পুলিশের প্রশ্রয়ে ভাসমান দোকান!

7

মনিরুল ইসলাম মুন্না

নগরীর বহদ্দারহাট জামে মসজিদের সামনে থেকে চান্দগাঁও থানা পর্যন্ত মূল সড়কে প্রতিদিন বসছে তিন শতাধিক ভাসমান দোকান। এর ফলে সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ায় নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। পথচারীরা চলাচলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আর এসব ভাসমান দোকান বসানোর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় থানা পুলিশ। তাদের প্রশ্রয়েই এসব ভাসমান দোকান বসছে, এমনই অভিযোগ স্থানীয়দের।
চান্দগাঁও আবাসিকের বাসিন্দা মোহাম্মদ ওয়াসিম জাফর বলেন, রাস্তায় ভাসমান দোকানের কারণে যানজটে পড়ে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। পুলিশের সামনে এসব দোকানপাট বসলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ বলছে, ভাসমান দোকানিদের তারা কোনো রকম প্রশ্রয় দেয় না।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. মোখলেছুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ভাসমান দোকান ও হকারদের উচ্ছেদ করার পর তারা পুনরায় এসে রাস্তা দখল করে বসে। আর এসব কাজে আমাদের পুলিশের সদস্যরা জড়িত থাকতে পারে না। তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ভাসমান দোকানদার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বললে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাস্তার উত্তর পাশটা পুরো হকারের দখলে। দক্ষিণ পাশে তুলনামূলক হকার কম। তারা ভ্যান ও ভাসমান টেবিলের উপর পণ্য রেখে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এরমধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফল, প্রসাধনী, আখের রস, ফুলের টব, জাম-কাপড় ও ক্রোকারিজ সামগ্রী। রাস্তায় যানজট হলেও দোকানিরা তাদের মত করে ব্যবসা চালিয়ে যান। এতে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
এছাড়া সড়কজুড়ে অবৈধ পরিবহন স্ট্যান্ডের ছড়াছড়ি। ফরিদের পাড়ার তালতলা মোড় হয়ে বহদ্দারহাট ওয়েল ফুড পর্যন্ত সড়কে গড়ে উঠেছে মাইক্রোবাস ও টেম্পু স্ট্যান্ড। স্থানীয়দের মতে এটি নিয়ন্ত্রণ করছে রুবেল, আবছারসহ আরও কয়েকজন। এই সড়কে চলাচলে ফরিদের পাড়ার অন্তত বিশ হাজার বাসিন্দা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্ট্যান্ড কেন্দ্রিক বেড়েছে বখাটেদের আড্ডাও। ফলে মহিলাদের ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যা নামতেই এই সড়কে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছেন মানুষ।
বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ভবনের অলিগলি দখল করে বসানো হয়েছে মাছ-সবজির দোকান। এতে ক্রেতাদের চলাচলে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। আলো-বাতাস চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া, এখানে ক্রেতা ঠকানোর ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। ওজনে মারাত্মকভাবে চুরি করা যেন সিস্টেমে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে উল্টো হেনস্তা করা হয়। এমনকি উল্টো পুলিশ দিয়ে হয়রানি করানোর অভিযোগও রয়েছে। মূল ভবনের বাইরের চিত্র আরো ভয়াবহ। বাজারের মাঝ দিয়ে নিউ সিডিএ আবাসিক ও ফরিদের পাড়ার সড়কটি অস্তিত্ব হারিয়েছে অবৈধ কাঁচাবাজারের দাপটে। এই সড়কের দুই পাশে অন্তত তিনশো দোকান বসানো হয়েছে। আর এই চিত্র নতুন নয়, দীর্ঘকাল যাবত চলে আসছে। ফলে গাড়ি তো দূরের কথা, রিকশা চলাচলেও মারাত্মক বেগ পেতে হয়।
বহদ্দারহাট নিউ সিডিএ আবাসিকের বাসিন্দা নুরুল কবির জানিয়েছেন, তিনি সিডিএ থেকে প্লট কিনে বাড়ি করেছেন। সিটি কর্পোরেশনকে হোল্ডিং ট্যাক্সও দিচ্ছেন। তবুও তারা নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত। তাদের প্রধান সড়কটি অস্তিত্ব হারিয়েছে অবৈধ বাজারের কারণে। এ থেকে পরিত্রাণ চান তিনি।
জানা গেছে, বহদ্দারহাট মদিনা হোটেলের সামনে অবৈধভাবে মাইক্রোবাসের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এখান থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে চলাচল করে শতাধিক মাইক্রোবাস। এটি পরিচালনা করছে পূর্ব ষোলশহরের ইয়াকুব নামের এক ব্যক্তি। একই জায়গা থেকে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত চলাচল করে অটোটেম্পো। এখানে টাকা আদায় করেন লাইন সাধারণ সম্পাদক হোসাইন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
জানা যায়, এখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রæপ অবৈধ যানবাহন, পরিবহন স্ট্যান্ড, গ্যারেজ, অস্থায়ী/ভাসমান দোকান, মাদকের স্পট ও নগরীর বাইরে থেকে আসা পণ্যবাহী যানবাহন থেকে ওইসব চাঁদা আদায় করে। তবে সম্প্রতি ফ্রুট সোহেল গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভাসমান দোকান থেকে পুলিশ ছাড়া এখন অন্য কেউ টাকা তুলছে না।
গত ১৬ মার্চ নানা অভিযোগে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই রূপক কান্তি চৌধুরীকে বদলি করেন সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। এরপর চার্জ নেন এসআই অধীর চৌধুরী। এতেও তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগের মত ফুটপাত ও ভাসমান দোকানের দাপটে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বহদ্দারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ অধীর চৌধুরীও সেই বিতর্কিত রূপকের পথেই হাঁটছেন।
ভাসমান দোকানিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগে স্থানীয় কিছু নেতা চাঁদা তুললেও এখন আর আসে না। তবে পুলিশের চাঁদাটা নিয়মিত দিতে হয়। দৈনিক দোকান প্রতি থানা পুলিশকে ৫০ টাকা ও বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সকে ২০ টাকা করে দিতে হয়। একজন কনস্টেবল দিয়ে প্রতিদিন টাকা আদায় করান থানার মুন্সি শংকর। ৩০০ দোকান থেকে দৈনিক ৭০ টাকা করে আদায় করা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ হাজার, মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং বছরে ৭৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
আবুল ফয়েজ নামে এক ক্রোকারিজ দোকানি বলেন, ‘থানা পুলিশকে টাকা নিলেও ট্রাফিক পুলিশ সমস্যা করে। মাঝে মাঝে মালামালসহ ভ্যানগাড়ি জব্দ করে নিয়ে যায়। আবার জরিমানা দিয়ে ফেরত আনতে হয়’।
ট্রাফিক পুলিশকে চাঁদা দিতে হয় না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদেরকে ভাসমান দোকান থেকে টাকা নিতে দেখিনি। কনস্টেবল এসে থানা ও পুলিশ বক্সের নামে টাকা সংগ্রহ করলেও ট্রাফিক পুলিশের কথা তারা বলেনি।
এসব বিষয়ে জানতে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই অধীর চৌধুরীকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
চান্দগাঁও থানার ওসি মো. মঈনুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি আসার পর চান্দগাঁও থানা এলাকায় পরিবর্তন এনেছি। এখানে কেউ অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না।
তাহলে কনস্টেবল কিভাবে টাকা আদায় করে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কনস্টেবলের টাকা আদায় করার প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
সিএমপি’র উত্তর জোনের উপ-কমিশনার মো. মোখলেছুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, অপরাধ বিভাগের পাশাপাশি ট্রাফিক বিভাগ থেকেও ভাসমান দোকানিদের নিয়মিত উচ্ছেদ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।