পানিতে ডুবে শিশু-মৃত্যু অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে

28

 

জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় বাংলাদেশে। বাংলাদেশে যে কয়েকটি শিশু-মৃত্যুর কারণ রয়েছে তার মধ্যে পানিতে ডুবে শিশু-মৃত্যুর কারণটি প্রধান। পরিবারের অসতর্কতা এর অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ একটু সতর্ক হলেই এই ধরনের মৃত্যু থেকে শিশুকে আমরা রক্ষা করতে পারি। যেহেতু অনেক সময় অভিভাভকের অগোচরেই একটি শিশু চলে যায় পাশের কোনো ডুবা, পুকুর বা খালে। তারপর তার করুণ পরিণতি ঘটে। অথচ অভিভাবকদের একটু সচেতনতাই পারে, পানিতে ডুবে শিশু-মৃত্যুর এই হারকে অনেকাংশে কমিয়ে আনতে।
প্রতিবেশী ভারতে পানিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু হার বাংলাদেশেই বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটে এশিয়াতেই, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়। যেখানে আবার পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বলে জানাচ্ছে এক জরিপ। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে গড়ে দিনে ৪০টি শিশু মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে।
আমরা জানি আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে অনেক নদী-নালা, খাল-বিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে; যার সিংহভাগই অরক্ষিত। তাই যখনই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, সাধারণ মানুষ এটাকে খুব সহজেই বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেয়।
যদিওবা নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, পুকুর-ডোবা নিয়ে গঠিত এই ব-দ্বীপে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি প্রধানতম সমস্যা। তাছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা, ঘরের কাছাকাছি খানাখন্দের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বন্যা-ই শিশু-মৃত্যুর আরেকটি মূল কারণ। এক্ষেত্রে পানিতে ডুবে শিশু-মৃত্যু রোধে সাঁতার শেখানোর বিকল্প নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার গ্রামাঞ্চলে বেশি। এর বড় একটি কারণ হচ্ছে গ্রামের বাড়ি গুলোর পাশেই পুকুর, ডোবা বা জলাধার থাকতে দেখা যায়। যেগুলোতে কোন ধরনের বেষ্টনী থাকে না। অভিভাবকের সামান্য অসতর্কতা থেকে সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুগুলো খেলতে খেলতে একটা সময় জলাধারের কাছাকাছি চলে আসে, আর ঘটে দুর্ঘটনা।
এ দেশে প্রতিবছর ২২ হাজার লোক পানিতে ডুবে মারা যায়। আর এর বড় অংশই শিশু। এক থেকে ১৭ বছর বয়সী কমপক্ষে ১৮ হাজার শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া বেশির ভাগ শিশুর বয়স ১০ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে। এরা মূলত পরিবারের পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যু হয় সাঁতার না জানার কারণে।
তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান। এরমধ্যে বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের এ সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। এছাড়াও পানিতে ডোবার কারণে আরো ১৩ হাজার শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। আহত হয় আরও ১ লাখ শিশু। এছাড়াও পুকুর বা নদীতে গোসলের সময়ও অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বছরজুড়েই এ দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশু-কিশোরেরা। কারণ পানির উৎস যত কাছাকাছি থাকে, মৃত্যুঝুঁকি ততই বেশি।
তাই বর্তমানে আমাদের দেশে সাঁতার শেখাটা একরকম বাধ্যতামূলক কাজ বা শিশুদের সাঁতার শেখানোটা অভিভাবকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। মাত্র দুই তিন দশক আগেও এমন শিশু খুব কমই খুঁজে পাওয়া যেতো যে সাঁতার জানেনা বা শিশু থেকে শেখেনি। কিন্তু নগরায়ণের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের নদ-নদী, পুকুর-ডোবা, খাল-বিল। সাঁতার বিষয়টি তো আর এমন নয় যে বইয়ে পড়েই কেউ শিখে যাবে। বরং এটি অভ্যাসের বিষয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় শিশুর অভিভাবকের চরম দায়িত্বহীনতা কাজ করে। কাজ করে অসচেতনতা। শিশুর প্রতি একটু সচেতন না হলে যে কতবড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে তার প্রমাণ পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা।
তাই এক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে পানিতে ডুবে শিশু-মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।
১. দশ মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের প্রতি পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং চার বছর বয়স থেকে শিশুকে সাঁতার শেখানো প্রয়োজন।
২. ডোবা ও পুকুরের চারপাশে বেড়া দেওয়া।
৩. পানি থেকে তোলার পরপরই শিশুকে কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসা, অর্থাৎ শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে সাহায্য করা; কারণ এ সময় শিশু অক্সিজেন-স্বল্পতায় ভোগে।
৪. শিশুকে দ্রুত হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশের (আইডিআরসিবি) তথ্য অনুযায়ী, শুধু সাঁতার শেখানোর মাধ্যমেই ৯৬ শতাংশ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। তাই সমাজকে তথা পরিবারকে এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হতে হবে এবং শিশুর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সাথে সাথে শিশুকে সাঁতার শেখানোর কাজটিও করতে হবে। কেননা পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুতে একটি পরিবার যেমন সন্তান হারায়, তেমনি দেশ হারায় তার মূল্যবান মানবসম্পদ। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের অভিভাবকরা আরো অনেক বেশি সচেতন হবেন বলে আশা করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক