প্রস্টেট ক্যানসার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

7

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

প্রস্টেট ক্যানসার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রয়োগ সংকেত নিয়ে আজকের নিবন্ধ। পুরুষদের প্রস্টেট গ্রন্থির ক্যানসারকেই প্রস্টেট ক্যানসার বলে। প্রস্টেট গ্রন্থির বাইরের অঞ্চলে সাংঘাতিক বৃদ্ধি। ইহা পুরুষদের সাধারণ ক্যানসারগুলোর অন্যতম। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়স হলে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। প্রস্টেট ক্যানসার কখনো কখনো মধ্য বয়সে হতে দেখা যায়। কিন্তু প্রায় বয়স্ক বা বৃদ্ধ ব্যক্তিদের হয়ে থাকে। টেস্টোস্টেরোন হরমোন ইহার সঙ্গে জড়িত।

প্রস্টেট গ্রন্থি কি : শুধুমাত্র পুরুষদেরই প্রস্টেট গ্রন্থি রয়েছে। এর আকার অনেকটা কাজুবাদামের সমান। মূত্রথলির নিচ থেকে যেখানে মূত্রনালী বের হয়েছে সেটির চারপাশে জুড়ে এই গ্রন্থিটি বিদ্যমান। এর মধ্যে দিয়েই মূত্র এবং বীর্য প্রবাহিত হয়। এই গ্রন্থির মূল কাজ হচ্ছে বীর্যের জন্য কিছুটা তরল পদার্থ তৈরি করা। যৌনকর্মের সময় যে বীর্য স্থালিত হয় সেটি আসলে শুক্রানু এবং এই তরল পদার্থের মিশ্রণ।

প্রস্টেটের লক্ষণ ও নিদর্শন : কোনো কারণে যদি প্রস্টেট বড় হয়ে যায় তাহলে মূত্রনালীর মুখ সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে মূত্র বের হতে সমস্যা হয়। সাধারণত প্রস্টেটের তিন ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সাধারণ প্রসারণ (বি পি এইচ) প্রস্টেটের প্রদাহ (একে প্রস্টাইটিসও বলে) এবং প্রস্টেট ক্যানসার। এই সবগুলোর ক্ষেত্রেই সাধারণত একই রকম লক্ষণ দেখা যায়। যেমন :-
* ঘনঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায়।
* প্রস্রাবের প্রচন্ড বেগ পাওয়া এমনকি মাঝে মাঝে বাথরুমে যাওয়ার আগেই প্রস্রাব করে ফেলা।
* প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া।
* প্রস্রাব করতে প্রচুর সময় লাগে।
* প্রস্রাবে বেগ থাকে না।
* প্রস্রাব করার পরেও মূত্রথলিতে প্রস্রাব রয়েছে এমন অনুভব হওয়া।
এছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ মাঝে মাঝে দেখা যায় ঃ
* প্রস্রাব করার সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* বীর্যপাতের সময় যন্ত্রণা হওয়া।
* অন্যকোষে ব্যথা।
এই লক্ষণ বা উপসর্গগুলোর এক বা একাধিক যদি আপনার মধ্যে
দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে যাতে করে কি কারণে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে সেটা নির্ধারণ করা যায়।
প্রস্টেট ক্যানসার কিভাবে সংগঠিত হয় : পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যানসার খুবই সাধারণ। প্রস্টেট গ্রন্থির মধ্যে কোষগুলো যখন
অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে তখনই ক্যানসার হতে পারে, সাধারণত ৫০ বছরের পর পুরুষদের প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর চাইতে কম বয়সেও প্রস্টেট ক্যানসার হতে পারে, কিন্তু সেটা সচরাচর দেখা যায় না। বয়স যতো বাড়তে থাকে, প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ততোই বেড়ে যায়। পরিবারের কারো যদি (ভাই কিংবা বাবার) প্রস্টেট ক্যানসার থাকে তাহলেও ঝুঁকির সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকখানি।
প্রস্টেট ক্যানসার হলে আগে যেসব লক্ষণ বলা হয়েছে সেগুলোর সাথে আরো যেসব লক্ষন দেখা দিতে পারে- ১) পিঠের নিচের দিকে ব্যথা ২) লিঙ্গোস্থানে সমস্যা ৩) নিতম্ব বা তার আশে পাশে নতুন করে ব্যথা দেখা দেয়া। ৪) বীর্য কিংবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, কিন্তু এটা খুবই কম দেখা যায়। ৫) প্রস্রাবের লক্ষণ না থেকেও ক্যানসারের গৌণ বৃদ্ধির ফলে হাড়ে যন্ত্রণা প্রথম প্রমাণ বা লক্ষণ হতে পারে। ৬) টিউমার মূত্র নিঃসরণে সমস্যার সৃষ্টি করে। ৭) অবশেষে মূত্র প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ৮) মূত্রনালি পুরোপুরি অবরোধের ফলে নতুবা মূত্রথলি ও মূত্রবাহী নালিতে ক্যানসার বিস্তারের ফলে
এরূপ হতে পারে। পরিণত ক্ষেত্রে পেলভিসে স্নায়ুগুলোর জড়িত থাকার ফলে বা হাড়ে ক্যানসার বিস্তারের ফলে যন্ত্রণা হয়।
ক্যানসার পরীক্ষার সবগুলো উপসর্গের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন নেই। কারণ বেশিরভাগ
সময়েই প্রস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। প্রস্টেট খুব ছোট একটা অঙ্গ হওয়ায় খুব বড় কোন ধরনের লক্ষণ বুঝতে পারা যায় না। তাই উপরের উপসর্গগুলোর এক বা একাধিক যদি দেখা যায় তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের পরীক্ষার জন্য যাওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয় ঃ যেকোন সন্দেহ নিরসনের জন্য আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানিংও বাইয়োপসি করা যায়। ক্যানসার বিস্তার লাভ করেছে কিনা জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা ও হাড়ের স্ক্যান করা দরকার।

পিএসএ টেস্টে ঃ প্রস্টেট গ্ল্যান্ড থেকে পিএসএ নামে এক ধরনের আমিষ বা প্রোটিন তৈরি হয়, একে পিএসএ (প্রোস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন) রক্তে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পিএসএ থাকে। কিন্তু কোনো সমস্যা দেখা দিলে এই মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ৬০ বছরের একজন পুরুষের রক্তে পিএসএ-র স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে-৪। এর জন্য কম বয়সীদের রক্তে এর মাত্রা একটু কম, এবং বেশি বয়সীদের রক্ত এর মাত্রা একটু বেশি থাকে।

ডিজিটাল রেক্টাম এক্সামিনেশন (ডিআরই) : পিএসএ টেস্ট করার পর সাধারণত এই পরীক্ষা করা হয়। মলদ্বার দিয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ডাক্তার প্রস্টেটের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রোস্টেটের ওপর কোন শক্ত জায়গা কিংবা প্রোস্টেটের আকার বড় হয়ে গেছে কিনা সেটাই তিনি বোঝার চেষ্টা করেন। এই পরীক্ষায় কোন ব্যথা অনুভ‚ত হয় না। তাই পরীক্ষার ব্যাপারে অনেকেরই বিব্রতভাব থাকলেও পরীক্ষাটার জন্য খুবই অল্প সময় লাগে।

আনুষাঙ্গিক চিকিৎসা : টেস্টোস্টেরোনের মাত্রা কমানো দরকার। ক্যানসার ক্ষুদ্র ও প্রস্টেট গ্রন্থির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও রোগী যথেষ্ট বয়স্ক হলে প্রয়োজনে ওষুধ প্রয়োগ করুন। তাই সব ক্ষেত্রে ক্যানসারের কোনরকম লক্ষণ ছাড়াই অন্য কোন কারণে রোগী মারা যায়।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : প্রস্টেট ক্যানসার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অনেক কার্যকর ওষুধ আছে। প্রস্টেট ক্যানসার অত্যন্ত জটিল রোগ। তাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে নির্দিষ্ট মাত্রা লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। যথা- ১) এমনমিউর, ২) ) লাইকোপোডিয়াম, ৩) এসিড ফস, ৪) স্যাবল সেরু, ৫) কোনিয়াম, ৬) থুজা, ৭) ক্যালকেরিয়া, ৮) ক্রোটেলাস, ৯) কার্সিনোসিন, ১০) আর্নিকা ১১) পালসেটিলা ১২) মার্ক-বাই ১৩) আর্জেন্ট নাইট্রিকাম ১৪) এসিড বেনজো ১৫) কেলি আয়োড ১৬) হিপার সালফার ১৭) সালফার ১৮) ক্যান্থারিস, ১৯) কষ্টিকাম, ২০) স্ট্যাফিসেগ্রিয়া, ২১) ক্যালি সাইয়েনেট, ২২) কোনিয়াম সহ আরো অনেক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

লেখক : হোমিও চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক