প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন

13

রতন কুমার তুরী

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। দ্রæত ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন। ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ দেশের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচনি কার্যক্রম প্রায় শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বিএনপি বর্তমান সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের আন্দোলন এখন অবরোধে এবং হরতালে সীমাবদ্ধ থাকলেও দেশের বেশকিছু জায়গায় গাড়ি পোড়ানো কিংবা যাত্রীবাহি গাড়িতে আগুন দেয়ার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। অর্থাৎ কিছুটা হলেও বিএনপি সংহিতার পথে রয়েছে। তবে বিএনপির বেশকিছু সাবেক এবং বর্তমান নেতা তৃণমূল বিএনপি নামে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। এসব নেতাদের একটিই কথা নির্বাচনে না গেলে বিএনপি আর গণমুখী দল থাকবেনা।
এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি অবরোধ, গাড়িতে আগুন দেয়া, গাড়ি ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটিয়ে বর্তমান সরকারকে নির্বাচন থেকে কতোটুকু আটকিয়ে রাখতে পারবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে তো তারা বাধ্য। তাছাড়া বর্তমানে বিএনপির যে অবস্থা তাতে করে বর্তমান সরকারকে যে তারা আন্দোলন করে নামিয়ে ফেলতে পারবে তেমন অবস্থাও তাদের নেই। তাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে এভাবে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে প্রচুর। অনেকেই আবার বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন অনেক আগেই। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সরকারের ওপর কিছুটা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করলেও প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতার এবং ভারতের জন্য তা ভেস্তে গেছে। ভারত স্পষ্টতই বর্তমান আওয়ামী সরকারের পক্ষ নিয়েছে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সব দলকে শর্তহীন সংলাপে বসার আহবান জানিয়েছে এবং তারা বাংলাদেশে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। যার কারণে বিএনপির এমন অবরোধ ধর্মী আন্দোলন কোনো দিশা পাবে কীনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করছেন বর্তমান আওয়ামী লীগকে হঠানো বেশ কঠিন। কারণ বর্তমান সরকার যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশ শক্তিশালী। বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশই সমীহ করে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নের সফল কান্ডারী হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে দেশ বিদেশে বেশ নামও করেছেন এবং প্রতিবেশি দেশ ভারতও তাদের শতভাগ সমর্থন করে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ না করলেও অতীতের মতো অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে তারা নির্বাচন করে ফেলবে ফলে বিএনপি আবারও পাঁচ বছরের জন্য মহাসংকটে পড়বে।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় আছেন তার আগেও বিএনপি বেশ কয়েকবার এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সফল হতে পারেনি। তবে তাদের শীর্ষস্থানীয়,নেতারা জেলে থাকায় তারা বেকায়দায়ও রয়েছে। সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির এখন উচিত হবে দলের স্বার্থে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দলের তৃণমূল কর্মিদের চাঙা করা। বিএনপির উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন দলটির জনপ্রিয় নেত্রী বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এখন কারাগারে আবদ্ধ (প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ক্ষমতাবলে বর্তমানে তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছে)। এখন স্বাভাবিকভাবেই দলে প্রশ্ন থাকবে দল এবং নেত্রীকে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নির্বাচনে যাওয়া উচিত নয় কী ? প্রকৃতপক্ষে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে নির্বাচন যে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে সেকথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ফলে বিএনপির উচিত হবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে তাদের জনপ্রিয়তাকে পুনরায় যাচাই করা। পূর্বের মতো নির্বাচনে অংশ গ্রহন না করে বিএনপি ভুল করলে দলের জন্য ভবিষ্যতে কতটা ক্ষতি ডেকে আনবে তা বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন। বর্তমান সরকারেরও উচিত হবে বিএনপিকে যেকোনো প্রকারে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করানোর কৌশল বের করা। এবং যেকোনো উপায়ে বিএনপিকে সাথে নিয়ে নির্বাচন করা। তাতে করে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সময় লাগবেনা। আমরা সকল দলের অংশ গ্রহণে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছি। যে নির্বাচনটি হবে উৎসব মুখর পরিবেশে। যে নির্বাচনে কোনো নিদেশি হস্তক্ষেপ করবেনা আমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করবো। আমরা নিজের সকল দলের মানুষদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ভোট দেবো। নির্বাচনী এলাকায় কেউ ভোটের পরিবেশ বিনষ্ট করতে চাইলে তাকে সব দলের মানুষ প্রথমে বোঝাবো তাতে কাজ নাহলে সবাই মিলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেবো। তাহলেই সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন হবে আর এ নির্বানের মাধ্যমেই দেশে সব জনপ্রিয় প্রতিনিধি ভোটে জয়ি হয়ে জাতীয় সংসদে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করবো বিএনপি তাদের দল এবং কর্মিদের স্বার্থে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাবেন। বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে সে হবে তাদের দল, নেতা এবং দেশের জন্য মঙ্গল। দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করতেই নির্বাচন কমিশন এবং বর্তমান সরকারের উচিত হবে বিএনপিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা এক্ষেত্রে বিএনপির উচিত হবে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তাদের নেতা এবং তৃণমূল কর্মিদের নির্দেশ দেয়া। আমরা প্রত্যাশা করবো নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ নিয়ে একটি অর্থবহ ও কার্যকরি সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে সকল দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সকলি প্রত্যাশা করছে বিএনপি বিষয়টি এবার খুব ভালোভাবেই বিবেচনায় আনবেন এবং যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসবেন।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক