প্রসঙ্গ : মোবাইল ফোন এবং এর বিপজ্জনক আসক্তি

14

এম.এ. মাসুদ

বাংলাদেশে এখন অতি কম মূল্যে মোবাইল ফোন কিনতে পাওয়া যায়। বড় বড় শপিং কমপ্লেক্স ছাড়াও দেশের হাট-বাজার-গঞ্জ আর শহরের অলি-গলিতে মোবাইল ফোনের দোকান গড়ে উঠেছে। দেশে মোবাইল ফোন চালু হওয়ার আগে বিটিসিএল এর ল্যান্ড ফোনের মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের অসততা ও অনৈতিক কর্মকাÐ ল্যান্ড ফোন ব্যবহারকারীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। দেশে মোবাইল ফোন চালু হওয়ার পর থেকে এদের দৌরাত্মের অবসান ঘটেছে। সামনে এমন দিন হয়তো আসবে যখন ল্যান্ড ফোন যাদুঘরেই স্থান লাভ করবে। মোবাইল ফোন এখন দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণির ও পেশার মানুষের নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষও এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। শুধু পারস্পরিক যোগাযোগই নয়, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিকাশের মাধ্যমে অতি দ্রুত টাকা পয়সার লেনদেনও হচ্ছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অজপাড়াগাঁয়ে প্রাপকের কাছে কয়েক মিনিটের মধ্যে টাকা পাঠাতে মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিকাশের অপরিহার্যতা এখন প্রতিষ্ঠিত বিষয়। অতীতের মানি অর্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে যে টাকা পাঠাতে লাগত কয়েক দিন এখন তা লাগছে কয়েক মিনিট। শুধু টাকা নয়, যে কোন খবর অতি দ্রুততম সময়ে দেশের আনাচে কানাছে এবং বিশ্বব্যাপী পৌঁছে যাছে এই মোবাইলের কল্যাণে।
মোবাইল ফোনের এত সব সুবিধা এবং এটি ব্যবহারে খরচ অত্যন্ত কম হওয়ায় মোবাইল ফোন এখন প্রতিটি মানুষের অপরিহার্য ব্যবহারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু গভীর উদ্বেগের সাথে বলতে হয় যে, মোবাইল ফোন এখন আমাদের যুব সমাজ থেকে শুরু করে কিশোর ও শিশুদেরকে এর প্রতি এতো বেশি আসক্ত করে ফেলেছে যে, তারা এখন তাদের অবসরের পুরো সময়টি, এমনকি লেখাপড়া ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোন নিয়ে মেতে থাকে। এটা শুনতে আশ্চর্যজনক মনে হলেও সত্য যে, এখনো কথা বলতে না পারা দু’তিন বছরের অবুঝ শিশুরাও গভীর মনোযোগের সাথে দীর্ঘক্ষণ এক দৃষ্টিতে মোবাইল ফোনে কার্টুন দেখায় মগ্ন হয়ে পড়ে। মোবাইল ফোনের প্রতি এই আসক্তি এখন রোগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে এই আসক্তি বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই ডাক্তারের মতে যে যুব সমাজ অবসর সময়ে মাঠে খেলাধুলায় মেতে উঠবে, বই পড়ায় বা ইনডোর গেমে সময় কাটাবে, এখন তারা তা না করে মোবাইল ফোনের নেশায় বুঁদ হয়ে মোবাইল ফোনের মধ্যেই বিনোদন খুঁজে নিচ্ছে। এর ফলে যে জীবন-যাত্রা প্রণালীর মাধ্যমে তাদের বেড়ে উঠার কথা, তা না হওয়ায় তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশে ব্যাঘাত, চোখের রোগ ও স্নায়ুর রোগ হতে পারে। আর দু’তিন বছরের শিশুদের এই আসক্তির কারণে তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি মারাত্মক হতে পারে। মোবাইল ফোনে আসক্তরা তাদের সমাজ বা দেশে ও বিশ্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে থাকে অজ্ঞ; বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজন থেকে সে হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন। এই ডাক্তারের মতে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি দূরীকরণের চিকিৎসা কোন ডাক্তারের হাতে নেই। এই রোগের চিকিৎসা মা-বাবা এবং পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের হাতেই। তাদের অসচেতনতার কারণেই তাদের সন্তানেরা মোবাইল আসক্তিতে আক্রান্ত এবং তাদের হাতেই এই আসক্তি থেকে তাদের সন্তানদের মুক্তি নিহিত। এখনই এ ব্যাপারে সচেতন হোন এবং আপনাদের প্রিয় সন্তানদের এই মারাত্মক ক্ষতিকর আসক্তি থেকে মুক্ত করতে যথেষ্ট সময় ব্যয় করুন। কোন প্রকার জোরজবরদস্তি নয়, ধীরে ধীরে অগ্রসর হোন। সরকারের প্রতি নিবেদন, দেশের আগামী দিনের নাগরিকদের এই মারাত্মক আসক্তি থেকে মুক্ত করার জন্য এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান সরকার অনেক জনকল্যাণমূলক কাজের রূপকার। তাই এই সমস্যা দূরীকরণে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি (১) আঠার বছরের নিচের কোন নাগরিকের কাছে মোবাইল ফোন বিক্রি বন্ধ করতে হবে (২) আঠার বছরের নিচের যে সেব যুবক-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন আছে সেসব ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে (৩) কোন বাবা-মা তাদের মোবাইল ফোন সেট তাদের সন্তানদের হাতে দেবেন না। এর অন্যথা হলে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। আর এই শাস্তি বাবা-মায়ের বা অভিভাবকের উপরেই প্রযোজ্য হবে।
যুবক, কিশোর ও শিশুদের এ মোবাইল ফোন আসক্তির বিষয়টি সারাদেশের দায়িত্ববান বাবা-মা অভিভাবক এবং দেশের মঙ্গলকামী সকল মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ আসক্তি থেকে দেশের যুবক, কিশোর ও শিশুদের দূরে রাখার বিষয়ে উপায় উদ্ভাবন এবং এর প্রয়োগ অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সময়ক্ষেপণ না করে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : সমাজকর্মী