পুঁজিবাজারে আবারও অস্বাভাবিক দরপতন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফেরাতে প্রয়োজন সুশাসন

12

দেশের পুঁজিবাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহব্যাপী ঢাকা ও চট্টগ্রামে অস্বাভাবিকভাবে দর পতন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও বেড়ে চলছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের পর দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তাতে লাখো মানুষ চাকুরি ও ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এরমধ্যে অনেকে পুঁজিবাজারের কিছুটা উত্থান দেখে নতুনভাবে বিনিয়োগ শুরু করে। কিন্তু সপ্তাহ না যেতে যেভাবে দরপতন শুরু হয়, তাতে এসব বিনিয়োগকারী সর্বশান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় দরপতনের লাগাম টেনে ধরতে পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষকে দ্রæত উদ্যোগ নিতে হবে। অনেকে সহজভাবে বলে থাকেন বড় বড় কোম্পানিগুলোর কারসাজিতে পুঁজিবাজারের এমন অসমমূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির ঘটনা ঘটছে। অতীতেও এমনটি অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগ একেবারে অবান্তর বলে উড়ে দেয়া যায় না। প্রয়োজন গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা। আর এ কাজটি করতে হলে প্রয়োজন পুঁজিবাজারে সুশান নিশ্চিত করা। আমরা মনে করি, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফেরাতে এর অন্য কোন বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালের ধসের পর নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও দেশের পুঁজিবাজার কোনোভাবেই স্বাভাবিক হয়নি। উল্টো দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। মূল্যসূচক কমছেই। সপ্তাহে একদিন উত্থান হয়, তো দুদিন পতন হয়। অব্যাহত পতনে পর্যুদস্ত বাজারে মূলধন হারিয়ে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। লাগাতার দরপতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংককে চাপ দিয়ে শেয়ার বিক্রি বন্ধে বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু এতেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। সপ্তাহের দুএকদিন উত্থান হলেও সার্বিকভাবে পতনের ধারা থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। ওইসময় ১০ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এর ফলে ফের হতাশা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। যা আমাদের জন্য উদ্বেগের। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৯ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে বাজার মূলধন কমেছিল ৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। তার আগের দুই সপ্তাহে কমেছিল ৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং ৯ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এ হিসাবে টানা তিন সপ্তাহের পতনে স্টক এক্সচেঞ্জ ৩১ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা বাজার মূলধন হারায়। যদিও এর আগে টানা সাত সপ্তাহের উত্থানে ডিএসইর বাজার মূলধন ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা বেড়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাজার জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অব্যবস্থাপনা ও সীমাহীন অনিয়মের কারণেই বিভিন্ন সময় পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং সে ধারা এখনো অব্যাহত আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাঁচ কারণে পুঁজিবাজারে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ দুর্বল আইপিও, বিশৃঙ্খল আর্থিক বিবরণী, বিও অ্যাকাউন্টে স্বচ্ছতার অভাব, সেকেন্ডারি মার্কেটে সন্দেহজনক লেনদেন ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে তারল্য প্রবাহ না বাড়লে টেকসই হবে না বাজার। তাদের মতে, কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়া বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। বাজারের বড় সমস্যা হচ্ছে আস্থার সংকট, সুশাসনের অভাব ও অতিরিক্ত সরবরাহ। এগুলো সমাধানের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে। আমরা আশা করব, সম্প্রতি করোনার ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এ শেয়ারবাজার অধিক সক্রিয় হলে, বিনিয়োগকারী আস্থায় ফেরাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক গতিও বৃদ্ধি পাবে। বেকারত্বের লাগামও টেনে ধরা যাবে। আমরা চাই, পুঁজিবাজার শক্তিশালী হবে বিনিয়োগকারীদের অর্থে- নিরাপদ অর্থলগ্নি সাথে তাদের সরব উপস্থিতে।