পূর্বদেশ জয় করে নিল পাঠক হৃদয়

60

সত্তর দশকের গোড়ার দিকে আমার লেখালেখি শুরু। আমার প্রথম লেখা ছিল গদ্য। পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মুখপত্র ‘ক্রান্তি’তে সে লেখাটি ছাপা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ সালে। তারপরেও গদ্য লেখায় মগ্ন ছিলাম দু’এক বছর। মহান মুক্তিযুদ্ধ উত্তর তখন সারাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামে ছোট কাগজের বন্যা হয়ে যায়। তেমনিভাবে প্রেস ব্যবসা ও প্রসার করতে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় তখন ছোট কাগজ (লিটল ম্যাগের)-এর রাজত্ব। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে এইসব ছোট কাগজের প্রকাশ। এই ছোট কাগজ নির্ভর অনেক তরুণ কিব সাহিত্যিকের উদয় হয়। তখন কবি ময়ুখ চৌধুরীর জয় জয়কার। এমন কোন লিটল ম্যাগ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে ময়ুখ চৌধুরীর লেখা নেই। অন্যান্য কবির যেমন সুনীল নাথ, মোস্তফা ইকবাল, মোরশেধ নুর শাহরিয়ার, মেজবা খান, জাকারিয়া মামুন, স্বপন দত্ত, লুৎফুল হুদা, ইফতেখার সাদিক, আহমদ খালেদ কায়সার, কাসাহো সাকু, মাহমুদুল সুলতান, মুশফিক হোসাইন, সাইমুম চৌধুরী, শ্যামল অদুদ, জিয়া সফদার, আসাদ মান্নান, শিশির দত্ত, আবসার হাবীব প্রমুখ এর সাথে। আমি ’৭২ হতে কবিতা চর্চায় নেমে পড়ি। তখন ময়ুখ চৌধুরী কেন্দ্রিক কবিদের আড্ডা জমতো উত্তর নালা পাড়ায়। এভাবেই দীর্ঘ সময় কবিতার সাথে আমার বসবাস। কর্মজীবনে ব্যাংকিঙ পেশাকে নিয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর কখন যে কেটে গেল বলতেই পারি না। ব্যাংকার (অব.) হিসাবে অবশেষে থিতু হই ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। ১৯৮০ সাল থেকে প্রকৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়ি। মৌমাছি চাষ, বাগান করা, পাখি পালা, এ্যকুরয়ামে রঙিন মাছ চাষসহ নানা সৌখিনতায় ডুবে থাকি। এর মাঝে ১৯৯২ সালে (সঠিকভাবে মনে নেই। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক অনুবীক্ষণ। সাখাওয়াত হোসেন মজনুর সাথে অণুবীক্ষণে যুক্ত হয়ে পড়ি। তখন প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে লেখালেখির শুরু অণুবীক্ষণে। ইত্যবসে প্রফেসর কে এম নুরুল হুদা, প্রফেসর ড. ক্বামার বানু, আজাদী সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের প্রমুখের সংস্পর্শে এসেগদ্য লেখা গবেষণায় নিজেকে যুক্ত করি। ২০০০ সালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রফেসর কে এম নুরুল হুদা মারা যান। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো ‘অধ্যাপক কে এম নুরুল হুদা রচনাবলী ও স্মারক গ্রন্থ’ নামে ৫০০ পৃষ্ঠার এক ঢাউস সাইজের স্মরণিকা। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে ডা. জাকির হোসেন চৌধুরী স্মরণিকা প্রকাশ করি। ২০০৩ সালে ‘বেড়াতে গিয়েছি মৃত মানুষের বাড়িতে’ নামীয় কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশ পায়।
২০১১ সালে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক প্রধান কার্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করে চট্টগ্রাম ফিরে আসি। সম্ভবতঃ সে সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পত্রিকায় চট্টগ্রাম থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। তাতে বিভিন্ন পদে সাংবাদিক নিয়োগের কথাও ছাপা হয়। তার ঠিকানা দেয়া হয় সম্ভবত মোমিন রোড এলাকার। আমি চেরাগীর মোড়ে বসবাস করি। কবি মাহমুদ সুলতান জানালো তুমি তো দীর্ঘদিন থেকে চট্টগ্রামের পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করো, আবেদন করে দেখা না। তাদের বিজ্ঞাপনটি আমার পছন্দ হলেও, পত্রিকায় যারা কাজ করেন তাদের দু’একজনের সাথে পরিচয় ছিল। আমি দেখেছি তারা রাত করে বাড়ি ফিরতেন। আবার সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে রাতে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে কুকুর, ছিনতাইকারী এবং পাগলের সাথে সাক্ষাতের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা শুনে আর এগুইনি। তাছাড়া বাইপাশের পর চিকিৎসকের পরামর্শে রাত জাগা একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি বিবেচনায় আর যোগাযোগ করা হলো না। তবে পূর্বদেশ সম্পর্কে আমার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। পূর্বদেশ ঢাকা থেকে যখন প্রকাশিত হতো, তখন থেকেই পত্রিকাটি আমাকে টেনে রেখেছিল। বলা যায়, এ পত্রিকার কোন সংখ্যাই আমার বাদ পড়েনি। চট্টগ্রাম থেকে যখন পূর্বদেশ প্রকাশ পেল প্রথম সংখ্যা থেকে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। সাধারণত চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকার সাথে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। কিশোর বয়স তেকে আজাদী পাঠ করা অভ্যাস। এর মাঝে চট্টগ্রামে আরও পত্রিকা এলে ও আজাদীর গুরুত্ব কমেনি। তবে সাহিত্য মানের জন্য ‘পূর্বকোণ’ অনেকেই পছন্দ করতেন। তবে আমার মনে হয় সেলুন থেকে শুরু করে উচ্চ মহলের প্রাধান্য ছিল আজাদীর। কিন্তু পূর্বদেশ এসেই যেন সে ভালোবাসায় চিড় ধরালো। আজাদীর সাথে ঘরে আসতে লাগলো পূর্বদেশ। এর মাঝে চেরাগী এলাকার নন্দন বুকস্টলে সাংবাদিক জামাল উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে যাই মাঝে মাঝে। সেখানে পূর্বদেশের নির্বাহী সম্পাদক আবু সাঈদ জুবেরির সাথে পরিচয় ঘটে। সেই সূত্র ধরে মাঝে মধ্যে পূর্বদেশ কার্যালয়ে তার কাছে যাই- এর মাঝে প্রতি বছরের ন্যায় পবিত্র ঈদুল ফিতর এগিয়ে এলো। দেশের গণমাধ্যমগুলো ঈদকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা পুস্তুক আকারে প্রকাশ করে থাকলেও চট্টগ্রামের দৈনিকগুলো তা কখনো করেনি। চট্টগ্রামের দৈনিকগুলো ২/৪ পাতার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। তাতে অনেকদিন আমার কবিতা প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের সকল পাঠককে চমকে দিয়ে পূর্বদেশ ঘোষণা করে তারা এবারে ঢাউস আকারে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করবে। জুবেরি ভাই তার ঘোষনায় উল্লেখ করেন- আমাদের দ্বিজেন শর্মা, বিপ্রদাস বড়–য়া নেই, আছেন নিসর্গী মুশফিক হোসাইন। তিনি আমার কাছে প্রকৃতি বিষয়ক একটি লেখা চেয়ে বসেন। ২০১৩ সালে সেই বিশাল প্রতিক্ষিত পূর্বদেশ ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানে আমার ‘টিলাগড়ের বলে চাপালিশ’ নামে লেখাটি ছাপা হয়।
চট্টগ্রামের প্রকাশিত পত্রিকার জগতে এ এক অনন্য দৃষ্টিন্ত। এর ফলে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সাহিত্য সংস্কৃতির মানুষের মনে আশার আলো সঞ্চার করে। বলা যায়, পূর্বদেশকে কেন্দ্র করে কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিকরা জড়ো হতে শুরু করলেন। এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়। ঢাকার পত্রিকাগুলোর পেছনের পাতায় প্রকৃতি একটি অংশজুড়ে থাকে। সে দিক চট্টগ্রামের পত্রিকাগুলো পিছিয়ে ছিল। জুবেরি ভাইয়ের উৎসাহে প্রতি শনিবারে পূর্বদেশ ছাপাতে শুরু করে প্রকৃতি বিষয়ক লেখা ‘চাঁটগার প্রকৃতি’। যা পাঠক সমাজে ব্যাপক সাড়া জাগায়। চট্টগ্রামের অন্যকোন পত্রিকা এ উদ্যোগ নিতে পারেনি। এ কৃতিত্ব একমাত্র পূর্বদেশের। যা আজ অবধি নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে আরও কিছু কিছু বিষয় প্রকাশ হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় পত্রিকাটি।
এখানে উল্লেখযোগ যে পূর্বদেশের শুরু থেকে উপসম্পাদকীয় কলামে লিখেছেন প্রফেসর শায়েস্তা খান, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান (মরহুম), কাজি রশিদ উদ্দিন, প্রফেসর ফজলুল হক, মীর আব্দুল হালিম, অধ্যাপক মাসুম চৌধুরী, বন্ধু আব্দুল হাইসহ খ্যাতিমান অনেকেই। পত্রিকা অফিসে মাঝে মধ্যে গেলে তৎকালীন সম্পাদক ওসমান গনি মনসুর ভাই আমাকে প্রায়শঃ উপসম্পাদকীয় লেখার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। কিন্তু তার অনুরোধ রক্ষা করে লেখার চেষ্টা করি নি। কারণ কবিতা আর প্রকৃতিই আমার ধ্যান। এভাবে দিন গড়াতে থাকে। মোহাম্মদ হোসেন খান লিখতেন ‘খোলা জানালা’ নামে কলামটি। তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি। তার বর্ণবহুল জীবন ছিল নানান রঙে রাঙানো। তিনি মাওলানা ভাসানীর সাথে থেকে আনোয়ারায় কলেজ প্রতিষ্ঠান তার অধ্যক্ষ পদে আসীন থেকে সমাজের নানা উত্থান পতনের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি লেখালেখির মতো আড্ডায়ও ছিলেন মধ্যমণি। নিরহঙ্কার এই মানুষটি হঠাৎ করে মৃত্যু মুখে পতিত হন। তার নমাজে জানাজায় বিপুল পরিমাণ মুসল্লির সমাগম হয়। মনে আছে প্যারেড ময়দানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমি ও শরীক হয়েছিলাম। মাওলানা ভাসানি আমার প্রিয় নেতা, ছাত্র জীবনে তার সাহচার্য পেয়েছি। রাজনীতিতে ছিলাম তার অনুসারি। মোহাম্মদ হোসেন খান ও ছিলেন তাঁর অনুসারি। তার মৃত্যুর পর পূর্বদেশ অফিসে যাতায়াতের সূত্র ধরে সহ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু তালেব বেলাল প্রস্তাব দিলেন, মোহাম্মদ হোসেন স্যারের ‘খোলা জানালা’ কলামে আপনি লিখুন না! দৈনিক আজাদীর সিদ্দিক আহম্মদ এক সময় ‘খোলা জানালা’ নামে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম লিখতেন। সে কলামটি ছিল আমার খুব প্রিয়। অধিকন্তু সিদ্দিক আহমেদ ছিলেন আমার অতি প্রিয় বন্ধুজনা এই প্রেক্ষিতে আবু তালেবের প্রস্তাবের প্রেক্ষিত সিদ্দিক ভাই-এর এবং অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেনের কলাম ‘খোলা জানালায়’ লেখার প্রস্তাবটি আমার বেশ মনপুত হয়। এই কলাম নিয়ে আমার দু’জন প্রিয় মানুষের স্মৃতি জড়িত। এছাড়া দুই লেখকের কলাম খোলা জানালা যেমন আমাকের আমাকে টেনে রাখতো, তেমনি চট্টগ্রামের অনেক পাঠকেরও প্রিয় কলাম। আমি কলাম (উপসম্পাদকীয়) লেখা শুরু করি। কলাম লিখতে গিয়ে যেন বৈরিতার মুখোমুখি হয়েছি তেমনি পাঠকের সাধুবাদও পেয়েছি ‘খোলা জানালা’র কলাম লেখক হিসাবে দৈনিক পূর্বদেশের পিয়ন থেকে শুরু করে সম্পাদক সকলের সাথে গড়ে উঠে হৃদ্যতা। তাদের লেখক সমাবেশ, ঈদ পুনর্মিলনী, ইফতার মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এই যুক্ততার ভেতর থেকে একটি বিষয় লক্ষ্য করি যে পূর্বদেশ কর্তৃপক্ষ সব সময় তার পাঠকের মনজয় করে বস্তুনিষ্ঠ এবং সত্য সংবাদ পরিবেশনে সচেষ্ট। তাদের সম্পাদকীয় পাতা বলা যায় চট্টগ্রামে প্রকাশিত সকল দৈনিকের পাতার চেয়ে বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে।
পূর্বদেশ কর্তৃপক্ষ এই পত্রিকাকে পাঠক মহলে আরোও জনপ্রিয় করার যে মিশন ও ভিষন নিয়ে কাজ করছেন। তাদের চিন্তা ও মনন এবং কর্মতৎপতার গতি যদি অতীতের মতো থাকে তবে অবশ্যই দৈনিক পূর্বদেশ শুধু চট্টগ্রাম নয় সারাদেশের একটি মান সম্মত ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পূর্বদেশের ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সম্পাদক, সহ-সম্পাদক, রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার ও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জানাই শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। পূর্বদেশ আরো বহুল প্রচারিত সংবাদ মাধ্যম হিসেবে গণ্য হোক।