প্রসঙ্গ: সামাজিক অনুষ্ঠানে ভিআইপি মেহমান এবং কিছু কথা

9

এস.এম. মোখলেসুর রহমান

বিয়ে, মেজবান, আকিকা সহ যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ভিআইপি লোকদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য ইদানিং এক শ্রেণির মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ খুব উদগ্রীব থাকেন। এরা যেকোনো উপায়ে ভিআইপি লোকদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য এবং অনুষ্ঠানে আনার জন্য যত রকম কৌশল প্রয়োগ করতে হয় সব কৌশল প্রয়োগ করেন। এদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এরা সমাজের কিছু মানুষকে বুঝাতে চান ভিআইপি লোকদের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক আছে। তাই ভিআইপি লোকরা অকপটে তাদের দাওয়াতে চলে এসেছেন! কিন্তু আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সকল লোকদের অধিকাংশকেই ভিআইপি লোকরা ভালোভাবে চিনেন ই না। এরা কারো কাছের লোকের মাধ্যমে দাওয়াত পেয়ে অনুষ্ঠানে আসেন এবং এসে একটা ফটোসেশন করে চলে যান। অনেকে ভাতও খান না। আবার কিছু ভিআইপি মেহমান অনেকক্ষণ থাকেন এবং তাদের সাথে আসা বহর নিয়ে ভাতও খান। তবে যারা ভাত খাননা তাদের জন্য আয়োজককারীরা তেমন অসন্তুষ্ট হননা। কারণ তাদের মূল উদ্দেশ্য ফটোসেশন এবং পরবর্তীতে এর অপব্যবহার করা।
আমি ভিআইপি লোককে দাওয়াত দেওয়ার বিপক্ষে নই। ভিআইপি লোকরা অনুষ্ঠানে আসলে অনুষ্ঠান কিছুটা আলোকিত হয় এটা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মন্ত্রী, এমপি কিংবা এই পর্যায়ের রাজনৈতিক ভিআইপি লোকদের আমরা কারা দাওয়াত করবো। যারা ভিআইপির সমমানের তারা নাকি গণহারে সবাই! এই ক্ষেত্রে আমি মনে করি যাদের সাথে ভিআইপি লোকদের আত্মীয়তা আছে, সখ্যতা আছে কিংবা নিকটতম প্রতিবেশী তারাই কেবল দাওয়াত দিতে পারে এবং এক্ষেত্রে দাওয়াত দেওয়াটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু খুব একটা চেনা জানা নেই কেবল অন্যের মাধ্যমে ভিআইপি লোকদের দাওয়াত দেওয়ার পক্ষে আমি নই। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষেত্রে। উচ্চবিত্ত কিংবা অতি উচ্চ বিত্তরা মানে শিল্পপতিরা এমনিতেই ভিআইপি লোকদের সাথে উঠাবসা করে, সুতরাং তারা তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানে ভিআইপি লোকদের দাওয়াত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমি চট্টগ্রামের অনেক বনেদী পরিবারের বিয়ে, মেজবান সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার আমন্ত্রণ পাওয়ার এবং অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। তাতে আমি লক্ষ্য করেছি এ সমস্ত বনেদী পরিবারের অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, এমপি, বড় দলের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা, মহানগরীর সভাপতি, সেক্রেটারি, পুলিশ কমিশনার সহ সব ধরনের ভিআইপি মেহমানরা ঘুরে ফিরে প্রায় সবার অনুষ্ঠানে যান! বলা যায় এরা তালিকাভুক্ত ভিআইপি মেহমান। শিল্পপতি কিংবা উচ্চ বিত্তরা এদের দাওয়াত দিবেনই। কিন্তু মধ্যবিত্তের ব্যাপারে প্রশ্ন আছে । কারণ অনেকে ভিআইপি লোকদের বিভিন্ন কৌশলে দাওয়াত দিয়ে এনে পরবর্তীতে আবার সমাজের কিংবা কোনো আত্মীয়ের সাথে মনমালিন্য হলে এ সমস্ত ভিআইপি মেহমানদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
তেমনি এক পরিবারকে দেখেছি প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়ের সাথে কোনো বিষয় নিয়ে মনমালিন্য হলে তখন তারা ভিআইপি মেহমানদের কথা তুলে ধরেন। বলেন- ওমুক মন্ত্রী, এমপির সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক। এই মন্ত্রী-এমপিরা আমাদের অনুষ্ঠানে আসলে আমাদের বাবাকে বদ্দা বদ্দা বলে গলা শুকিয়ে ফেলে। আরেকজন আরেকটু আগ-বাড়িয়ে বলেন- আমাদের বাবার সকালে ঘুম ভাঙ্গে মেয়র কিংবা এমপির ফোন কলে! সুতরাং আমাদের সাথে কথা বলতে হবে খুব হিসাব করে। তো এরা যাদের উদ্দেশ্যে এই মহা ফাঁকা বুলি ছুড়েন তারা যদি নিরহ টাইপের লোক হয়, নির্ঝঞ্ঝাট লোক হয় কিংবা গ্রামের অশিক্ষিত রিক্সাওয়ালা, সিএনজিওয়ালা, সিএনজি মেকানিক, লবন ব্যাপারী, ছাতা ব্যাপারী এই টাইপের লোক হয় তাহলে প্রথমে তারা একটু ভরকে যান। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা যখন জানতে পারেন- এরা মন্ত্রী-এমপির কাছে সহজে যেতে পারেন না, অন্যের মাধ্যমে যান, তখন সিএনজি মেকানিক কিংবা লবন ব্যাপারীও এদের দুই পয়সার পাত্তা দেন না। ফাঁকা বুলি, অসত্য বচন ক্ষণিকের রসদ। এই গাধাগুলি সেটা বুঝে না। এরা বুঝে ভিআইপি লোককে এরা অনুষ্ঠানে আনতে পেরেছে এটাই তাদের বাহাদুরী। আরে বাবা ভিআইপি সদস্যদের সাথে সখ্যতা থাকলেও সেটা নিয়ে কী মানুষকে হুমকি দেওয়া যায়? কথায় কথায় তাদের ব্যাপারে বলা যায়। এক্ষেত্রে বিনয়ী হতে হয়। তবেই মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পাওয়া যায়। একটা কথা আছে না- মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় তার কর্মে এবং ব্যবহারে। দাম্ভিকতা, হুমকি, ধমকি দিয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। মন জয় করা যায় না। শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না। আমরা জানি শ্রদ্ধা তিন প্রকার: (১) ভক্তির শ্রদ্ধা (২) ভয়ের শ্রদ্ধা এবং (৩) ঘৃণার শ্রদ্ধা। এখন আপনাকে কিংবা আপনাদেরকে বুঝতে হবে এলাকাবাসী কিংবা আত্মীয়স্বজন আপনাদেরকে কী রকম শ্রদ্ধা করছে। এটা বুঝা যাবে আপনার কর্মগুণে। কুকুর কিংবা পাগলের মতো আচরণ করলে কখনও ভক্তির শ্রদ্ধা কারো থেকে আশা করা যায় না। আর মনে রাখতে হবে মন্ত্রী, এমপিরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এরা রাজনৈতিকভাবে সামান্য চেনা জানা মানুষের সামাজিক অনুষ্ঠানেও যান কোনো একজন বিশ্বস্ত মানুষের মাধ্যমে! সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়াটা উনাদের অনেকটা রাজনৈতিক কর্মসূচির মতো! আর সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে উনারা কাউকে বদ্দা, কাউকে ভাই, কাউকে চাচা, মামা ডাকে বয়সের অনুপাতে। এটাকে ফলাও করে প্রচার করার কিছু নেই। এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। এটাকে পুঁজি করে যারা কিছু করতে চায় এরা হয় গর্দভ না হয় সদ্য জাতে উঠা লোক। ভালো বংশের লোকেরা, রুচিশীল লোকেরা কখনও এ ধরণের সস্তা ব্যাপার নিয়ে হইচই করেনা, অপব্যবহার করেনা। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে আমাকে বুঝতে হবে আমি কোন লেভেলের লোক। আমি কী মন্ত্রী, এমপি লেভেলের লোক নাকি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। আমাদের অনুষ্ঠানে কী মন্ত্রী-এমপিরা আমাদের কথায় এসেছেন নাকি ওমুক তমুকের মাধ্যমে অনেকটা অনুরোধের ঢেঁকি গিলে এসেছেন। কারণ উনারা তো আমাদেরকে ভালোভাবে চিনেন ই না! আমাদের পরিবারের কারো শবে যাত্রায় কী উনারা এসেছেন? যদি আমাদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকতো তাহলে তো উনারা খবর পেয়েই আমাদের পরিবারে যারা মারা গিয়াছেন তাদের শবে যাত্রায় চলে আসতেন। শবে যাত্রায় তো কোনো মাধ্যম ধরে কাউকে আনা যায় না। শবে যাত্রায় আসতে হয় সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়। তাই তো মুন্সি মিয়া বলেছে- শবে যাত্রায় বুঝা যায় মানুষের আসল পরিচয়। এখানে অনুরোধ করে কাউকে আনা যায় না। টিভি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর পেয়েও আসা যায়। আমাদের গ্রামের তালুকদার সাহেবের জানাজায় মন্ত্রী, এমপি তো দূরের কথা; জেলা-উপজেলার মধ্যম সারীর কোনো নেতার ও দেখা মিলে নাই। ওয়ার্ড কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের ২/১ জনকে দেখা গেছে। তাও নেতা হিসেবে নয়, প্রতিবেশী হিসেবে এসেছে। অথচ তালুকদার সাহেবের সামাজিক অনুষ্ঠানে এ সমস্ত মন্ত্রী-এমপিদের অনেকটা জোর করে কারো না কারো মাধ্যমে নিয়ে এসেছিল। আর তাদের পরিবারের ছেলেরা রব তুলেছিল- তাদের বাবাকে মন্ত্রী, এমপিরা বদ্দ বদ্দা বলে গলা শুকিয়ে ফেলেছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এ ধরনের মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরা ভিআইপি মেহমানকে নানান কৌশলে আনার প্রবণতাটা পাত্রপক্ষের বেশি থাকে। কারণ খাবারের আয়োজনকারী তো কনে পক্ষের। ঝড়-ঝাপটা যা কিছু যাবে কনে পক্ষের উপর দিয়ে যাবে। এখানে বিবেকের একটা প্রশ্ন আছে। এটা বুঝতে হবে। এ ব্যাপারে এখন সজাগ হওয়ার সময় এসেছে। কারণ অনেক সময় খাবারের ও টান পড়ে। আর ছবি তুলে নিজেদের জাহির করার ও অপব্যবহার করার প্রবণতাটা তো আছেই। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। অনেকে লিখেছেন ভিআইপি মেহমান কিংবা তাদের সাথে আসা লোকজনের জন্য আয়োজককারীদের আত্মীয় স্বজনরা অনেক সময়ে গুরুত্বহীন হয়ে যান। বিয়েতে মেজবানের মতো লোক চলে আসে। বিয়ে আর মেজবান যে ভিন্ন এটা অমুক তমুক সাহেবের লেজ ধরে আসা বেকুবরা বুঝেনা। কারণ বিয়েতে খাবারের টান পড়লে আয়োজককারীরা লজ্জায় পরে যান।
জ্বি আপনি ভিআইপি লোককে দাওয়াত দেন কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু আগে নিজের আত্মীয় স্বজনকে গুরুত্ব দিন। অনেক আত্মীয় আছে আর্থিকভাবে দুর্বল। আপনি তাদের অবহেলা করতেছেন। তাদেরকে টেনে আনুন। আবার পাড়া প্রতিবেশী যাদের সাথে সম্পর্কের টানা-পোড়েন আছে কিংবা কম দেখা শুনা হয় তাদেরকে আন্তরিকভাবে দাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠানে আনুন। তবেই অনুষ্ঠানটি হবে পরিপূর্ণ স্বার্থক। আপনি যে লেভেলের লোক সে লেভেলের অনুষ্ঠান করুন। ভিআইপি লোককে দাওয়াত দেওয়ার আগে আপনাকে পারস্পরিক সবকিছু চিন্তা করতে হবে। সেভাবে আয়োজন করতে হবে। কনে পক্ষের উপর দায় চাপিয়ে দিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়েও ফোন করে করে অলি গলির বন্ধুকে ডেকে আনা কোনো সুস্থ বিবেক সম্পূর্ণ লোকের কাজ নয়। এ ধরনের লোকের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। সামাজিক অনুষ্ঠান সুন্দর হোক। ভিআইপি মেহমানের সাথে ছবি তুলে পরবর্তীতে এর অপব্যবহার বন্ধ হোক। এটাই হোক আজকের অঙ্গীকার। সবার জন্য শুভ কামনা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক