প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর হোক

9

দেশে এখন নির্বাচনী আমেজ প্রবেশ করছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামীলীগ, জাতীয়পার্টি, তৃণমূল বিএনপিসহ বেশ কিছু বামপন্থী ও ডানপন্থিসহ ইসলামিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিলেও বিএনপি ও ১২ দলীয় জোট নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এখনও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের এ আন্দোলন আগের মত আর প্রকাশ্যে নেই। ২৮ অক্টোবরের সহিংসতার পর বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতা গ্রেফতারের ফলে আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতার নির্দেশনায় প্রায় মাসব্যাপী অবরোধ ও হরতাল কর্মসুচি চলছে। তবে নেতা কর্মীরা মাঠে না থাকায় এসব কর্মসুচি অনেকটা দায়সারাভাবে পালন করা হচ্ছে। কিন্তু গুপ্ত হামলা ও যানবাহনে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ভয়ে দূরপাল্লার গাড়ি অনেকটা কম দেখা গেলেও শহর ও গ্রামের অন্যান্য সব যানবাহন, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তাদের এ জাতীয় ঢিলেঢালা কর্মসুচির বিপরীতে নির্বাচনমুখী সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও চৌদ্দ দল এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ আরো প্রায় ১৭টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা, আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও দলীয় নেতাকর্মীদের উচ্ছাসের মধ্যে নির্বাচনী উৎসবের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিএনটি ও সমমানা দলগুলোর ম্রিয়মান আন্দোলন নির্বাচনী ফরম বিক্রির উৎসবেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে হয়ত দলীয় নেতাকর্মীরা আরো ব্যাপক উৎসব-আনন্দে নির্বাচন কমিশন থেকে ফরম সংগ্রহ ও জমা দিবে। এতে নির্বাচন বিমুখ ও আন্দোলনমুখী দলগুলোর অবস্থা আরো নাজুক হওয়ার সম্ভাবনায় স্পষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপির জন্য নির্বাচন কমিশন ও প্রধানমন্ত্রীর দুটি আহবান প্রণিধানযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনে এসে বিএনপিকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের আহবান জানিয়ে বলেছেন, ‘নির্বাচনে আসুন, কার কত দৌড় আমরা দেখি। জনগণ কাকে চায়, সেটা আমরা যাচাই করে দেখি।’ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। অপরদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসলে তফসিল রিসিডিউল করা হবে। কিন্তু গতকাল এ স্তবক লেখা পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি, বরং মঙ্গল ও বুধবার অবরোধ এবং বৃহস্পতিবার হরতালের ডাক দিয়েছেন। তাদের এ কর্মসূচি কতটুকু জনবান্ধব বা জনসম্পৃক্ততা রয়েছে আজ ও কাল দেখা যাবে। আমাদের দেশে নির্বাচন মানে উৎসব। সর্বশ্রেণির মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনকে উপভোগ করে থাকে। আগামী নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছু আকাক্সক্ষা ও দ্বিধাদ্ব›দ্ব যে আছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না এলে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগকে বড় বাধা অতিক্রম করতে হবে না। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে এই আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে তাঁরা আবার ক্ষমতায় আসছেন। তবে বিএনপি গোপন স্থান থেকে ডাকা অবরোধ এবং যানবাহনে আগুন দেওয়া ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে আশঙ্কা তৈর হয়েছে, ভোট শেষে কি দেশে শান্তি ফিরবে? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে গণমাধ্যমে যেসব খবর ছাপা হয় বা হচ্ছে তা খুবই হতাশাজনক। মহামারি করোনা এবং পরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্ট অস্থিরতার ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও লেগেছে। ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রতিফলন খুবই কম। দেশে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক আগের চেয়ে আরও দুর্বল হয়েছে। রিজার্ভ কমে এখন ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে। কমছে প্রবাসী আয়। গতি নেই রপ্তানি আয়ে। ডলারের সংকট কাটেনি। স্থবিরতা এসেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে। বাড়ছে খেলাপি ঋণও। অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে মূল্যস্ফীতি।
এ অবস্থায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানের মান বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে যদি এখনই আমরা গুরুত্ব না দিই, তাহলে কিন্তু এটা আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাবে এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে।’
নির্বাচন সামনে রেখে উৎসব-আমেজের পাশাপাশি যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেটাও ভাবনার বিষয়। কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির প্রভাব প্রথম অর্থনীতিতেই পড়বে। তাই এ রকমটি যেন না হয়, সে দিকটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে সকল রাজনৈতিক দলকে। রাজনীতি আর নির্বাচন যাই বলি দেশ ও দেশের জনগণের জন্য। যদি তা করতে গিয়ে জনগণের কষ্ট বেড়ে যায় ও দেশের অর্থনীতির গতি থেমে যায়-তবে সেই ধরনের রাজনীতির প্রয়োজনিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক। দেশের জনগণ একটি অর্থবহ নির্বাচন প্রত্যশা করে যার পরবর্তীতে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবাহে গতি সঞ্চার হবে।