প্রত্যাশা

12

সুজন সাজু

এইমাত্র এসে ঘরে ঢুকে কেদারায় বসল রাফিদ। ঘমার্ত শরীর। রিয়া ছাঁদ ফ্যানটা চালু করে দিল। বুঝতে চেষ্টা করছে রাফিদের মন-মেজাজ।
অনেক পুরুষ লোক বাইরে থেকে এলে ভ্রমন ক্লান্তিতে মেজাজ থাকে তিরিক্ষি। রাফিদের স্বভাবও অভিন্ন। তাই রিয়ার মাঝে এক ধরনের ভয় কাজ করে। আগ বাড়িয়ে কিছু বলার সাহস করে না। হাতে তোয়েল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া। রাফিদ শার্টের বোতাম খুলছে ধীরে ধীরে। এমনি রাফিদ বদ মেজাজের নয়। জার্নিটা সহ্য করতে পারে কম। ছোটকাল থেকেই নাকি এমন রাফিদ।
ওদের বিয়ে হয়েছে দ্বি-বছর পূর্ণ হবে দুদিন পর। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে বার্ষিকীটা পালন করার পরিকল্পনা করছে রাফিদ।
রিয়ার মাঝেও খুশি অনুভব হচ্ছে এটা নিয়ে। কাছের বন্ধু বান্ধবদের বলবে শুধু। কারণ, রাফিদের আয়টা সীমিত। সাধ থাকলেও অনেক সময় সাধ্যে কুলোয় না। রিয়া একটা আবদার করছিল। দুয়েক জন কলেজ জীবনের বান্ধবীদের দাওয়াত করার। কিন্তু এতে রাফিদের সায় মিলেনি। এনিয়ে রিয়ার অন্তরে একটু অসন্তুষ্ট বিরাজ করছে। তবুও রাফিদের সামর্থ বিবেচনায় জোর জবস্তি করার পক্ষে নয়।
রিয়ার আগ্রহ আছে রেজাল্টটা বের হলে একটা ভালো চাকরির সন্ধান করবে। এতে রাফিদকে সহযোগিতা করতে পারবে। তখন না হয় মিলেমিশে টাকা খরচ করতে পারবে।
বর্তমান জিনিসপত্রের যা দাম। সীমিত আয়ের মানুষের দৈনদিন জীবনযাপনে গলদ্ঘর্ম হচ্ছে। সংসারিক বিভিন্ন খরচ, সীমিত আয়ের মানুষদের অতীব কষ্টের ভিতর দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। কে রাখে কার খবর এমন দুর্দিনের। সম্পর্ক হওয়ার আগে থেকেই জানত রিয়া রিফাদের পারিবারিক অবস্থা।
বাবার অট্টালিকা না থাকলেও অভাব কী জিনিস ওটা রিয়ার বাবা ছেলেমেয়েদের কখনো বুঝতে দেয়নি। যখন যেটা আবদার করেছে মা-বাবা পূরণ করেছে। কিন্তু ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয়েছে রিয়াকে। এজন্য রিয়া রাফিদকে কোন ধরনের চাহিদার কথা সহজে বলে না। রাফিদ মন খুশিতে যা করে এতেই সন্তুষ্ট রিয়া।
রাফিদের বৃদ্ধা মা’র জন্য প্রতি মাসে একটা খরচ অবধারিত। কারণ, রাফিদের অন্য আরেকটা ভাই নেই যে মা’র খরচ ভাগ করে নেবে। অনেক কষ্ট করে রাফিদকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করেছে। বৃদ্ধা মা’র একমাত্র সন্তান রাফিদ।
বিয়ের আগে রাফিদ শর্তজুড়ে দিয়েছিল, রিয়াকে বিয়ে করতে পারবে যদি তার বৃদ্ধা মাকে কখনো মনোকষ্ট দিতে না পারে। আপত্তি ছিল না রিয়ারও। মাঝে মধ্যে রিয়াকে মনে করিয়ে দেয় রাফিদ, কারণ, মানুষের মন আর আকাশের রঙ কখন পাল্টে যায় বলা মুশকিল। যদিও রিয়ার কোন ধরনের অবহেলা বিয়ে পরবর্তী রাফিদ ধরতে পারেনি। তবুও কেন রাফিদ এমন কথা উচ্চারণ করে এটা বোধগম্য নয় রিয়ার। হয়ত রিয়াকে সন্দেহ করে রাফিদ?
কখনো রাফিদের মা কোন অভিযোগ করেছে কিনা এটাও জিগ্যেস করে রিয়া। উত্তরে বলে, না। রিয়াও রাফিদকে স্মরণ করিয়ে দেয়, রাফিদ, নিশ্চয় তোমার অজানা নয়। যে কোন পরিবারে হোক দু’জনের আর দশজনের পরিবার।
যদি কারো মনে বিন্দু পরিমানও সন্দেহ বিরাজ করে তাহলে ওই পরিবারের শান্তি ভয়ে পালিয়ে যায় চিরদিনের জন্য, যতদিন সন্দেহ নামক ভয়ংকর ব্যাধিটি দূর না হয়।
সুতরাং যা বলার সরাসরি বলবে নিঃসংকোচে, আমি তোমার বিয়ে করা বউ। বিয়ে করেছি একে অপরকে ভালোবেসে। আমাদের মধ্যে যদি কারো মনে কোন কারণে কোন সন্দেহ ভুলে ঢুকেও যায় তাহলে আমরা আলোচনার মাধ্যেমে তা সংশোধন করে নেব। যাতে আমাদের ভালোবাসা টিকে থাকে আমৃত্যু পর্যন্ত।
রিয়ার বিরতিহীন কথাগুলো নিবিষ্টচিত্তে শুনে গেল রাফিদ।
কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রিয়ার অবয়বে। রিয়াও নিশ্চুপ। রাফিদ, রিয়ার রাগান্বিত মনোভাব বুঝে চুপ করে রইল। রাফিদও জানে একজন রেগে গেলে আরেকজনকে শান্ত থাকতে হয়। এটাই জ্ঞানীলোকের পরামর্শ। দু’জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটধারী। করেছে ভালোবেসে বিয়ে। প্রতিবেশিরা যাতে সুযোগে কান পাততে না পারে। সংসারের কোন মতানৈক্য যেন বাইরে না যায় এদিকেও খেয়াল রাফিদের।
রিয়া রান্না ঘরের দিকে এগোয়। ডাক দেয় রাফিদ। শোন রিয়া, বলো। রাগ ঠান্ডা হয়েছে? কিসের রাগ? আমি কোন রাগ করিনি।
তাহলে তো ভালোই। মাত্র একটি কথা বললাম আর আমাকে পুরো রচনা শুনিয়ে দিলে। আর অই রচনা তৈরির যোগান দাতা যে তুমি ওটা স্বীকার করে নিলেই হয়।
আচ্ছা স্বীকার করলাম, খুশি হলে? এখানে খুশি হবার কিছু নেই। আমিও বিনয় করে বলছি, দ্বিতীয়বার কোন প্রমান ছাড়া এমন কথা শুনতে না রাজি। ওকে, মনে থাকবে প্রিয়া। ঠোঁটের কোণে মুসকি হাসির রেখা ফুটে ওঠে রিয়ার। রাফিদও অট্টহাসিতে ঘরশুদ্ধ কাঁপিয়ে দেয়।
আওয়াজ শুনে রাফিদের বৃদ্ধ মাও অন্য রুম থেকে ওদের দুয়ারে এসে ডাক দেয়। রাফিদ, কী হলো তোদের রুমে এত শোরগোল কেন? দরজা খুলে দেয় রিয়া, মা ভিতরে আসো। বলে রাফিদ। কী হলো বাবা? অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করলাম, তোদের দুয়ার বন্ধ,আওয়াজ করে কথাবার্তা চলছে।
পায়ের ব্যথাটা বেশি লাগছে, তাই আসতেও কষ্ট হচ্ছে। এখন বড় আওয়াজ শুনে না এসে পারলাম না। আমার লক্ষী বৌমা না থাকলে আমার কী যে হতো জানি না।
বৌমা, তোমাকে কি রাফিদ কিছু বলেছে? না মা কিছু হয়নি। রিয়া হাসি মুখে উত্তর দেয়। আড় চোখে থাকায় রাফিদ। রিয়া যদি মাকে বলে দেয়? তাহলে মা রাগ করবে। রিয়া আহবান করে, মা আসো। টেবিলে বসো। খাবার সময় হয়ে গেছে। শোন বৌমা, এখানে রাফিদও আছে। আমার শখটা যেন দেখে মরতে পারি দাদী হয়ে। লজ্জা পায় রিয়া। হাসে রাফিদ।
আচ্ছা মা আসো আগে ভাত খেয়েনি। ভাত খাব, আমার কথাও মনে রাখিস। আচ্ছা মা। তোমাকে দাদি হওয়ার আগে মরতে দেব না, এটাও জেনে রাখো।