পানির দাম বৃদ্ধির অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয় জনস্বার্থে ওয়াসাকে সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে হবে

5

যা ছাড়া জীবন অচল তার নাম পানি। সুতরাং মানুষ বেঁেচ থাকার প্রধান অবলম্বন পানি। সবকিছুর দাম বাড়বে, অর্থকড়ি না থাকলে কয়েকবেলা খাওয়া হবে না, তাতে কি, পানি তো আছে! কিন্তু ওয়াসা জীবন বাঁচানোর একমাত্র সস্তা খাদ্য পানিটি আর সস্তায় দিতে না রাজ। পানিরও দাম আছে, সস্তা হলে পানির দাম বলে পানিকে আর হেয় করা যাবে না! চট্টগ্রাম ওয়াসার দফায় দফায় পানির দাম বৃদ্ধির ফলে অন্তত মনে করা যায়, পানি পানির মত সস্তা আর নয়। পানির দাম দিতে হবে। এ জন্য অজুহাত আর যুক্তির কমতি নেই ওয়াসা কর্তৃপক্ষের। বুধবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঋণশোধের অজুহাতে এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এভাবে গত ১১ বছরে অন্তত ১১ বার বাড়ানো হল ওয়াসার পানির দাম। সূত্র জানায়, বর্তমানে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলছে ওয়াসার অধীনে। যে প্রকল্পের অজুহাতে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে, নানা অজুহাতে সেই প্রকল্পগুলোর বাজেট বাড়ানো হয়েছে বারবার। তবে চট্টগ্রাম নগরের বিশিষ্টজনের দাবি, গণমাধ্যমে ওয়াসার যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র দেখতে পাওয়া যায়, তাতে মনে হয়, সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির টাকা রিকভার করতেই নগরীর ওয়াসার গ্রাহদের উপর পানির দাম বাড়ানো হচ্ছে। মূলত ওযাসার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হলে আর পানির দাম বাড়ানোর কোন প্রয়োজন পড়বে না। লক্ষ্য করার বিষয়, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলছে, এসব প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। তাছাড়া ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এ অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক ও হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু কোন প্রতিকার না হওয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার অনিয়ম বা দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, ৮ মাসের ব্যবধানে যে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে তাতে, আবাসিকে ৩৮.২৫ শতাংশ এবং অনাবাসিকে ১৬.২৮ শতাংশ পানির দাম বাড়িয়েছে সংস্থাটি। এখন থেকে সংস্থাটির প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম হবে আবাসিকে ১৮ টাকা এবং অনাবাসিকে ৩৭ টাকা। চলতি আগস্ট মাস থেকে নতুন দর কার্যকর করবে সংস্থাটি। আইন অনুসারে বছরে শুধু একবার ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও ২০১৯ সালের শুরুতে একবার দাম বাড়ানোর পর ছয়মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার দাম বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় ওয়াসা। তখন আবাসিকে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৯ টাকা ৯২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা এবং বাণিজ্যিক খাতে প্রতি ইউনিট ২৭ টাকা ৫৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। পরের বছর ২০২০ সালের ফেব্রæয়ারি থেকে দাম বাড়ানো হয় আবাসিকে ২৫ শতাংশ এবং অনাবাসিকে ৯.৯৪ শতাংশ। এতে চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিক সংযোগে প্রতি হাজার লিটার পানির দাম ১২ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিকে ৩০ টাকা ৩০ পয়সা দাঁড়ায়। গতবছরের ডিসেম্বরে আবার ৫ শতাংশ হারে দাম বাড়িয়ে আবাসিকে প্রতি ঘনমিটার (একহাজার লিটার) পানির দাম ১৩ টাকা দুই পয়সা, অনাবাসিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়। সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠায় চট্টগ্রাম ওয়াসা। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৭ জুলাই পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রণালয়। ২৮ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের পাস-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব এ.কে.এম সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে পানির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি ওয়াসাকে অবহিত করা হয়। চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির দাম বৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ দাবি করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জনস্বার্থ বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহবানও জানিয়েছে। সম্প্রতি করোনা পরবর্তী অবস্থা ও আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধকে সামনে রেখে বৈশ্বিক সংকট বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও জ্বালানী থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সকল খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় পানির দাম আবারও বৃদ্ধির উদ্যোগ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’- হয়ে দেখা দেবে। আমরা আশা করি, স্থানীয় সরকার চট্টগ্রামে পানির দাম বৃদ্ধি না করে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগ নিলে আরো ভালো ফল পাওয়া যাবে। এ মুহূর্তে জনদূর্ভোগের কথা চিন্তা করে পানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এমনটি প্রত্যাশা নগরবাসীর।