পনেরো আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ

3

লায়ন মো. আবু ছালেহ্

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে কী ঘটেছিল তা এখন আর কারোরই অজানা নেই। কিন্তু এই কালো রাত-পরবর্তী বাংলাদেশে কী ঘটেছিল তা নিয়ে অনেকেরই দ্বিধা রয়েছে, দ্ব›দ্ব রয়েছে, রয়েছে অজ্ঞতা এবং রয়েছে ঘটনাকে অস্বীকারের রাজনীতিও। সবচেয়ে বড় কথা হলো ১৫ই আগস্টকে ঘিরে যে অপপ্রচারণা দীর্ঘ একুশ বছর যাবত চলেছিল বাংলাদেশে তা আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। ফলে এই অপপ্রচারের পাহাড় ঠেলে সত্যকে প্রকাশিত করা সহজ কাজ নয় এবং এখনও সেটা সর্বার্থে সম্ভব হয়নি। না হওয়ার কারণ বিভিন্ন, তবে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও ১৫ই আগস্টের ভয়াবহতাকে ঘিরে আবর্তিত এবং নিকট ভবিষ্যতে এই আবর্ত থেকে মুক্তিরও কোনো সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে- ঘটনাটি এতোটা সরল থাকলে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এতোটা কঠিন হতো না। বরং সত্যটা হচ্ছে দেশীয় ও বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী এবং বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তার-বিরোধী পক্ষটি একত্রিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। সে মুহূর্তে যে বা যারাই এই হত্যাকাÐে ও হত্যাকাÐ-পরবর্তী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছে তারা প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও এই হত্যাকাÐের বেনিফিসিয়ারি। খন্দকার মুশতাক এবং তার সহযোগীরা ষড়যন্ত্রকারী নিশ্চয়ই কিন্তু তার সঙ্গে চিহ্নিত খুনিরা যুক্ত হয়ে যে খুনি-চক্র গড়ে ওঠে এদেশে তাতে অংশগ্রহণ ছিল রাজনীতিবিদ, আমলা, সেনা কর্মকর্তা, বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এদেশীয় সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদেরও। তার মানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য যে পক্ষটি বাংলাদেশে কাজ করতে শুরু করেছিল তারা একটি বিশাল সংঘবদ্ধ শক্তি। বঙ্গবন্ধু তাদের অনেককেই ‘নিজস্ব লোক’ বা পরিবারের ঘনিষ্ঠজন বলে ভাবলেও তারা শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। এতোদিন পরে এসে আমরা দেখতে পাই যে, এই হত্যাকারী চক্রের উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারকে উৎখাত করাই নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র-চরিত্র থেকে শুরু করে রাজনীতিকে পর্যন্ত বদলে দিতে চেয়েছিল। আমরা কথায় কথায় বলে থাকি যে, বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানী ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তারা কিন্তু আসল সত্যটা হচ্ছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাওয়া নয়, তারা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। একেবারে ১৫ই আগস্টের পরের দিনই তারা সে পথে অত্যন্ত সফলতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। যেমন মুশতাক সরকার শপথ গ্রহণের পর পরই প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রীরা আর কোনো বিষয়ে আলাপ করেনি, তারা মূলতঃ কথা বলেছিল খন্দকার মুশতাকের টুপি বিষয়ে, যেটি আসলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ টুপির আদলে তৈরি। আমাদের জাতীয় পোশাকের সঙ্গে এই টুপিটি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল সেই বৈঠকেই। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক, যা সত্যিকার অর্থে অবৈধ ছিল তা একেবারে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। কারণ, এর মধ্যে বাংলাদেশের কোনো সরকারই নির্বাচন দ্বারা সিদ্ধ ছিল না। নির্বাচন হলেও সেসব ছিল লোক দেখানো এবং নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য চরম হাস্যকর নির্বাচন। ফলে এসব সরকারের মন্ত্রিসভা কিংবা তাদের বৈঠক কোনো ভাবেই দেশ ও জাতির প্রতি প্রতিশ্রæতিশীলতো নয়ই বরং মুশতাকের প্রথম দিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকের মতোই কেবলমাত্র ‘টুপি বিষয়ক’ আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকতো। এখানে আক্ষরিক অর্থে টুপি-কে ধরা যাবে না, এখানে টুপি বলতে খালকাটার মতো হাস্যকর বিপ্লবও হতে পারে। আরো মজার ব্যাপার হলো, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কিছুদিনের মধ্যেই যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হলো তাদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে গ্রাম্য ‘কাইজ্যা’ লেগে গেলো। কে কতোটা ক্ষমতা পাবে তা নিয়ে বচসা এতোটাই তীব্র আকার নিলো যে, নতুন করে ক্যু, পাল্টা ক্যু কিংবা গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটতে লাগলো।
খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখলের কাছাকাছি চলে গেলেন আর এদিকে খুনি চক্র জেলের ভেতর গিয়ে জাতীয় নেতাদের হত্যা করলো। এই হত্যা ও পাল্টা হত্যাকাÐের ভেতর দিয়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আরোহন করেই তার প্রধানতম পৃষ্ঠপোষক ও ক্ষমতার মসনদে বসার প্রাণপুরুষ কর্নেল তাহেরকে প্রথমে আটক ও পরে ফাঁসিতে ঝোলালেন। তার মানে রাষ্ট্রটার এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে, যে কেউ ক্ষমতা থাকলেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারতো এবং একে অপরকে খুন করে ফেলতে কোনো প্রকার দ্বিধা করতো না। এই অবস্থার ভেতরেই দেশে শুরু হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের চিহ্নিত করে হত্যাযজ্ঞ। যা থামেনি আজও, এখনও মূল টার্গেট স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধারাই, এ গ্রোত ঠেকানো যায়নি, এ ব্যর্থতার কথাও আমাদের স্বীকার করতে হবে। অনেকেই পরবর্তী কালে বলেন যে, কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে কিন্তু কেউ এ প্রশ্ন তোলেন না যে, সেই সময় সুশৃঙ্খল সেনা বাহিনীর পুরোটা আর তাদের মাথারা তাহলে কী করছিলেন? প্রথমেই আমরা ছবিতে দেখতে পাই যে, সেনা প্রধান, উপ-প্রধান থেকে শুরু করে সকল বাহিনী প্রধানগণ গিয়ে সেই উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তাদের সামনে নত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়তো আশা করেছিলেন যে, তারা এই ভয়ঙ্কর অপকর্মের পর ক্ষমতা যেই-ই নিক না কেন তার অংশীদার হবেন এবং হয়েও ছিলেন তাই। এবং এক পর্যায়ে ক্ষমতাটি দখল করবেন। করেওছিলেন তাই। এরপর কী হয়েছে? বাংলাদেশের গতি বদলেছে, বাংলাদেশের চরিত্র বদলেছে। এই বদলের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক খোলা হয়েছে, নিষিদ্ধ থাকা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি উন্মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তান থেকে জামায়াতি ইসলামের নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ক্রমশঃ দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা হয়েছে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দল খুলে তাতে একের পর এক বিশাল ওজনদার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যোগদান করিয়ে ভোটের মাঠে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই বুদ্ধি আর টাকা লাগে? বুদ্ধি না হয় বুঝতে পারি জেনারেল জিয়ার মাথায় ছিল। কিন্তু টাকাটা কোত্থেকে এসেছিল? জুগিয়েছিল বাংলাদেশ নামক সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র।
বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শাসন করতে না পারা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি অভিযোগের সঙ্গে ছেলের বিয়েতে সোনার মুকুট পরানোর অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে সেই জিয়াউর রহমানের আমলেই বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বরের বাড়ি থেকে এসবের পক্ষে কোনো প্রমাণ বের করতে সক্ষম হয় না সেনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নিজে যখন রাজনৈতিক দল খোলেন তখন কিন্তু রাতারাতি দেশ বদলে গেছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। দেশ তখনও কেবল দাঁড়াচ্ছে। ততোদিনে দেশের ফসলাদির অবস্থা বদলেছে, ৭৪-এর খরা কাটিয়ে উঠেছে কৃষকরা আর বিদেশ থেকে আসছে বিপুল পরিমাণে সাহায্য। কিন্তু কোথায় গেলো সেই সাহায্য? কেন বঙ্গবন্ধুর আমলের প্রায় ৫%-এর বেশি জিডিপি জিয়াউর রহমানের আমলে এসে ৩% এর একটু ওপরে নেমে এলো? কারণ সেনা সমর্থনে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে তা ব্যয় হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো সেই রাজনৈতিক দলও তাকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। যে হত্যাকাÐ সমর্থন দিয়ে, বলতে গেলে অংশগ্রহণ করে জিয়াউর রহমান এদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতাকে চরের মতো দখল করেছিলেন আরেকদল দখলকারী এসে তাকে উচ্ছেদ করতে দ্বিধা করেনি এবং নৃশংসভাবে খুনও হতে হয়েছে তাকে। দুঃখজনক সত্য হলো, তার স্ত্রী স্বয়ং সেই খুনের বিচার করেননি। করেননি কেন সে প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দেবে। জিয়াউর রহমানের খুনের বিচার করেননি খালেদা জিয়া সেটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের ব্যাপার। কিন্তু জিয়াউর রহমান যে পথে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধকে কখনও বদনাম করা বা এড়িয়ে যাওয়ার কাজটি করেছেন বেগম জিয়া ঠিক একই পথে হাঁটলেন। বঙ্গবন্ধুর নামটিকে তিনি এদেশ থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন বার বার ক্ষমতায় গিয়ে। নব্বইয়ের পরে যে রাজনীতি নতুন করে শুরু হওয়ার কথা ছিল তিনি সে পথেতো হাঁটেনইনি, বরং তিনি পুনরায় চলে গেলেন পঁচাত্তর পরবর্তী জিয়ার ভূমিকাতেই।
ছিয়ানব্বই সালে এসে তিনি নিজের জন্ম তারিখও বদলে ফেলে ১৫ই আগস্ট কেক কাটতে শুরু করলেন। নিষ্ঠুরতার একটা শেষ থাকা দরকার, এদেশের একদল মানুষ সে ভাবনাটাও ভাবতে চাইলো না, তারা বেগম জিয়াকে এই নিষ্ঠুরতায় আরো উস্কে দিতে শুরু করলো। রাজনীতি আবারও দুই শিবিরে বিভক্ত হলো তাই-ই নয়, বরং একেবারে বিবদমান শত্রুপক্ষ হয়ে উঠলো। তাার নেতৃত্বে ততোদিনে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শক্তি সঞ্চয় করেছে। ফলে এদেশের রাজনীতিতে দু’টি শত্রুপক্ষ আমরা দেখতে পেলাম। একদল জাতির পিতার জন্মদিনে কেক কেটে দিনটিকে উদযাপন করে আনন্দ করে আর আরেকদল এই দিনে শোক যাপন করে। কী বৈপরীত্য, কী ভয়ঙ্কর অরাজনৈতিক আচরণ আচরণ। কিন্তু সেখানেও থেমে থাকলে কথা ছিল, যে পক্ষ শোকের দিনে জন্মদিনের কেক কাটে ক্ষমতায় গিয়ে তারাই আবার ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। এসব সবই আসলে ১৫ই আগস্ট থেকে উৎসারিত ঘটনা-প্রবাহ। বাংলাদেশের রাজনীতি এ থেকে এখনও মুক্ত হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না নিকট ভবিষ্যতে। প্রশ্ন হলো, এর মধ্যে জনগণ কোথায়? অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, জনগণকেও দু’ভাগে ভাগ করে ফেলার কাজটি করা গেছে অত্যন্ত সুকৌশলে। একদল কেক কাটে আরেক দল শোকদিবস পালন করে। রাজনীতিকে এই নোংরামোতে নিয়ে আসার জন্য সর্বোতভাবে যারা দায়ী তারাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং তারাই এদেশে নেতিবাচক রাজনীতির উদ্বোধনকারী। বাঙালি এই দুর্দশা থেকে কবে মুক্তি পাবে সেটা কারোরই হয়তো জানা নেই।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক