পরীক্ষার মৌসুমে বারবার সংঘাতে ছাত্রলীগ, শিক্ষার্থীরা আতংকে

16

চবি প্রতিনিধি

চলছে অক্টোবর মাস। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বিভিন্ন বিভাগের ইয়ার ফাইনাল ও সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলমান রয়েছে। এছাড়া কিছুদিনের ব্যবধানে আরো বেশকিছু বিভাগের পরীক্ষা শুরু হবে। মূলত প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর এ চারমাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব বিভাগের পরীক্ষা চলে। এ চারমাসকে বলা যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার মৌসুম। অথচ এর মধ্যেও থেমে নেই শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপের মধ্যকার সংঘর্ষ। এসব সংঘর্ষের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে।
ছোটখাটো যেকোনো বিষয় নিয়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপ উপগ্রুপগুলো দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হলে তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন দেশিয় অস্ত্র উদ্ধার করলেও কিছুদিন পর আবারো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উপগ্রুপগুলো। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা চারদিন থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে সিক্সটি নাইন, চুজ ফ্রেন্ড উইথ কেয়ার (সিএফসি) ও বিজয় নামে ৩ উপগ্রুপের মধ্যে। এর প্রেক্ষিতে ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে চবি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এর ঠিক ১২ দিনের মাথায় গত শুক্রবার খাবারের দোকানে গায়ে ডাল পড়াকে কেন্দ্র করে আবারো সংঘর্ষে জড়ায় সোহরাওয়ার্দী হলে অবস্থানরত বিজয় ও শাহজালাল হলে অবস্থানরত সিক্সটি নাইন উপগ্রুপের অনুসারীদের মধ্যে। এতে উভয় পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ২১ জন আহত হন। এ ঘটনায় গত শুক্রবারেই ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। এতে আহব্বায়ক হিসেবে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আফজালুর রহমান। এছাড়া সহকারী প্রক্টর রোকন উদ্দিনকে সদস্য ও সৌরভ সাহা জয়কে সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হয়েছে।
এসব ঘটনা ছাড়াও সারাবছরই ছোটবড় বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষে জড়ান এসব উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা। এসব সংঘর্ষ ও ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে কোন্দলের কারণে বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকার নজিরও আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাময়িকভাবে এসব নেতাকর্মীদের নিভৃত করতে পারলেও কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান বের করতে সক্ষম হচ্ছে না।
অপরদিকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় পরীক্ষার মৌসুমে সংঘর্ষের ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভীতি ও আতংক ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মতে, পরীক্ষার মৌসুমে মারামারি হলে ক্ষতির আশংকা বেশি। যদি কোনো কারণে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায় তাহলে চলমান পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হবে কর্তৃপক্ষ। আর পরীক্ষা স্থগিত হওয়া মানে তা পিছিয়ে যাওয়া। শিক্ষার্থীদের কেউই চায় না তাদের চলমান কোনো পরীক্ষা হুট করে পিছিয়ে যাক। এছাড়া সংঘর্ষ কিংবা মারামারির মধ্যে পরীক্ষা চলমান রয়েছে এমন কেউ যদি গুরুতর আহত হয়ে যান তাহলে তিনি সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে সক্ষম নাও হতে পারেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা তারই হবে। এসব কারণে অন্যান্য সময়ের তুলনায় পরীক্ষার মৌসুমে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশি ভীতি ও আতংক ছড়াচ্ছে।
সমাজতত্ত¡ বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়জুল হুদা আমজাদ পূর্বদেশকে বলেন, চবি ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে মারামারির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা সকলের কাছেই মোটামুটি জানা। এ ধরনের ঘটনা যতদিন চলমান থাকবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ভূমিকা রাখবে এবং রাখছেও। সংঘর্ষের বারবার পুনরাবৃত্তি শিক্ষার্থীদের রীতিমতো ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। ক্যাম্পাসে ঢুকলেই যেন এক ধরনের আতঙ্ক শরীরে ভর করে। এই অবস্থার গুরুতর শিকার পরীক্ষাকালীন সময়টা। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই সময়টা স্বাভাবিকভাবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন এক সময়ে এসেও ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করাটা কখনোই কাম্য নয়। এতে পড়াশোনা, পরীক্ষা, রেজাল্ট তথা ছাত্রজীবন ও কর্মজীবন দুটোই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে আতঙ্ক আর ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যা মিলিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।
একই বর্ষের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোসলেমা খানম আঁখি বলেন, ক্যাম্পাসে প্রায় সময়ই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। এমনকি পরীক্ষার সময়টাও বাদ যাচ্ছে না মারামারি থেকে। এমনিতে করোনার কারণে একবছর জটে পড়ছে সবাই, এখন ক্যাম্পাসে যদি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে কোনভাবে পরীক্ষা বন্ধ হয় তাহলে আমরা আরো জটে পড়ে যাবো। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে অনেকের।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. নূরুল আজিম শিকদার পূর্বদেশকে বলেন, আসলে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে এগুলা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। শিক্ষার্থীদের এ ধরনের ঘটনায় জড়ানো কোনোভাবেই উচিত নয়। এখন অনেক বিভাগের পরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে কোনো কারণে হুট করে পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া মানে অনেক বড় একটা ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। সামনে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষেত্রে যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর আছি। তিনি আরো বলেন, গতকালকের ঘটনায় (গত পরশু) তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যারা দোষী সাব্যস্ত হবে তাদের আমরা একাডেমিক শাস্তির আওতায় আনব।