পদ্মা পাড়ের আনন্দের ঢেউ কর্ণফুলীর তীরে

32

নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুল প্রতীক্ষার পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। পদ্মা পাড়ের সেই আনন্দের ঢেউ আঁচড়ে পড়েছে কর্ণফুলী তীরের শহর চট্টগ্রামে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আবেগ ছুঁয়ে গেছে চট্টগ্রামের আপামর মানুষকেও। উদ্বোধনের উৎসবের মধ্য দিয়ে শামিল হয়েছে চট্টগ্রামবাসী। পদ্মা সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুুলিশ ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মিছিল-শোভাযাত্রা, বড় পর্দায় উদ্বোধনের অনুষ্ঠান দেখার উন্মুক্ত আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচিতে গতকাল সারাদিন উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে চট্টগ্রামবাসী।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন : পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে জেলা প্রশাসন বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল-সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পূর্বে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা, পদ্মা সেতু উদ্বোধন পরবর্তী জেলা শিল্পকলা-শিশু একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় নৃত্যসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট ও বর্ণিল আতশবাজি ডিসপ্লে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. বদিউল আলমের সঞ্চালনায় স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান। অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন, সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক নির্বাচন কমিশনার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোবারক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এম এ সালাম, র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক কর্নেল ইউসুফ, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট কবি আবুল মোমেন, চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান, মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমেদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার একেএম সরওয়ার কামাল দুলু, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মফিজুর রহমান, উইম্যান চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবিদা মুস্তফা প্রমূখ। সরকারের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এনজিও প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। আলোচনা শেষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রান্ত থেকে বেলুন উড়ানো হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বিশ্বের ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া বাঙালির আত্ম-প্রত্যায়ের, আত্ম-প্রকাশের, আত্ম-মর্যাদার, আত্ম-সক্ষমতার একটি চিরঞ্জীব মহাকাব্য। নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারায় বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে সম্মানিত। এদেশের মানুষের একটা ধারণা ছিল অন্যের অর্থায়ন ছাড়া কিছুই করতে পারব না। এই বদনাম ঘুচিয়ে আমরা এখন গৌরবের অংশীদার। সেই গৌরব ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে চট্টগ্রামও। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে নানা আয়োজনের পাশাপাশি বড় পর্দায় মানুষকে দেখানোর ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন।
শুধু জিমনেসিয়ামে নয়-নগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে বড় পর্দায় উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রশাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখানোর ব্যবস্থা করেছে বেশ কয়েকটি স্থানে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে সরকারি সব ভবনে ঝলমলে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। এদিকে স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে শুরু হয় কনসার্ট। বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যান্ড আর্টসেল, জনপ্রিয় ব্যান্ড দল তীরন্দাজ, নাটাই, সাসটেইন, খ্যাতনামা শিল্পী বৃষ্টি মির্জা ও প্রমি কনসার্টে অংশ নেন। কনসার্টে উপস্থাপনায় ছিলেন আঁখি মজুমদার। কনসার্ট শেষে বর্ণিল আতশবাজি ডিসপ্লে করা হয়।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান গতকাল শনিবার সকালে এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন স্পটে সরাসরি স¤প্রচারের ব্যবস্থা করে। আনন্দঘন মুহ‚র্তটিকে প্রাণবন্ত করতে নগরীর কাজির দেউড়িতে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন হলে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়েছে। আজ আমরা সাহসে উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত। দেশি-বিদেশি নানা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করে বাঙালির আত্মমর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন। জাতির পিতার বাঙালিত্বের অহংবোধ ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদাবোধের তেজ শেখ হাসিনার মধ্যে থাকায় তিনিও আন্তর্জাতিক চাপগুলো রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় উড়িয়ে দিয়েছেন। আজ থেকে বাঙালি জাতি এবং শেখ হাসিনা এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হলেন। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী নেতা এবং চসিকের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ : ‘আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু’ স্লোগানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে বর্ণিল শোভাযাত্রা বের হয়। গতকার শনিবার আয়োজিত শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন সিএমপি কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উদ্যোগে নগরীর হালিশহর পুলিশ লাইন থেকে শোভাযাত্রাটি বের হয়। এছাড়া জেলার বিভিন্ন থানা থেকে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে থানায় সেবা নিতে আসা নাগরিকদের মিষ্টিমুখ করাচ্ছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপির ১৬ থানা ও থানার আশপাশের মানুষদের মধ্যে একযোগে দিনব্যাপী এই মিষ্টি বিতরণ করা হয়। গতকাল শনিবার নগরীর বিভিন্ন থানাতে ঘুরে এমন দৃশ্যের দেখা মেলে।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ কমিশনার (জনসংযোগ) শাহাদাত হুসেন রাসেল বলেন, পদ্মা সেতু বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের জন্য আত্মগৌরব ও অহংকারের প্রতীক। জাতির এই গৌরবময় প্রাপ্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে নগরবাসীর মধ্যে মিষ্টি বিতরণ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। নগরের সকল থানায় আগত সেবাপ্রার্থীদের পাশাপাশি থানা এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের মধ্যে একযোগে চলছে এই মিষ্টি বিতরণ কার্যক্রম। এদিকে পদ্মা সেতু নিয়ে নাগরিকদের পাশাপাশি নগরের পুলিশ কর্মকর্তাদের উচ্ছ¡াসও ছিল চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে পদ্মার ওপাড়ে বাড়ি এমন পুলিশ সদস্যরা বলছেন, পদ্মা সেতু হওয়ার আগে ছুটিছাটা উপভোগে তাদের যেসব বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হতো তার অবসান হবে এবার। পাশাপাশি পদ্মার ওপাড়ের জেলাগুলোতে উন্নয়নের ছোয়া লাগবে। এমনকি এই সেতুকে কেন্দ্র করে ঝিমিয়ে পড়া দক্ষিণবঙ্গের শিল্প কারখানাগুলোও সচল হবে এমন আশাবাদের কথাও জানান কোন কোন পুলিশ কর্মকর্তা।

মহানগর আওয়ামী লীগ : চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নগরীর ৮টি পয়েন্টে বড় পর্দায় পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা করে। হাজার হাজার মানুষ এসব পয়েন্টে উপস্থিত হয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে শামিল হয়েছে। নগরীর নিউমার্কেট মোড়, আগ্রাবাদ মোড়, বহদ্দারহাট মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, আন্দরকিল্লা মোড়, জামালখান, পুরাতন রেলস্টেশন ও বড়পুল মোড়ে বড় পর্দায় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সরাসরি দেখানো হয়। বিকেলে আওয়ামী লীগ এ উপলক্ষে সমাবেশ করেছে।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ : স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়। গতকাল শনিবার আন্দরকিল্লাস্থ সংগঠন কার্যালয়ে এ দোয়া ও খতমে কোরআন মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, আইনবিষয়ক সম্পাদক এড. মির্জা কছির উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রদীপ দাশ, মোছলেহ উদ্দিন মনসুর, দপ্তর সম্পাদক আবু জাফর, শিক্ষা সম্পাদক বোরহান উদ্দিন এমরান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন, স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা. তিমির বরণ চৌধুরী, ধর্ম সম্পাদক আবদুল হান্নান চৌধুরী মঞ্জু, সদস্য নাছির আহমদ, এ কে আজাদ, দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের, দক্ষিণ জেলা কৃষকলীগ সভাপতি আতিকুর রহমান চৌধুরী, সুরেশ দাশ, নুরুল হুদা, মো. এনাম, নুরুল আবছার চৌধুরী, এড. আবদুল হান্নান, শাহনেওয়াজ চৌধুরী, সেলিম হোসেন, এড. নুরুল আমিন প্রমুখ। খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিল পরিচালনা করেন হাফেজ মৌলানা ফজলুল কাদের।

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ: পদ্মাসেতু উদ্বোধন উপলক্ষে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সকাল ১০টায় দলীয় কার্যালয় দোস্ত বিল্ডিং চত্বর থেকে এক বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। একইভাবে ৭ উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়।