প্রাকৃতিক পরিবেশ, একটি হাসপাতাল ও নগরবাসীর আকাক্সক্ষা

3

 

চট্টগ্রাম শহরের সিআরবি শিরীষতলা দিয়ে হেঁটে গেলে অন্যরকম একটা অনুভূতি জাগে। এখানকার সবুজ নির্মল পরিবেশ যেকোনো মানুষকে এক নিমিষেই চাঙা করে দেয়। মানবদেহে এমন অনুভূতি প্রকৃতির প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণেই ঘটে। প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে হৃদয়ের এমন সুন্দর সংযোগের সাথে যুক্ত আছে সবুজ বৃক্ষের প্রতি মানুষের শিহরিত আবেগ ও ভালোবাসা। কেননা মানুষের সুখানুভূতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রকৃতি। যা শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার সুস্বাস্থ্যের জন্য অনস্বীকার্য। পরিবেশ মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যার কারণে আদিকাল থেকে সুন্দর পরিবেশের সাথে মানুষের জীবন-যাপনের রয়েছে সরাসরি যোগসূত্র। প্রকৃতি মানুষের জীবনী শক্তির প্রধান উৎস। এর সাথে মানুষের সম্পর্কটা গভীর। যেটা অনেকেই ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পারি না। অথচ এই পরিবেশের ওপরই নির্ভর করছে মানুষের অস্তিত্ব। মানুষের নিজস্ব সত্তার উপলব্ধির জন্য প্রকৃতির রয়েছে মৌলিক অবদান।
রবীন্দ্রনাথ ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় বলেছেন, ‘অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহŸান/প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ;’ পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির আগে সৃষ্টি হয়েছিল গাছ। রঙে রঙে সেজেছিল প্রকৃতি। মানুষ সৃষ্টির পর বনই ছিল তাদের অন্যতম আশ্রয়। মানুষ ছাড়া প্রকৃতি বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া মানুষ কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষকে বাঁচতে হলে অবশ্যই অক্সিজেন দরকার। আর সে অক্সিজেন দেয় গাছ। এমনই প্রাকৃতিক গাছগাছালি সমৃদ্ধ চট্টগ্রামের অস্থিত্বের অপর নাম সিআরবি। সবুজের এমন নান্দনিক সমারোহ পুরো চট্টগ্রাম শহর জুড়ে আর দ্বিতীয়টি নেই। এতটুকু প্রশান্তির নির্মল আশ্রয়স্থল যেন এই শিরীষতলা। ব্রিটিশ আমলের লাল ভবনকে ঘিরে শতবর্ষী মাতৃবৃক্ষ, পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তা, ছোট-বড় পাহাড়-টিলা আর নজরকাড়া বাংলোগুলো ঘিরে মন জুড়ানো এক প্রাকৃতিক পরিবেশে সাজানো। এখানে আসলেই নেয়া যায় স্বস্তির নিঃশ্বাস আর এই শ্রান্তির প্রধান আধার হলো শতবর্ষী মাতৃবৃক্ষ। যা ‘চট্টগ্রামের ফুসফুস’ নামে খ্যাত। আর এই ফুসফুসকে ধ্বংসের অংশ হিসেবে এখানে বড়সড় হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সরকারি জায়গায় বেসরকারি বাণিজ্যিক স্থাপনা কোনোমতে মেনে নেয়া যায় না। কেননা সিআরবি চট্টগ্রামের কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক কারখানা। নিজেই একটি প্রাকৃতিক হাসপাতাল। এটাকে বিনষ্ট করে কিছু হোক সেটা আমরা চাই না। এই জন্য আমরা চিন্তিত, অধিক উদ্বিগ্ন। হাসপাতাল করার জন্য চট্টগ্রামে অনেক জায়গা থাকলেও শতবর্ষী গাছ, পাখির কোলাহল, বসার জায়গা, হাঁটাহাঁটির পথ, প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে কংক্রিটের ভারি স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন খুবই দুঃখজনক।
মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে প্রকৃতিকে আগে বাঁচতে দিতে হবে। তাই প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার না করে তাদের সঙ্গে মৈত্রীময় সম্বন্ধ স্থাপন করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে না করলে প্রকৃতি তার উল্টো ফল দেবেই। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষ তার জীবনধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে না পারার কারণে যে বিপর্যয়- এ শিক্ষা তো করোনাই শিখিয়ে গেল। আমাদের প্রাণের সংরক্ষক হচ্ছে প্রকৃতি-এই বোধ মানুষের মনে জাগ্রত হচ্ছে না। যার ফলে আমরা এমন আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত নিতে কুণ্ঠাবোধ করছি না। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ সুখী-স্বাস্থ্যবান হতে পারে না। বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের কথা চারদিকে শুনা যায়। কিন্তু মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রকৃতির অবদানকে আমাদের সামাজিক অগ্রগতির মাপকাঠিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। টেকসই সমাজ নির্মাণে প্রকৃতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও এই পরিমাপে প্রকৃতিকে দেখা হচ্ছে না। অথচ প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে প্রকৃত কোনো সূচক হয় না। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও সৃষ্টিতে যে লাভ-ক্ষতি সেটাকেও বিবেচনায় আনতে হবে। পরিবেশবাদী চিন্তক জুডিথ স্লাইশার ও ভাস্কর ভিরা এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে তাঁরা মানব উন্নয়ন ও কল্যাণের মাপকাঠিতে প্রকৃতিকে বিবেচনার দাবি করেছেন।
কিন্তু রাষ্ট্র তথা উন্নয়নকামীরা এসব ভাবনার মধ্যে আদৌ কি আছে? আমরা তো দেখছি অহরহ প্রকৃতির মৃত্যু হচ্ছে। অপরাধ ছাড়াই প্রকৃতিকে মৃত্যুদন্ড দিচ্ছে মানুষ। এই কিছুদিন আগেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উন্নয়নের অংশ হিসেবে গাছ কাটা নিয়ে চলছিল ব্যাপক সমালোচনা। তারও কিছুদিন আগে উন্নয়নের নামে আদিবাসী উচ্ছেদ পরিকল্পনা ও বন-প্রকৃতি ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়ে হলো হট্টগোল। জনমনে প্রশ্ন উঠছে, কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারের নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আসলেই কতটা প্রকৃতি এবং মানুষের কথা ভেবে করা হচ্ছে? তা নাহলে হাজার বছরের গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম এই উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিসর, যেটি নগরীর লাখ লাখ মানুষকে সতেজ শ্বাস নিতে সহায়তা করেছে, যেটি সংস্কৃতি অঙ্গন ও বিনোদনের অন্যতম তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে, যা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে, সেখানে কেন হাসপাতাল করতে হচ্ছে? চট্টগ্রামে অনেক খালি জায়গা থাকার পরেও এখানেই কেন পরিকল্পনা নেওয়া হলো তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে স্থাপিতব্য অন্যান্য স্থাপনাগুলো সিআরবি’র পুরো পরিবেশটাকে কদর্য করে তুলবে। তাই শুধু গাছ না কাটা আমাদের দাবি নয়, বরং কোনো স্থাপনাই ওখানে কাম্য নয়।
এই ন্যায্য দাবিতেই চট্টগ্রামের সচেতন মহল, বৃহত্তর নাগরিক সমাজ এই স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠছে। চট্টগ্রামে হাসপাতাল অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু সিআরবিতে নয়। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বন, পাহাড় ধ্বংস করে সিআরবিতে শুধু হাসপাতালই নয়, কোনো ধরনের স্থাপনাই করা উচিত নয় বলে মনে করি। তাই এ ধরনের হটকারী সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছে নগরবাসী। একই সাথে চট্টগ্রামের ফুসফুস ও বুকভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্থানটিকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণেরও দাবি ওঠেছে।
আমরা হাসপাতাল চাই, তবে তা হোক অন্যত্র। প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে পুঁজিপতিদের ব্যবসার সুযোগ করে দিয়ে শিরীষ তলার মনোরম সৌন্দর্য নষ্ট করার পক্ষে মোটেই নয়। কোনোমতেই উন্নয়নের নামে ভুলের ফাঁদে পা দিয়ে বেসরকারি কর্পোরেটজীবীদের দুর্নীতির আগ্রাসনের কাছে প্রকৃতিকে সঁপে দেয়া যাবে না। বরং আমরা চাই জনআকাক্সক্ষাকে মর্যাদা দিয়ে সিআরবিকে ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করে একে সর্বাত্মক সংরক্ষণ করা হোক। আমরা এই হীন চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।