পুণ্যতিথি মহালয়া

8

 

শুভমহালয়া। এক পুণ্য তিথি। নানাভাবে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এ তিথি। প্রথমেই আসি প্রকৃতির অনুসঙ্গে। গ্রীষ্মের তাপদহের পর বর্ষার বারিধারায় ধুয়ে-মুছে গেছে সমস্ত জড়াজীর্ণতা। প্রকৃতি ধারণ করে আছে এক মোহময়ী রূপ। শরৎকালের আবাহণে সাদা কাশফুল, শুভ্রমেঘের ভেলা আর শিউলীর সমারোহে ধরিণী হয়েছে লাবণ্যময়ী। এরপর ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে মাতৃরূপে পূজিতা হন শ্রী শ্রী দুর্গা। এ শুক্লপক্ষ পরিচিত দেবী বা মাতৃপক্ষ হিসাবে। এ পক্ষের আগের পনের দিন পিতৃপক্ষ বা অপরপক্ষ। এ দু’পক্ষের মাঝের দিন টিম হালয়া। এদিন থেকে জ্যোতির্ময়ী মায়ের আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। মহালয়া থেকেই শুরু শারদ উৎসবের ক্ষণগণনা।
রামায়ণেও উল্লেখিত হয়েছে যুদ্ধ জয়ের আগে প্রয়াত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রীরাম চন্দ্রের শুভ তর্পণের কাহিনী। তারপরেই অকাল বোধনের মাধ্যমে আদ্যা শক্তি মহামায়াকে জাগ্রত করেন তিনি।পুরাণ মতে মহালয়ার দিনে দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের দায়িত্ব পান। সর্ব দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিভূ দশ প্রহরণ ধারিণী দুর্গতিনাশিনী জগৎ পালিনিমা নয় দিনের যুদ্ধে পরাভূত করেন অশুভের প্রতীক মহিষা সুরকে। এরপর থেকেই দশমী তিথি মহিমান্বিত হয় বিজয়ের স্মারক‘বিজয়া দশমী’হিসাবে।
তত্ত¡গত দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের পবিত্র এ দেহটাই দেবালয় বা মন্দির। মহালয়ার এ পুণ্য তিথিতে আমরা অস্থির মনকে ধীর করি আর হৃদয়কে পরিণত করি পবিত্র মন্দিরে।এ পূতমন্দিরে জগৎ জননী দেবীকে অধিষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ‘বোধন’ অর্থ জাগরণ। তাই মহালয়ার পরের দিন প্রতি পদে ঘট স্থাপনের মাধ্যমে দুর্গা পূজার সূচনা করা হয়। শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস দক্ষিণায়ন। এ ছয় মাস দেবতাদের বিশ্রামের কাল। এ জন্যই শরৎকালের পূজায় বোধন করে দেবী দুর্গার আরাধনা করতে হয়।
পুরাণের শ্রী শ্রী চন্ডী মহাগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে দেবী মহামায়া আরাধনার এক অপূর্ব কাহিনী। দুই নিঃস্ব ও ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ দৈবক্রমে মিলিত হলেন এক জায়গায়।একজন রাজ্যহারা রাজা সুরথ আর অন্যজন সমাধি বৈশ্য। ভিন্ন দুই মানুষ কিন্তু সমস্যা তাঁদের এক। নিকট জনের মায়া-মমতা তাঁরা ভুলতে পারছিলেন না। তাঁরা শরণাপন্ন হলেন বেদজ্ঞমুনি বরমেধসের। ঋষি তাঁদের দেখালেন সমাধানের পথ। তাঁর নির্দেশিত পথেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মৃন্ময়ী মুর্তি গড়ে একাদি ক্রমে তিনবছর দেবী মহামায়ার স্তব করলেন। দেবীকে তুষ্ট করে লাভ করলেন অভীষ্ট কামনা।
এহালয়ার লগ্ন হচ্ছে পুণ্যলগ্ন। এ অপুর্ব ক্ষণই হচ্ছে ভাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার শুভ সময়। জগৎ জননী মায়ের সন্তান আমরা। মায়ের পূজা আমাদের জন্য এক মিলন মেলা। শুভ মহালয়া থেকেই শুরু হয় মাতৃ আরাধনার বিশাল কর্মযজ্ঞের ক্ষণগণনা। ঐতিহ্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না,পূর্বসূরিদের আমরা শ্রদ্ধার আসন থেকে সরাতে পারি না। এ উপলব্ধি থেকেই আজ এদিন থেকেই শুরু হোক আমাদের বোধন, আমাদের আত্মজাগরণ।