পাশবিকতা লাগামহীন

8

তুষার দেব

ক্রসফায়ারের ভয় কিংবা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করেও সমাজে পাশবিকতার লাগাম টানা যাচ্ছে না। হরহামেশাই কোথাও না কোথাও শিশু কিংবা নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে আবার সাম্প্রতিক সময়ে দলবেঁধে সংঘটিত হচ্ছে একের পর এক ধর্ষণকান্ড। এমন জঘন্য পাশবিকতার ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। সর্বশেষ গত পয়লা আগস্ট পটিয়ায় সংঘটিত দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাশবিকতার অধিকাংশ ঘটনার পরপর জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকেই।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি বছরের বিগত আট মাসে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে নয় শতাধিক। তার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে একশ’ ৭৭ টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩৮টি। ধর্ষণের শিকার হওয়া অন্তত ১২ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ধরেই সংস্থাটি এসব তথ্য জানিয়েছে। এর বাইরে অজানা কিংবা প্রকাশ্যে না আসা যৌন নিপীড়নের ঘটনা অসংখ্য বলেও তারা দাবি করেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রাণা দাশগুপ্ত দেশজুড়ে ধর্ষণের মত বর্বরোচিত পাশবিক ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়াকে অশনি সঙ্কেত বলেই মনে করছেন। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের নৈতিক চরিত্রে মড়ক লাগা আর মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি পূর্বদেশকে বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান সমাজ নৈতিকতার বিপরীত স্রোতধারায় পরিচালিত হচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মনোবৃত্তিতে ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন বলতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। নৈতিক চরিত্র গঠনের কোনও চর্চাই এখন আর চোখে পড়ে না। এতে করে সর্বক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা বিস্তার লাভ করছে। ভোগবাদী জীবনের নেশায় বিভ্রান্তির অন্ধকার গলিপথে দৌড়াতে গিয়ে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের সহজাত কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চাল-চলন ও কার্যকলাপ। মূল্যবোধে যেন মড়ক লেগেছে। এ থেকে কারও পরিত্রাণ নেই।
চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে একের পর এক দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। তিনি বলেন, নারী ও কন্যার প্রতি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সারা দেশে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বর্বরোচিত এই অপরাধের মূলোৎপাটনের উপায় খুঁজে বের করাই এখন বেশি জরুরি। কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি ধর্ষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
একের পর এক দল বেঁধে ধর্ষণ ঃ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত পয়লা আগস্ট পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের চাপড়া গ্রামে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় এক তরুণীকে একই গ্রামের বাসিন্দা এক অটোরিকশা চালকসহ চারজন মিলে দলবেঁধে ধর্ষণ করে। পটিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম মজুমদার জানান, দলবদ্ধ পাশবিকতার শিকার ওই তরুণী উপজেলা সদরের আমজুরহাট এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় কারখানা থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশার অপেক্ষায় ছিলেন। এসময় একই গ্রামের বাসিন্দা ও পূর্বপরিচিত অটোরিকশা চালক হৃদয় হোসেন সাগর (২২) অটোরিকশা নিয়ে তার সামনে আসে। অটোরিকশায় আরও চার যুবক বসা ছিল। সবাই একই গ্রামের বাসিন্দা এবং ওই তরুণীর পরিচিত। তরুণী অটোরিকশায় উঠার পর তাকে জোর করে চাপড়া গ্রামে নিয়ে যায় অন্যরা। তারপর প্রাচীরঘেরা একটি খালি জায়গায় নিয়ে তাকে চারজন মিলে ধর্ষণ করে। তরুণীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন উপস্থিত হলে তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরদিন তরুণীর বাবা বাদি হয়ে পটিয়া থানায় মামলা করলে পুলিশ ভুক্তভোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করে। গ্রেপ্তার চালক হৃদয়কে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনদিন পর ঘটনায় জড়িত অটোরিকশা চালক হৃদয়কে নগরী থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের গত জুলাই মাসে নগরীতে একাধিক দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গত ১৭ জুলাই এক গৃহবধূ রিকশা করে ষোলশহর এলাকায় খালার বাসায় যাওয়ার পথে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। ঘটনার দিন তাকে বহনকারী রিকশাটি নগরীর জিইসি এলাকার বাটা গলির সামনে পৌঁছালে তিন যুবক রিকশার গতিরোধ করে। এরপর যুবকরা ওই গৃহবধূকে জোরপূর্বক রিকশা থেকে তুলে নিয়ে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নিচে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে উপস্থিত থাকা আরও তিন জন মিলে গৃহবধূকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। তার চিৎকার শুনে এক রিকশাচালক জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে ঘটনাটি জানায়। পুলিশ এসে পাশবিকতার শিকার গৃহবধূকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী বাদি হয়ে থানায় মামলা করলে পুলিশ জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার দু’দিন পর গত ১৯ জুলাই গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে নগরীর অক্সিজেন মোড়ের রেলক্রসিং এলাকায় এক গৃহবধূকে বাসে তুলে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে সিএমপির বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা হয়। মামলার পরদিন পুলিশ জেলার হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে অভিযান চালিয়ে মামলার আসামি হলেন বাসচালক নুরুল আলম, তার সহযোগী মোহাম্মদ রবিউল, মো. শাহজাহান ও মো. রাজুকে গ্রেপ্তার করে। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান জানান, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ স্বামীর সঙ্গে নগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকায় বসবাস করেন। সপ্তাহ খানেক আগে জুতা কেনা নিয়ে এক দোকানদারের সঙ্গে ওই গৃহবধূর কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। এ বিষয়ে আদালতে মামলা করার জন্য ওই গৃহবধূ তার এক আত্মীয়ের সঙ্গে আলাপ করতে নগরীর বায়েজিদের ছিন্নমূল এলাকায় যান। ঘটনার দিন দুপুরে চাচার বাসা থেকে বেরিয়ে অক্সিজেন মোড়ে আসেন ওই গৃহবধূ। ওই সময় তিনি চট্টগ্রাম আদালত ভবনে যাবেন বলে জানান বাসচালককে। বাসচালক নুরুল আলম ওই গৃহবধূকে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে তুলে ফেলেন। তখন বাসে অন্য কোনও যাত্রী ছিল না। পরে দরজা বন্ধ করে চালক নুরুল আলমসহ দুজন মিলে ধর্ষণ করেন। বাকি তিনজন ধর্ষণের চেষ্টা করেন। পরে ধর্ষণের শিকার ওই গৃহবধূ বিষয়টি অক্সিজেন মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান নামে। গৃহবধূকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।