পুরোনোয় ভরসা নাকি নতুনে অনীহা

30

নিজস্ব প্রতিবেদক

তৃতীয় ধাপে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীর ৪০ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ২৪ ইউনিয়নে পুরোনো প্রার্থীরাই আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। নতুন করে মনোনয়ন পেয়েছেন ১৬ জন। এবার মনোনয়ন দেয়ার প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ পুরোনো প্রার্থীদের উপর ভরসা রাখলেও কিছুটা অনীহা নতুনে। যদিও বিতর্কিত কর্মকান্ড ও জরিপের ভিত্তিতেই মনোনয়ন দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। মনোনয়ন দৌড়ে পিছিয়ে পড়লেও অনেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার তোড়জোড় শুরু করেছেন। একইভাবে এখনো তফসিল না হওয়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউনিয়নের একঝাঁক বিতর্কিত ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। যারা মনোনয়ন না পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলের মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘তৃণমূলের সুপারিশেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। জরিপ ও জনপ্রিয়তায় যারাই এগিয়ে আছেন তারাই মনোনয়ন পাচ্ছেন। দলীয় সভানেত্রী কারো ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে মনোনয়ন দেন না। যে কারণে বিতর্কিতরা বাদ পড়ছেন। এরপরেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা নৌকার বিরোধিতা করছেন আজীবনের জন্য তাদের দলীয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।’
জানা যায়, চট্টগ্রামের ৪০ ইউপির মধ্যে হাটহাজারীতে নতুন প্রার্থী এসেছেন আটজন, রাউজানে তিনজন ও রাঙ্গুনিয়ায় পাঁচজন। সেখানে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া পুরোনো প্রার্থীদের কেউ কেউ নির্বাচনী দৌড়ে আছেন। যদিও উপজেলা আওয়ামী লীগ সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী না হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে পুরোনো প্রার্থীদের মনোনয়নও মানতে পারছেন না মনোনয়ন প্রত্যাশী অপরাপর প্রার্থীরা। তারাও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দলীয় ফরম সংগ্রহ করবেন বলে জানা যায়। নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত বেশ কয়েকজন এবার বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচন করতে পারেন। যাদের অধিকাংশই নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। কয়েকজন সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতার আস্কারা পেয়েই অনেকেই বিদ্রোহী হিসেবে ভোটে আগ্রহী হয়েছেন বলে জানা যায়।
উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, পুরোনো কিংবা নতুন বিষয় নয়। যোগ্যরাই মনোনয়ন পেয়েছেন। এটা দলীয় সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত। তাই নৌকার পক্ষেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এদিকে আগামী মাসের শুরুতেই চতুর্থ ধাপের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনটি উপজেলায় এ নির্বাচন হতে পারে। সেখানে যাতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা মনোনয়ন পান সেজন্য তৃণমূলে প্রতিনিধি সভা করে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাথে কথা বলেছেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। এ সভা থেকে তৃণমূলের সুপারিশেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করার কথা সাফ জানিয়ে দেয়া হয়। একইসাথে বিতর্কিত কারো নাম কেন্দ্রে প্রস্তাব না করার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপরেও একঝাঁক বিতর্কিত নেতা মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে আছেন। বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চৌধুরী নানা কারণে সমালোচিত। তার বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। গত পাঁচ বছর ধরেই বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে সমালোচিত হয়েছেন এই চেয়ারম্যান। একইভাবে শেখেরখীলের চেয়ারম্যান ইয়াছিন তালুকদার একজনকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে উল্টো নিজেই আসামি হয়েছেন। বাহারছড়ার চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দিলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সাধনপুরের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকার বিরুদ্ধে চাল আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত হলে তিনি মুচলেকা দিয়ে দায়মুক্তি পান। বর্তমান সমালোচিত চেয়ারম্যানরা ছাড়াও গতবার নির্বাচন করা কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী এবারো নির্বাচন করার তোড়জোড় করছেন। সাতকানিয়ায় সোনাকানিয়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সনদ দেয়ার অভিযোগ আছে। চরতি ইউনিয়নে জামায়াত নেতার ছেলে রুহুউল্লাহ চৌধুরী মনোনয়ন প্রত্যাশী। কেওচিয়ার মনোনয়ন প্রত্যাশী ওসমান আলীর বিরুদ্ধেও ইয়াবা বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। পটিয়ায় ছনহরা ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী যুবদলের প্রাক্তন নেতা কামাল উদ্দিন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তৃণমূলের প্রতিনিধি সভায় কামাল উদ্দিন মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আগ্রহ প্রকাশ করলে দলের ভেতর-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে কামাল উদ্দিনের একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কুসুমপুরা ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চান দুর্নীতির অভিযোগ উঠা এম এজাজ চৌধুরী। সাম্প্রতিক সময়ে দুদকের একটি টিম তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। এজাজসহ তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ইয়াবা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। গত ৮ বছর আগে তার পিতার নগরীর একটি গোডাউন থেকে মিলেছিল বিপুল পরিমাণের ইয়াবার চালান। এ ঘটনায় তার পিতাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়। এজাজ চৌধুরী এবার কুসুমপুরা ইউনিয়নের মনোনয়ন প্রত্যাশী। লোহাগাড়ায় পদুয়া ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া মো. জহির উদ্দিন এবার নৌকায় চড়তে চান। যদিও তৃণমূলের প্রতিনিধি সভায় এই চেয়ারম্যানকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। এরপরেও তার নাম কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। মনোনয়ন না পেলেও তিনি নির্বাচন করবেন বলে জানা যায়। একইভাবে কলাউজান ইউনিয়নে আবদুল ওয়াহেদ ও জাহাঙ্গীর আমীন, চরম্বার সাইফুল আলম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। এই তিনজনের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করার অভিযোগ আছে।
তবে নানা কারণে বিতর্কিত নেতারা মনোনয়ন না পেলেও বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করার তোড়জোড় শুরু করেছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশা ও নির্বাচনী প্রস্তুতি দুটোই সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আস্কারায় তারা মনোনয়ন দৌড়ে এখনো টিকে রয়েছেন বলে জানা যায়। তৃতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিতর্কিত হয়ে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের মনোনয়নে পরিবর্তন আসছে। ইতোমধ্যে হাটহাজারী ও চকরিয়ার দুইজন প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়াও স্বাধীনতা বিরোধী ও বিএনপি থেকে আগত, অনুপ্রবেশকারী আশ্রয়দাতাদের নাম দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত যেসব নেতা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘তৃণমূলের সুপারিশের ভিত্তিতেই আমরা কেন্দ্রে তালিকা পাঠাবো। কোনো বিতর্কিত প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানো হবে না। ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে যে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে সেখানে বিতর্কিতরা ঠাঁই পায়নি। নানা কারণে অনেক জায়গায় পুরোনো চেয়ারম্যানরা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবে বিতর্কিতরা বাদ পড়বেন। তাছাড়াও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়েও আমরা সতর্ক আছি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচন করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’