দুলর্ভ কিতাব ও বই। স্যারের বাসায় ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর অবস্থা দেখে আমার মার্ক টোয়েনের লাইব্রেরীর কথা মনে পড়ত। পড়াশুনার পাশাপাশি স্যার আমাকে দুইটি বিষয়ে সচেতন হতে বলতেন, একটি হলো স্বাস্থ্য অপরটি হলো ব্যক্তিত্ব। স্যার সব সময় নীল রংয়ের শার্ট পরতেন। অন্য কোন রং বা ডিজাইনের কাপড় পরতেন না। আমি একদিন স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম,
স্যার আপনি শুধু নীল শার্ট পরেন কেন?
স্যার মৃদু হেসে বললেন, নীল শার্ট গায়ে দিলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। স্যারের অনেক কিছু অনুসরণ করেছি। নীল শার্ট গায়ে দেওয়ার চিন্তা ও করেছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে আমার মাথায় চেপে বসেছে যে, নীল হলো বেদনার রং। তাই নীল শার্ট গায়ে দিলে আমার কেমন কেমন লাগে। ছাত্র জীবনে যেমন স্যারের সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে তেমনি কর্ম জীবনেও। কারণ ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত স্যারের ছাত্র ছিলাম। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে আরবি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করি এবং এ সুবাদে রশিদ স্যারের সহকর্মী হই। সহকর্মী হতে পারি বটে কিন্তু সেটা মনে আসত না। আমি চির কালই রশিদ স্যারের ছাত্র এবং একজন দোয়া প্রার্থী খাদেম এটাই মনে হত।
রশিদ স্যার কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। আবার কওমী মাদ্রাসার নামকরা শিক্ষকও ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। তিনি ছিলেন মুক্ত চিন্তার মানুষ। রশিদ স্যারের চিন্তাধারা ছিল আধুনিক। তিনি মুিক্তযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকগনও তাকে বেশ সম্মান করতেন।
পৃথিবীর এতরূপ শোভা হাসি গান
ছাড়িয়া মরিতে মোর কভু নাহি চাহে মন প্রাণ
তবু ও তো মানুষকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
রশিদ স্যার চলে গেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জ্ঞানপ্রদীপ নিভে গেল। রশিদ স্যারের বিদায় মানে বাংলাদেশের একজন বরেণ্য আলিমের বিদায়।
লেখক: উপাচার্য়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা