পাতে উঠছে না ইলিশ

27

মনিরুল ইসলাম মুন্না

ভরা মৌসুম ও নগরীর সব হাটবাজারে পাওয়া ছোট-বড় আকারের ইলিশ পাওয়া গেলেও সাধারণ ক্রেতারা এর স্বাদ নিতে পারছে না। ফলে কেনাবেচাও তেমন জমছে না। অন্যদিকে মাংসের অবস্থাও ৮-৯ শ’ টাকার উপরে। ক্ষেত্র বিশেষে গরুর মাংসের চেয়েও দাম বেশি পড়ছে ইলিশের। এতে আমিষ জাতীয় খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ আয়ের মানুষ।
এদিকে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত ইলিশ মাছ ধরা পড়লেও বাজারে মাছের সরবরাহ কম, তাই বেশি দামে ইলিশ বিক্রি করতে হচ্ছে-এমনটা দাবি মাছ ব্যবসায়ীদের।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ পূর্বদেশকে বলেন, ‘ইলিশের চাহিদা অন্য মাছের তুলনায় সব সময় বেশি থাকে। তাছাড়া সমুদ্রে বা নদীতে আহরণের খরচও অন্যান্য বছরের তুলনায় বেড়েছে। যেমন- জেলেদের নিত্যপণ্য, বোটের জ্বালানি তেলসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির খরচসহ সবকিছুর দাম বাড়তি। তাই পুষিয়ে নিতে হয়তো কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।’
ভরা মৌসুমে ইলিশ আহরণ সম্ভব হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘এখনও চূড়ান্তভাবে নিরূপন করতে পারছি না, কি পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে। আরও দু-একটা জো (উপযুক্ত সময়) এর অপেক্ষা করছি। তারপর বলতে পারবো কেমন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ‘বৃষ্টির সঙ্গে ইলিশ মাছ ধরার একটা জো আছে। বৃষ্টি হলে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ ধরা পড়বে। তখন বড় বড় ইলিশ মাছ ধরা পড়বে। সাগরে এবার প্রচুর ইলিশ হয়েছে। অনেক বড় ইলিশও আছে। আশা করছি, এবার আমরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি আহরণ করতে পারব।’
ক্রেতারা বলছেন, ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে একমাস অতিবাহিত হয়েছে। তারপরও প্রতিনিয়ত জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। তাই বলে দাম কি হাজারের উপরেই রাখতে হবে? এটা কি আর কমবে না? যদি প্রশাসন মাছের বাজারেও তদারকি করে, হয়তো স্বস্তি পাওয়া যেতো।
গতকাল শুক্রবার নগরীর ফিশারীঘাট, বহদ্দারহাট ও আন্দরকিল্লা সাব এরিয়া বাজার ঘুরে জেলে, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দরদামের এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বহদ্দারহাট বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘বাজারে ইলিশ মাছের ভালোই সরবরাহ দেখছি। কিন্তু দাম বেশ চড়া। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম নিচ্ছে ৮৫০ থেকে এক হাজার টাকা, ছোট ইলিশের (জাটকার চেয়ে একটু বড়) কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। এছাড়া জাটকা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এত দামে ইলিশ কিনব কীভাবে?
মাছ বিক্রেতা প্রবীণ জলদাশ বলেন, ‘বৃষ্টি হওয়ার পর থেকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। তবে নতুন আসায় দাম কিছুটা বেশি। সরবরাহ আরও বাড়লে ধীরে ধীরে দাম কমবে। তবে আপাতত দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা কিনতে পারছে না। ফলে ইলিশ কেনাবেচাও জমে উঠছে না।’
বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম ১৪শ’ টাকা, দেড় কেজি ওজনের দাম ১৮শ’ টাকা এবং ২ কেজি ওজনের ২২শ’ টাকা, দুই কেজির উপরেরগুলো কেজি আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজির কম ইলিশের কেজি এক হাজার টাকা। আধা কেজির নিচের সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাব এরিয়া বাজারে মাছ কাটায় ব্যস্ত আজাদ হোসেন বলেন, ‘বাজারে ইলিশ বেশি থাকলেও বিক্রি কম। বড় লোকেরা কিছু কিনলেও মধ্যবিত্তদের নিতে দেখা যাচ্ছে না। আজকে (শুক্রবার) সারাদিনে ৪-৫টির বেশি ইলিশ মাছ কাটিনি। অথচ এ সময়ে প্রতি বছর প্রচুর ইলিশ কেনাবেচা হয়।’
ফিশারি ঘাটে অবস্থান করা মাছ ধরা ট্রলারের জেলে কবির হোসেন বলেন, ‘ট্রলারের জন্য দ্বিগুণ দামে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মাছ ধরা জেলেদের পারিশ্রমিকও বেড়েছে। এ কারণে মাছের দাম বেড়েছে।’
ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য মাছের দামও বেশি। গত সপ্তাহের দামে লইট্যা বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকার উপরে। তাছাড়া পোয়া ২৫০ থেকে ৩২০ টাকা, কোরাল ৫২০ থেকে ৬০০ টাকা, রূপচান্দা ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তাছাড়া তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চাষের মাছের দামও। বাজারে রুই, কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে ২৬০ থেকে ৩৮০ টাকা পর্যন্ত। আর পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকার উপরে। বলা যায় ২০০ টাকার নিচে কোন মাছ বাজারে মিলছে না।
মাংসের বাজারেও দাম কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগিসহ অন্য সব মুরগির দাম। ব্রয়লার মুরগি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা। সোনালি মুরগি ২৮০ টাকা থেকে ৩২০ টাকা। দেশি মুরগি ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা। লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা ডজন।
তবে স্থিতিশীল রয়েছে গরু ও খাসির মাংসের দাম। বাজারে গরু মাংস বিক্রি হয়েছে কেজি ৭৫০ থেকে ৯৫০ টাকা। আর খাসি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০ টাকা ।
খুচরা বাজারে আমদানির পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, রসুন ২১০ টাকা ও আদা ১৭০ টাকা দরে। তাছাড়া খোলা চিনি প্রতি কেজি ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর ভোজ্যতেল খোলা সয়াবিন লিটারপ্রতি বিক্রি হয়েছে ১৬৮ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন ১৭৫ টাকা আর প্যাকেটজাত সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ১৬৮ টাকা কেজিতে। তাছাড়া লবণ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। মসলার বাজারে দাম অনেকটা গত সপ্তাহের মতোই।
এছাড়া কোন ধরনের সবজি ৬০ থেকে ৭০ টাকার নিচে মিলছে না। গত সপ্তাহের যে মানের সবজি বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায় তা গতকাল বাজারে বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকার উপরে। দুই সপ্তাহ আগে যে বরবটি বিক্রি হয়েছিল কেজিতে ৬০ টাকায় তা গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা। এতদিন যে মানের বেগুনের কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা ছিল তা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকার উপরে। এরকম অনেক সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। তাছাড়া ঢেঁড়স, কাকরোল, ঝিঙে বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর গাজর ও কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা থেকে ১৫৫ টাকায়।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন পূর্বদেশকে বলেন, ‘বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কমাতে প্রশাসনকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তা নাহলে দুষ্কৃতিকারীরা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে।’