পাহাড়ধসে মৃত্যু ও জলদুর্ভোগ কোনটাই থামছে না

21

এম এ হোসাইন ও ওয়াসিম আহমেদ

বর্ষার বৃষ্টিতে কবিহৃদয় রোমাঞ্চিত হওয়ার আগেই চট্টগ্রামে রচিত হয় পাহাড়ধসে মানুষ মৃত্যুর দৃশ্যপট। একটুখানি বৃষ্টি হলেই শহুরে পথঘাট ডুবে যায় জলে। এসব নতুন কিছু নয়, মৃত্যু আর দুর্ভোগে স্তব্ধ বন্দরনগরীর বর্ষার গল্প। প্রতি বর্ষায় এমন দুর্ভোগের ভাগ্যলেখন যেন মেগাপ্রকল্পের হাজার কোটি টাকায় মুছছে না। দুর্নীতি, অপরিকল্পনা, নিজস্ব বলয় তৈরির রাজনৈতিক সমীকরণ, কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ উদ্যোগের কারণে স্থায়ী সমাধানের দেখা নেই। ফলে পাহাড়ধসে মৃত্যু ও জলদুর্ভোগ কোনটাই থামছে না। বরঞ্চ দায়িত্বপ্রাপ্তরা ভাসছেন অজুহাতের জলে। এমন অবস্থা থেকে যেকোনভাবে মুক্তি চায় বীর চট্টলার মানুষ।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে নগরীর আকবর শাহ এলাকায় টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে দুই বোনসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। নিহতরা হলেন শাহীনুর আক্তার (২৬) ও তার বোন মাইনুর আক্তার (২৪) এবং লিটন (২৩) ও ইমন (১৪) নামে অপর দু’জন। আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়ালী উদ্দিন আকবর জানান, রাত ১টার দিকে আকবর শাহ এক নম্বর ঝিলের বরিশালঘোনা এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা বসতঘরে মাটি ধসে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনকে মাটিচাপা পড়া অবস্থা থেকে উদ্ধার করে।
পাহাড়ধসে এ চারজনের মৃত্যুতে আবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। আলোচনা-বিশ্লেষণের কমতি নেই। তবে তা যেন বর্ষার জলের সাথেই হারিয়ে যায়। খবর নিয়ে জানা যায়, নগরীর বিভিন্ন এলাকার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় মানুষের বসবাস বাড়ছে। ক’বছর আগেও যেখানে মানুষের আনাগোনা ছিল না, সে সব এলাকায় এখান বসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এ বসবাস হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ। বিপরীতে ঝুঁকিপূর্ণ এই বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে প্রশাসনের নেই কোন স্থায়ী উদ্যোগ। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র অভিযান অভিযান খেলায় পড়ে রয়েছে প্রশাসন। প্রতিবছর বৃষ্টির আগে কেবল প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। তবে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় লোক দেখানো অভিযানের পরপরই পাহাড়ে পুনরায় ফিরে যান বসবাসকারীরা।
তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর প্রতিটি পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত বাসিন্দার রাজনৈতিক চাহিদা অনেক বেশি। তাই তাদের অন্যত্র সরানোটা কোনোভাবেই চান না স্থানীয় প্রভাবশালীরা। কাউন্সিলর নির্বাচনে ভোটব্যাংক হিসেবেই তাদের ব্যবহার করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নি¤œ আয়ের মানুষ চট্টগ্রাম শহরে পাড়ি জমায়। তারা বিভিন্ন কলোনিতে বাস করা শুরু করে। সেখানেই টার্গেট করে তাদের বিভিন্ন পাহাড়ি ফ্লটে কেয়ারটেকার হিসেবে থাকার ব্যবস্থা করে নিয়ন্ত্রকেরা। পরিবার নিয়ে স্থানীয়দের মত বাস করে এবং বর্ষাকাল আসলে পাহাড়কে সমতল করার পাঁয়তারা শুরু হয়। বসবাসরত অনেকে পাহাড়ে খুঁটি গেড়ে দিয়ে রাখে। যাতে বৃষ্টির পানি পাহাড় ভেঙে যায়। আর এমন কাজ করে নি¤œআয়ের মানুষেরা। তারপর ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক গোষ্টি জায়গার মালিক থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। রাজনৈতিক মিটিং মিছিল, কলোনিভিত্তিক দাপট বজায় রাখতে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নি¤œআয়ের মানুষদের বসতি গড়ে তোলে তারা। সময়ের সাথে পাহাড় ধ্বংস হয়ে গড়ে ওঠে আবাসিক এলাকা। আর নি¤œআয়ের মানুষগুলো দিয়ে নতুন পাহাড় টার্গেট করে স্থানীয় পাহাড়খেকোরা। আর তারাই টাকার বিনিময়ে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ নিশ্চিত করে। বর্ষাকালে বিচ্ছিন্ন করলেও পরবর্তীতে আবারও তাদের বসতি স্থাপন করায় তারা।
জানা গেছে, নগরীর লালখানবাজার ওয়ার্ডের ভোটের হিসাব নিয়ন্ত্রণ করে মতিঝর্নাসহ আশপাশের বিভিন্ন পাহাড় ঘিরে গড়ে ওঠা লক্ষাধিক মানুষের বসতি। শুধু এসব এলাকাতেই এসব ভোটারের সংখ্যা ১২-১৩ হাজার। অতিবৃষ্টিতে ভ‚মিধস হলে পাহাড়ের নিচের দিকে বসবাসকারীদেরও বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। শুধু পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। ধস নামলে প্রথমে তারাই হতাহতের শিকার হবেন। এভাবে পাহাড়ে দালান করার লোভে রচিত হয় মৃত্যুর মিছিল। স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা বলছেন, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের লেজুড়বৃত্তি, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করাসহ সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী বাড়ছে। এমনকি পাহাড় কাটা বন্ধে টাস্কফোর্স এবং দোষীদের দ্রæত শাস্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন পিপল’স ভয়েস। গত ২০০৭ সালের ১৭ জুন চট্টগ্রাম মহানগর এবং ২০১৭ সালে রাঙামাটি ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে নিহতদের স্মরণে এই নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাহাড় মালিকদের উদাসীনতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেওয়া ও পুনর্বাসনে সফলতা আসছে না। উল্টো আবাসনগত সব সুযোগ-সুবিধা থাকায় পাহাড়ে বসতি বাড়ছে।
নগরী ও আশপাশের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের প্রকৃত সংখ্যা প্রশাসন বা অন্য কোনো সংস্থার কাছে নেই। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকা অনুযায়ী নগরীর ৬৫ পাহাড়ের মধ্যে ৩৪ পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার বসবাস করছে। অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৫৩১টি। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৩০৪টি।
ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো হলো রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, পূর্ব ফিরোজ শাহ এক নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মালিনাকানাধীন কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি করপোরেশন পাহাড়, রেলওয়ে, সওজ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্না ও বাটালি হিল পাহাড়, ব্যক্তিমালিকানাধীন এ কে খান পাহাড়, হারুন খানের পাহাড়, পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়, মধুশাহ পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, আকবরশাহ আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, আমিন কলোনি সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়, লালখানবাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড় এবং এমআর সিদ্দিকী পাহাড়।
এদিকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে আজ (রবিবার) থেকে। গতকাল শনিবার রাতের মধ্যে সকলকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ বার্তা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন পাহাড়ে জেলা প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়। গত শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ করা হয়। প্রস্তুত রাখা হয় জেলা প্রশাসনের তত্ত¡াবধানে আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, কাট্টলি ও চান্দগাঁও সার্কেলাধীন ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়াও সীতাকুÐ উপজেলা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, চন্দনাইশ, হাটহাজারী, লোহাগাড়াতেও পাহাড়ধস এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাডের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। কিন্তু ঠিকই মানুষ সরেনি। ঘটে চারজনের প্রাণহানি। অন্যদিকে চসিক মেয়র, কর্মকর্তাগণ ও কাউন্সিলররা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষদের সতর্ক করছেন।
‘গতকাল রাত থেকে সবাইকে সতর্ক করছি, কিছু লোকজন কথা শুনছে বাকিরা কথার কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না।’ এমন মন্তব্য করে ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহেদ ইকবাল বাবু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেন, ‘বাংলাবাজার ঢেবারপাড়ের এক মহিলা ভোরবেলায় পাহাড়ধসে মাটি চাপা পড়ে। তার স্বামী টেনে তুলে। কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। দুপুরে আমরা গিয়ে অনুরোধ করেও তাকে ওই বাড়ি থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারিনি।’ এভাবেই পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে আকবর শাহ ১নং ঝিলের বরিশাল ঘোনা এলাকায় হাসি বেগমের ঘর থেকে ১০ থেকে ১৫ হাত সামনেই পাহাড়ধসে ঘরে থাকা দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরই ঘটনাস্থলে হাসি বেগম বলেন, ‘গরিবের কোনো ভয় নাই, যদি ভয় থাকত তাহলে কি পাহাড়ে থাকতাম। আমাদের টাকা নাই, সম্পদ নাই বলেই জীবনের ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ে থাকি। আজ যদি জায়গা-জমিন থাকত তাহলে পাহাড়ের চিপায় ঝুঁকিতে বসবাস করতাম না।’
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস পূর্বদেশকে বলেন, বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের জেলা প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৭টা) ৩২টি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বাকি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।
বহদ্দারহাট, চকবাজার, আগ্রাবাদসহ নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তি : জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেও বেশিরভাগ রাস্তায় কোথাও হাঁটুজল, কোথাও কোমরসমান পানি জমছে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হয় একাধিক প্রকল্প। কিন্তু এগুলোর অগ্রগতিতেও জলাবদ্ধতার কাঙ্খিত অগ্রগতি নেই। বৃষ্টি হলেই ঢুবছে রাস্তা, ঘাট থেকে শুরু করে দোকানপাটও।
গত দুই দিনের টানা বর্ষণে আবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে নগরে। নগরের নিচু এলাকা মুরাদপুর, বাদুরতলা, বহদ্দারহাট, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় রাস্তায় পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে নেমে এসেছে ভোগান্তি। পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় রিকশায় অথবা পায়ে হেঁটে হাঁটুপানি মাড়িয়ে যাত্রা করতে হয়েছে গন্তব্যস্থলে। তবে বৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকলেও বৃষ্টি থামার কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি নামতে শুরু করে।
জয়নাল আবেদিন নামের মুরাদপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘জলাবদ্ধতার সমস্যা আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। মেগা প্রকল্পের কাজ দুই বছর আগে যেমন চলতে দেখছি, এখনো একই জায়গাতেই আছে। মুরাদপুরের মতো একটি ছোট জায়গার কাজ তারা দুই বছরে শেষ করতে পারেনি। উন্মুক্ত খালের মধ্যে পড়ে মানুষও মারা গেছে। সরকারের টাকা ব্যয় হচ্ছে, বাস্তবে জনগণের কোনো উন্নতি হয়নি।’
বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার এই দুর্ভোগের জন্য সেবাসংস্থাগুলোর খামখেয়ালিপনাকে দায়ী করছেন নগরবাসী। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রধান দুই সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মধ্যেও কোনো সমন্বয় নেই। যার কারণে এ দুই সংস্থাও পরস্পরকে দোষারোপে লিপ্ত। এতোদিন খালের কাজে দেয়া বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে বলে চসিক থেকে দাবি করা হয়েছিল। তবে সবগুলো বাঁধ অপসারণের পরও ঢুবছে নগরী। অন্যদিকে সিডিএ’র তত্ত¡াবধানে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ চললেও বাস্তবে কাজের তেমন কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় দ্বিতীয় মেয়াদে সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে ৭০ শতাংশ কাজের অগ্রগতি দেখানো হলেও জলাবদ্ধতায় আগের মতোই ঢুবছে নগরী।
ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় কিছু অংশের কাজ বাকি থাকায় বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে জানিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, কিছু খালের কাজ শেষ করলেও সেখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা থেকে গেছে। একটি খালের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও সেখানে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় ১০ শতাংশ কাজ করা যায়নি। সেটার কারণে পানি নামতে পারছে না। খালের বাঁধ সবগুলো অপসারণ করা হয়েছে। বৃষ্টি হলে পানি উঠবে, তবে সেটা আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে।
প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে খালের মধ্যে দেয়া হয়েছিল অনেক বাঁধ। চসিকের পক্ষ থেকে এই খালের বাঁধগুলোকে বিষফোঁড়া হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বারবার তাগিদ দেওয়া হয় বাঁধ অপসারণের। চাপে পড়ে অপসারণ হয়েছে বাঁধগুলো, কিন্তু তারপরও পানিতে থৈ থৈ অবস্থা। বৃষ্টি হলেই খাল-নালা, রাস্তা সবই একাকার হয়ে পড়ছে। ঘটছে নানা দুর্ঘটনাও। গত কয়েকবছরের মধ্যে খালে-নালায় পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। এদের মধ্যে একজনের লাশ এখনো মেলেনি। খাল-নালাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও এখনো নিরাপদ করার কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চললেও আপাতত জলাবদ্ধতা মুক্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বহুমাত্রিক এই সমস্যার একমাত্রিক কোনো সমাধানও সম্ভব নয়। তবে জলাবদ্ধতার তীব্রতা কমানোর যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করছেন নগরবাসী।
চসিকের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ : অতি বর্ষণের কারণে নগরীরতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতিতে নগরবাসীর জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশংকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন টাইগারপাসস্থ নগর ভবনের কনফারেন্স রুমে জরুরি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নগরীর কোথাও কোন ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটলে তা দ্রুত মোকাবেলায় চসিকের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যোগাযোগ করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহব্বান জানান। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে যোগাযোগের নম্বর : ০১৭১৭-১১৭৯১৩ অথবা ০১৮১৮-৯০৬০৩৮।
পাহাড়ধসে প্রাণহানির যত ঘটনা : প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি অনেককে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। নষ্ট হয় সম্পদ। পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ২০০৭ সালে। সে বছরের ১১ জুন টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে মারা যায় ৩০ জন। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বৃষ্টির সময় নগরের বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড়ধসে তিনজন নিহত হয়। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মা-মেয়ে মারা যায়। সর্বশেষ শনিবার দিবাগত রাতে ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন।