প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী বাদশাহ তুব্বের ইতিহাস

11

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

মহাবিশ্বের মহানবী হুজুরে আক্রম হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাগু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৃথিবীতে শুভ আগমনের হাজার বছর পূর্বে ইয়ামন দেশে রাজত্ব করতো বাদশাহ তুব্বে আউয়াল হোমাইরী। তিনি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন। একদিন বার হাজার আলেম ও পন্ডিত, লক্ষাধিক অশ্বারোহী এবং লক্ষাধিক পদাতিক সৈন্য দিনে ভ্রমণে বের হলেন তিনি। বাদশাহর বাহিনীর যাত্রা এক অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করলো। চারদিক হতে সকলে দৃশ্যটি উপভোগ করতে লাগলো। অনেক স্থান ভ্রমণ করার পর বাদশাহর বাহিনী পবিত্র মক্কা শহরে উপস্থিত হলো। কিন্তু এ বাহিনী দেখতে পবিত্র মক্কা নগরীর কেউ উপস্থিত হলো না। নগরীর প্রধান বিচারপতির নিকট বাদশাহ তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পবিত্র শহরে মহান আল্লাহর একটি মর্যাদাশালী ঘর আছে, যে ঘরের পরিচর্যাকারী এবং আশ-পাশের মানুষকে দুনিয়ার মানুষ সম্মান করে চলে। তাই আপনার বাহিনীর এ দৃশ্য দেখার তাদের আগ্রহ নেই। একথা শুনে বাদশাহ রোগে প্রতিজ্ঞা করলো এ ঘরকে ধ্বংস এবং নগরীর মানুষকে হত্যা করবো। এ প্রতিজ্ঞার পর বাদশাহর চোখ মুখ ও নাক হতে রক্ত প্রবাহিত এবং দুর্গন্ধময় পুঁজ বের হতে শুরু হলো। অনেক চিকিৎসার পর বাদশাহ সুস্থ হলো না। বাদশাহর সফর সঙ্গীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানী একব্যক্তি রোগ দেখে বললেন, আমার আত্মস্ত হচ্ছে যে, আপনার রোগ আসমানী কিন্তু চিকিৎসা জমিনী। আপনি যদি কোন অন্যায় প্রতিজ্ঞা করে থাকেন তা এখনই ত্যাগ করে তাওবা করুন। বাদশাহ সাথে সাথে তার প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে তাওবা করলে তার রোগ ভাল হয়ে যায়। সুস্থতার আনন্দে বাদশাহ্ খানায়ে কাবার গিলাফ চড়ালেন এবং নগরবাসী প্রত্যেককে সাত শত স্বর্ণ মুদ্রা ও সাত জোড়া কাপড় উপহার প্রদান করেন। বাদশাহর বাহিনী মক্কা নগরী হতে পবিত্র মদিনা নগরীতে পৌঁছল। সরফসঙ্গী যারা জ্ঞানী ও আসমানী কিতাব সম্পর্কে প্রাজ্ঞ তারা এ শহরের মাটি শুঁকে এবং পাথর দেখে বুঝতে পারলেন যে এটি মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) এর হিজরতের স্থান। সাথে সাথে তাঁরা প্রতিজ্ঞা করলো এই পবিত্র নগরী ছেড়ে আমরণ কোথাও যাবেন না। তারা বললো, আমাদের সৌভাগ্য হলে জীবনকালে মহানবীজীর সাথে সাক্ষাৎও হতে পারে। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ না হলেও এক সময় তাঁর পবিত্র পদধূলি উড়ে আমাদের কবরে পড়বে যা আমাদের পরকালের নাজাতের উসিলা হবে। এ কথা বাদশাহ শুনে পন্ডিত ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য চারশত ঘর নির্মাণ করলো। সাথে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) এর জন্য একটি দোতলা ঘর নির্মাণ করে বলে গেলেন হিজরত করে তিনি যখন এ শহরে আসবেন তখন এ ঘরে যেন তিনি অবস্থান করেন। আর্থিক সাহায্য করতঃ চারশত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গকে বাদশাহ বললেন, আপনারা এখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করুন। সবচেয়ে বড় জ্ঞাণী ব্যক্তির হাতে বাদশাহ তাঁর হাতের লেখা একটি চিঠি প্রদান করে বললেন, এ চিঠিখানা যেন শেষ নবী (দ.)’র হাতে অর্পণ করা হয়। যদি আপনার হায়াতে জিন্দেগীতে তিনি হিজরত করে এখানে না পৌঁছেন তাহলে আপনার বংশধরকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে যাবেন বংশানুক্রমে আমার চিঠিটি সংরক্ষণ করে শেষ নবী (দ.)’র হাতে যেন অর্পণ করেন। একথা বলে বাদশাহ নিজ রাজ্যে ফিরে গেলেন। এটি এক ঐতিহাসিক পবিত্র চিঠি যে চিঠিখানা বাদশাহ তুব্বে মদিনা শরীফ হতে বিদায় নেওয়ার এক হাজার বছর পর মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে অর্পণ করা হয়।
বাদশাহর এই চিঠি বংশানুক্রমে চারশত জ্ঞানী লোকের পরিবারবর্গ যতœসহকারে রাখেন এক হাজার বছর পর চিঠিটি হাত বদল হয়ে মদিনার বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু আয়ুব আনসারী (রা.)’র হাতে আসে। তিনি তাঁর গোলাম আবু লাইলার কাছে রাখেন। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) যখন মক্কা হতে হিজরত করে মদিনা মনোয়ারার কাছে এসে পৌঁছেন তখন মদিনাবাসী রেসালতের সেøাগান ও তাঁর প্রশংসামূলক কবিতা আবৃত্তি করে স্বাগত জানান। অনেকে রাস্তা, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে দাওয়াতের আয়োজন করেন হুজুর (দ.) কে আমন্ত্রণ জানান। প্রিয় নবী (দ.) বললেন, আমার উটকে যেতে দাও। যে ঘরের সামনে উট দাঁড়াবে এবং বসে পড়বে সেখানেই আমি আস্থান করবো।
ইয়ামনের বাদশাহ তুব্বে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যে দোতলা ঘরটি নির্মাণ করে গিয়েছিলো, সেটা তখন হযরত আবু আয়ুব আনসারীর আবাসস্থল ছিল। উট গিয়ে এই ঘরের সামনেই বসে পড়লো। আবু লাইলাকে বলা হলো ইয়ামনের বাদশাহ্র চিঠিটি হুজুর (দ.) এর হাতে অর্পণ করতে। সে হুজুর (দ.) এর সামনে উপস্থিত হলে হুজুর (দ.) তাঁকে দেখে বললেন, তোমার নাম কি আবু লাইলা? এ প্রশ্ন শুনে আবু লাইলা বিস্মিত হলেন। হুজুর জিজ্ঞাসা করলেন ইয়ামনের বাদশাহর চিঠি কোথায়? তিনি চিঠিখানা প্রিয়নবী (দ.)’র হস্ত মোবারকে অর্পণ করলেন।
এই পবিত্র চিঠিতে লিখা ছিল: “অধম বান্দা তুব্বে আউয়াল হোমাইরীর পক্ষ হতে মহানবী হযরত মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্্ (দ.) এর প্রতি।
“হে আল্লাহর বন্ধু, আমি আপনার উপর এবং আপনার উপর নাজিলকৃত কিতাবের উপর ঈমান আনতেছি। আমি আপনার ধর্মের উপর আস্থা স্থাপন করলাম। আপনার সাক্ষাৎ হলে আমার সৌভাগ্য। তা না হলে আপনি দয়া করে আমার জন্য কিয়ামতের দিবসে সুপারিশ করবেন। আমাকে নিরাশ করবেন না। আমি আপনার উম্মাত এবং আপনার শুভ আগমনের পূর্বেই আপনার হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ্ এক এবং আপনি তাঁর প্রেরিত রাসুল।”
মাহবুবে খোদা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিঠিখানা পাঠ করে ইরশাদ করলেন, নেক বান্দা তুব্বে আউয়ালকে অশেষ ধন্যবাদ। (মিজালুল আদিয়ান)।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক