পরীর পাহাড় ঐতিহ্য সুরক্ষায় সকলপক্ষকে সহনশীল হতে হবে

25

 

সম্প্রতি তুচ্ছ কারণে বা স্স্বার্থদ্বন্দ্বে জড়িয়ে প্রশাসনের সাথে নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের সাথে দূরত্ব বেড়েই চলছে। কিছুদিন আগে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সংঘটিত একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার রেশ না টানতে চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়ে আইনজীবীদের দুইটি নতুন স্থাপনা নির্মাণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাথে আইনজীবীদের বিরোধে যেন বারুদ লেগেছে। দুইপক্ষই নিজেদের যুক্তি ও অবস্থানে অটল থাকলেও এ মুহূর্তে প্রশাসন তাদের অবস্থানকে সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী পরীর পাহাড়ে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পাঁচটি ভবনসহ অননুমোদিত স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন দিয়েছেন। সূত্র জানায়, বর্তমানে পরীর পাহাড়ে থাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং ৭১টি আদালত ছাড়া বাদবাকি সব স্থাপনাই উচ্ছেদ করা হবে। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে আদালত ভবন এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য জেলা প্রশাসন সেখানে গাড়ি পার্কিং স্পেস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আইনজীবীদের বাধার কারণে সেটি তারা করতে পারেনি। সেই ক্ষোভ থেকে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি সরকারের কোনো সংস্থার অনুমোদন ব্যতিরেকে ‘বঙ্গবন্ধু আইনজীবী ভবন’ ও ‘একুশে আইনজীবী ভবন’ নামক দুইটি ১২ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহŸান করলে জেলা প্রশাসন তাতে বাধ সাধে। পরীর পাহাড়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখতে জেলা প্রশাসন গত ২ সেপ্টেম্বর কয়েকটি গণমাধ্যমে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকার পরীর পাহাড়ের আশপাশের ৩৫০টি স্থাপনাকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি এটিকে সম্পূর্ণ সরকারি খাস জায়গা দাবি করে সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা না গড়তে সতর্ক করে দেয়া হয়। আর এই বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে এই আদালত পাড়ার আইনজীবীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের বিরোধ চরমে পৌঁছে। এতটুকুতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি, গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণসহ আগে থাকা স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ ঘোষণা জানিয়ে ৮ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিও প্রেরণ করে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রতিবেদন পেশ করার পর গত সোমবার পরীর পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা যাতে না হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আইন ও বিচার বিভাগকে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারি ভবনের বাইরে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি পাহাড় এবং টিলা কেটে অবৈধভাবে ৫ টি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ সকল স্থাপনাকে পাহাড়ধস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাÐ ইত্যাদির জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করেছে।
বলাবাহুল্য, প্রায় ১৩০ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানাধীন পরীর পাহাড় নামক স্থানে চট্টগ্রাম আদালত ভবন স্থাপন করা হয়। সেখানে বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়সহ বেশকিছু সরকারি কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এই আদালত পাড়া এলাকায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের মতবিরোধ ছিল অনেক আগে থেকে। তবে সেটি প্রকাশ্যে আসে ২০১৩ সালে। সে সময় কোর্ট হিলের প্রবেশমুখে গেট নির্মাণ নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ তৈরি হয়। যেটি সে সময় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পরবর্তীতে তারা সমঝোতার মাধ্যমে গেটের নামকরণ করেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধ প্রকাশ্যে না আসলেও অনেকটা শীতল সম্পর্ক চলতে থেকে। তবে সর্বশেষ চলতি মাসে জেলা প্রশাসনের ৩৫০টি অবৈধ স্থাপনার বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানোর পর এই দ্ব›দ্ব আবারো সামনে আসে। জেলা প্রশাসন ও জেলা আইনজীবী সমিতির এ বিরোধ আমাদের কারো কাম্য নয়। আমরা জানি, প্রশাসন এবং আদালত রাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর নগরী চট্টগ্রামের আদালত নানা কারণে দেশের মানুষের কাছে সুপরিচিত। এ আদালত অঙ্গনে একই ভবনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসন কার্যালয়সহ আইনজীবীদের মিলনায়তন চেম্বার ভবন রয়েছে। প্রশাসন, সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সামনেই পুরনো ভবনগুলো নির্মাণসহ দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবীরা ব্যবহার করে আসলেও তাতে কেউ আপত্তি করেনি। হঠাৎ তুচ্ছ বিষয়ে উভয়পক্ষের বিরোধকে সামনে রেখে এসব ভবনসহ সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাতে প্রশাসনের সাথে আইনজীবীদের বিরোধ আরো ব্যাপকতা লাভের আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা মনে করেন, তাদের পুরনো ভবনগুলো সম্পর্কে সরকারের উচ্চমহলে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। তারা আইনের আশ্রয়ে যাবে। জেলা প্রশাসন অবশ্যই তা অস্বীকার করেছে। আমরা মনে করি, বিষয়টি আরো বেশি জটিলতায় যাওয়ার আগে উভয়পক্ষের উচিৎ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীল মনোভাব পোষণ করে এখনই সমাধানের পথ বের করা। নচেৎ প্রশাসন ও আইনজীবীদের এ বিরোধ সংশ্লিষ্ট সকলকে বিভ্রান্তের মধ্যে ফেলবে।