পানি দ্রুত নামতে না পারায় হুমকিতে আউশের ক্ষেত

37

সীতাকুন্ডে টানা দশদিন বৃষ্টিপাতের কারণে পানিতে ডুবে সাত হাজার হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে ঢেঁড়শ, লাউ, কাকরলসহ ৮৪০ হেক্টর ফসলি জমি এখনো পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। যদি দ্রুত পানি না নামে তাহলে এসব ফসলের গোড়ায় পচন ধরে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছে স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাফকাত রিয়াদ জানান, উপজেলার স্লুইচ গেইটগুলো অকেজো থাকায় পানি নামতে সময় বেশি সময় লাগছে। বিশেষ করে ভারী বৃষ্টিপাতে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে বেড়িবাঁধের মাটি এসে স্লুইচ গেইগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত এগুলো সংস্কার করা এবং পাহাড়ি ঢল যাতে দ্রুত সাগরে নেমে পড়ে, সেজন্য পাহাড় থেকে নদী পর্যন্ত খালগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। পাহাড়ি ঢল ও সাগরের জোয়ারের পানি ফসলি জমি থেকে নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করা সম্ভব হবে। পানি যদি নামতে বাঁধাগ্রস্ত হয় তাহলে পানি বাহিত রোগে ধান ও সবজি গাছের গোড়ায় পচন ধরে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফসলি জমিতে পানি নেমে যাওয়ার পর তা নিরুপণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে কৃষকদের সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সূত্র জানায়, উপজেলায় ৭ হাজার হেক্টর আউশ ধান ও ৮৪০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষাবাদ করা হয়েছে। প্রতিবছর অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখিন হন। এসব জমির ফসল নষ্ট হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে পাহাড় থেকে নদী পর্যন্ত ছোট-বড় সবগুলো খাল সংস্কার প্রয়োজন। শিল্প অঞ্চলের পাশাপাশি কৃষি প্রধান উপজেলা চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড। এ অঞ্চলের বেশির ভাগই মানুষ কৃষির উপর নির্ভর করে আসছে বহু বছর ধরে। পূর্বে পাহাড় এবং পশ্চিমে সাগর পাড়ের মানুষের জীবনরক্ষা বেড়িবাঁধ। আদিকাল থেকেই এখানকার কৃষকেরা জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফসল ফলিয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আসছে। মৌসুমে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আগত পাইকার এখানকার অধিক উৎপাদিত সবজি কিনার জন্য উপজেলার বিভিন্ন বাজার হাটগুলোতে ভিড় জমান। কিন্তু ২০১৭ সালের পর সৃষ্ট বর্ষার মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী উপক‚লীয় এলাকার বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় ¯স্লুইচ গেটের উপরে মাটি বসে ¯স্লুইচগেইগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে পানি চলাচলের রাস্তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সাগরের সাথে সংযুক্ত খাল ও ছড়াগুলো মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের সু-ব্যবস্থা না থাকার কারণে বর্ষার মৌসুমে কৃষকদের সবজি ক্ষেতে পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বানের পানিতে জমির ফসল এবং পুকুরের মাছ ভেসে যাচ্ছে। পানি না কমায় দিন দিন কৃষকদের ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েই চলেছে।
উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের সাগর উপক‚ল এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত অধিকাংশ খাল ও গুলিয়াখালী স্লুইচ গেটসহ বিভিন্ন স্লুইচ গেট দীর্ঘদিন ধরে ধসে পড়ায় পাহাড়ি ঢলের পানি কৃষকদের আবাদি জমিতে ঢুকে পড়েছে। ফলে অসংখ্য কৃষক পরিবার এখন জমির চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাছেন।
অন্যদিকে সদ্য রোপন করা আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত বর্তমানে পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানান মুরাদপুর এলাকার কৃষক আবু তাহের। তিনি বলেন, গত ১০ জুন ১৬০ শতক জায়গায় আউশ জাতের ধান রাজকুমার হাইব্রীড রোপণ করেছি। এছাড়া ২০০ শতক জমিতে বরবটি ও ৩৪ শতকে লাউ এর আবাদ করি। আবাদ অনুযায়ী জমিতে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক প্রতিদিন নাস্তাসহ ৫০০ টাকা মুজুরিতে কাজ করছেন। ২০১৭ সালে স্লুইচ গেট ধসে পড়ায় এখানকার কৃষকদের সকল সবজি ক্ষেত পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরেও অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমরা ধান চাষসহ বিভিন্ন রকম সবজির আবাদ করেছি। মুরাদপুর গুলিয়াখালী স্লুইচ গেটটি সংস্কার না হওয়ায় এখানকার হাজার হাজার একর জমির ধানের চারা ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।
একই এলাকার কৃষক মো. আইয়ুব আলী জানান, এই মৌসুমে ১২০ শতকে জমিতে আউশ জাতের ধান দূর্বার রোপণ করেছি। তার পাশাপাশি বরবটি রোপণ করেছি ৬৬ শতক জমিতে। কিন্তু পাহাড়ির ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে এসব জমি।
মুরাদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহেদ হোসেন নিজামী (বাবু) বলেন, ২০১৭ সালে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গুলিয়াখালী স্লুইচ গেইটটি ধসে পড়ে গিয়েছিল। ফলে চলতি বর্ষায় কৃষকদের আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আমার নিজের পুকুর সহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের অন্তত ২শ’ পুকুরের মাছ পানির শ্রোতে ভেসে আরো ৩ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে সর্বমোট ৫ কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হন এ ইউনিয়নের সবজি ও মৎস্য চাষিরা। এছাড়া এ ওয়ার্ডের প্রতিটি সড়ক পাহাড়ি ঢলের পানিয়ে ডুবে একাকার হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন খাল ও স্লুইচ গেট সংস্কার বিষয়ে একটি ফাইল পানি মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে। খাল ও স্লুইচ গেট দ্রুত সংস্কার করা না গেলে প্রতি বর্ষার মৌসুমে কৃষক ও মৎস্য চাষিরা বার বার ক্ষয় ক্ষতির শিকার হবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, খাল সংস্কার ও স্লুইচ গেইট দেখভাল করার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তারপরও আমি নিজেই বাসা এবং অফিসে পানিবন্দী ছিলাম। এটার একমাত্র কারণ খাল সংস্কার না থাকা। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি যত দ্রুত সম্ভব আমরা খাল, বেড়িবাঁধ ও স্লুইচ গেইট সংস্কারের কাজ শুরু করবো।
অপরদিকে এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুন্ডের সাংসদ দিদারুল আলম বলেন, সরকারি বরাদ্ধ আসতে সময় লাগার কারণে আমি নিজ উদ্দ্যোগে একটি এসকেভেটর প্রথমে মুরাদপুর ইউনিয়নে কিনে দিয়েছি, যাতে দ্রুত খালগুলো সংস্কার করা যায়। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখেছি, উনারা যাতে সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে দ্রুত এসব খাল ও স্লুইচ গেইট সংস্কার করেন।