পদ্মাসেতু বাঙালির আত্মবিশ্বাসের ভিতকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে

6

প্রফেসর ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া

একটি ভালো কাজ করে যখন একজন মানুষ অপার আনন্দ অনুভব করে তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথা শেখ হাসিনার সরকার দেশের জন্য পদ্মা সেতুর মতো একটি ভালো কাজ সম্পন্ন করে নিশ্চয়ই অপার আনন্দ অনুভব করছেন। আমি দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে তার চেয়েও বেশী আনন্দ অনুভব করছি পদ্মা সেতুর জন্য, যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসের কারণেই এই সফলতা। তাই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই পদ্মাসেতু বাঙালির আত্মবিশ্বাসের ভিতকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়ে সুদৃঢ় করেছে। বাঙালি আর পিছিয়ে যাবে না, বীরদর্পে এগিয়ে যাবে। আত্মবিশ্বাস মানুষকে আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধে প্রচন্ডভাবে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মবিশ্বাস হচ্ছে মূলতঃ ইচ্ছাশক্তি বা Willforce। মানুষআত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়েই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হয়। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সততা ও আন্তরিকতা থাকলে যে কেউ তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেন এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু আমরা বাংলাদেশের নাগরিক এবং বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি, বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসি সেহেতু এখানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারটা মূলত প্রতিনিয়ত আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনী যতটুকু পড়েছি তা থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছি বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী একজন বিশ্ব নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতাকে অতীব শ্রদ্ধা করতেন এবং পিতার উপদেশ প্রতিনিয়ত মেনে চলতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন ‘আমি আমার পিতার উপদেশ চিরজীবন মেনে চলেছি,সেই উপদেশের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। পিতা শেখ লুৎফুর রহমান পুত্রকে বলছেন রাজনীতি করো ভালো কথা কিন্তু একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, সেটি হচ্ছে, ‘Honesty of Purpose and Sincerity of Purpose. অর্থাৎ উদ্দেশ্য অর্জনে সততা ও আন্তরিকতা থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা স্বাধীন বাংলাদেশ। পাকিস্তান না ভাঙ্গার জন্য বঙ্গবন্ধুর নিকট বহু গোপন প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতই সৎ ও আন্তরিক ছিলেন যে বঙ্গবন্ধু প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের উপর নির্ভর করে তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। কোন লোভ তাঁকে টলাতে পারেনি। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নির্লোভী একজন মহান নেতার পক্ষেই দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে গিয়েছেন। শুধুমাত্র বাঙালি জাতিকে বিশ্ব দরবারে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ও আত্মসম্মানবোধে উদ্বুদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্টিত করার জন্যই ছিল তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর সততা ও আন্তরিকতার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। নতুন প্রজন্ম যদি বঙ্গবন্ধুর আত্মবিশ্বাস, সততা ও আন্তরিকতার আদর্শকে নিজেদের জীবনে গ্রহন করতে পারে তাহলে অবশ্যই আমরা সোনার বাংলা গঠনে সক্ষম হবো।
বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়ার পদক্ষেপ নিতেই বিশ্বাসঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুর নির্মমভাবে হত্যা করে আমাদের স্বপ্নকে ধুলিস্মাৎ করে দেয়। সেই ভঙ্গুর দেশকে গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মতো আত্মবিশ্বাসী হয়ে সততা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, দেশের উন্নয়ন দেখলে সেটি প্রত্যেকের কাছেই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে। নিন্দুকেরা অবশ্য অনেক কিছু বলে কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেতারা ভালো কাজে কখনো থেমে থাকে না, এগিয়ে যায় আরো তীব্র গতিতে। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন পদ্মা সেতু প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ বাঙালিরা পারে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা পারে। আমরা বিশ্বে বহু আত্মবিশ্বাসী নেতাদের দেখি যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিডেল ক্যাস্ট্রো, মাও সেতুং, ইন্দিরা গান্ধী-সহ আরো অনেককে। তাঁরাই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছেন। ঐ সব আত্মবিশ্বাসী নেতাদের অবদান কেউই অস্বীকার করতে পারবে না।
প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই পদ্মা সেতু নির্মাণ আমাদের বাংলাদেশের জন্য নূতন অর্থনৈতিক দিগন্ত খুলে দেবে এতে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। আত্মবিশ^াসের সাথে দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার একটা গভীর নৈকট্য বিদ্যমান। দেশের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের দু’একটা লাইন আমার নিকট বারবার অনুরণিত হয়। বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থেকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্’।এটা শুনলে আমার মতো শরীরের রক্ত অনেকের টগবগ করে উঠে। এই লাইনগুলো বারবার শুনি। যতো শুনি ততোই মনের উৎসাহ বেড়ে যায়। বাঙালির মেধা আছে, বুদ্ধি আছে, সাহস আছে, ইচ্ছে করলে সম্মিলিতভাবে আমরা এই দেশকে স্বল্পতম সময়ে সোনার বাংলায় উন্নীত করতে পারি। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ, এখানে শত-শত সেতুর প্রয়োজন। নাব্যতা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে সেতু তৈরী করতে হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় মানুষ উপকৃত হবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। একসময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসতে কি কষ্ট হতো। আর এখন বাসে, ট্রেনে, প্লেনে উঠলাম আর পৌঁছে গেলাম। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক ট্রেন হলে আরো সময় কম লাগবে। দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনদুম, ঢাকা-পদ্মা-ভাঙ্গা-বরিশাল-পায়রা বন্দর, যমুনায় আলাদা রেললাইন, খুলনা-মংলারেললাইনের কাজ যত দ্রæত সম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
আত্মবিশ্বাস এর আরেকটি উদাহরণ দেয়া প্রয়োজন অনুভব করছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার প্রাক্কালে ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে সরকারী চাকুরীর মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দেয়ার জন্য গ্রামে চলে যাই। সেখানে ২৭শে মার্চ ১৯৭১ এর সকালে ই.পি.আর. বাহিনীকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার জন্য ‘আবুরখীল মুক্তিযোদ্ধা সহায়ক সমিতি’ গঠন করি। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে গ্রামের প্রায় ৩৫ জন যুবককে সঙ্গে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। তার আগে পার্শ¦বর্তী মগদাই গ্রামে রাজাকারকের সঙ্গে একটি প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। এতে আমাদের পক্ষের একজন যোদ্ধা নিহত হয়। তাই উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ভারত গমন। সেই নদী-পাহাড়-বনজঙ্গল পেরিয়ে পায়ে হেঁটে আবুরখীল থেকে রামগড় হয়ে সাব্রæম পৌঁছি। গণ পরিষদ সদস্য অধ্যাপক খালেদ সাহেবের দেখা পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। পরে আরো বৃহৎ পরিসরে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য আমি কোলকাতা যাই। সেখানে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. শামসুল হক, প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান-সহ বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। একদিন সাব্যস্ত করলাম থিয়েটার রোডে প্রবাসী সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করবো। তারিখ ঠিক হবার পর নির্দিষ্ট সময়ে দেখার জন্য থিয়েটার রোডের অফিসে যাই। জননেতা তাজউদ্দিন সাহেব একটা সাদাসিধে সার্ট গায়ে পড়ে বসলেন। দুই পাশে ছিলেন তখনকার দিনের চার খলিফা। তাঁরা হলেন আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী। অনেক কথার পর দৃঢ়কণ্ঠে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেব আমাকে বল্লেন, প্রফেসর সাহেব, চিন্তা করবেন না, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ চালিয়ে যান, আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই আমরা দেশে ফিরে যাবো। সত্যিই অবাক হলাম, ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ বিজয় অর্জন করে দেশ স্বাধীন হলো। তাজউদ্দিন সাহেবের সেই আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো আমার বারবার মনে পড়ে। এই ধরণের আত্মবিশ্বাসী নেতার জন্যই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।
অবশ্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে আবার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। রাজনীতিবিদদের জনগণের উপর ভরসা করা উচিত। তারজন্য জনগণের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আত্মবিশ্বাসী হওয়া তখনই সম্ভব যখন দেখা যায় জনগণ তাঁর পক্ষে আছেন। দেশের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী শেখ হাসিনা তথা শেখ হাসিনার সরকারের উপর আস্থাশীল। কথায় আছে, Uneasy lies the head that wears the crown। আমার ধারণা জননেত্রী এটি সবসময় মনে রাখেন। এখনো দেশে দরিদ্র লোকের সংখ্যা অনেক বেশী। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তিনি শোষিতের পক্ষে। শেখ হাসিনার সরকারও দরিদ্র জনগণের পক্ষে হবেন ইহাই স্বাভাবিক। সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোমধ্যে বহু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, প্রতিবন্ধি ভাতা, বৃত্তি, উপবৃত্তিসহ বহু ভালো পদক্ষেপ। আমরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চাই। অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের গ্যারিন্টি চাই।
আমাদের দেশের কিছু কিছু রাজনীতিবিদসহ কিছু অসৎ ব্যবসায়ী, কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল সমস্যা হলো ‘অতিলোভ’। মানুষের লোভ থাকবেই। কিন্তু অতিলোভের কারণে আমরা যেমন নিজেদেরকে ধ্বংস করছি তেমনি দেশকেও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এতে দেশের ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনে অপপ্রয়াসে তারা লিপ্ত। ত্যাগের মধ্যে যে নির্মল শান্তি, প্রশান্তি বিরাজমান সেটি আমরা অনেক সময় জেনেও না জানার ভান করি। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে প্রবাদ আছে, ‘সন্তুষ্টি পরম ধন’। অর্থাৎ সন্তুষ্ট থাকাটাই পরম ধন। যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাটা বেশ কঠিন হলেও মানসিক প্রশান্তি এখানে আছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্ম বিশ্বাস আছে। কোন ধর্মই অপরের ক্ষতি করতে বলেনি। অতিলোভে যে অপরের ক্ষতি হয় সেটি ধর্মবিশ্বাসী লোকদের সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। আগেই বলেছি যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিলোভও প্রভ‚ত ক্ষতিকর। আমি মনে করি আমরা সবকিছুতে স্বাভাবিক আচরণ করবো, অস্বাভাবিক কিছু করা বা ভাবনার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনটাই ছিল ত্যাগের। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে অস্বাভাবিক কোন কিছুই ছিল না। কারন লক্ষ্য ছিল সুদৃঢ়, স্থির। রাতারাতি এই দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করা যাবে না। ধাপে-ধাপে, পরিকল্পিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ে তুলি। জয়তু পদ্মা সেতু, জয়তু শেখ হাসিনা।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান
একুশে পদকপ্রাপ্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা।