পতেঙ্গা সৈকতের ইজারা নিয়ে যত কথা

47

এম এ হোসাইন

রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে পতেঙ্গা সৈকতের একটি অংশ ইজারা দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নগরীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রটি ইজারা দিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মতিও পেয়েছে সিডিএ। সমুদ্র সৈকত এলাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়ার সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সমুদ্র সৈকত এলাকাকে বেসরকারি অপারেটরের হাতে তুলে দিলে সৈকত এলাকার উন্নয়ন হবে, বিনোদন সুবিধা ও নিরাপত্তা বাড়বে একটি পক্ষ এমনটা যুক্তি দেখালেও নগরবাসী উন্মুক্ত বিনোদনের জায়গা ইজারা দিলে নি¤œবিত্তের বিনোদনের কোন সুবিধা অবশিষ্ট থাকবে না বলে মনে করছেন অন্য পক্ষ।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিডিএ’র বোর্ড সদস্য স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, পতেঙ্গা হচ্ছে নগরীর মধ্যে উন্মুক্ত বিনোদনের একমাত্র জায়গা। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা অর্থাৎ, টয়লেট, চেঞ্জিং রুম এবং পার্কিংয়ের জায়গা নেই। এছাড়া, চারিদিকে প্রচুর ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি। এই পতেঙ্গা বিচকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য সিডিএ’র কোনো ফান্ড নেই। এমন কি সেখানে যে সড়কবাতি আছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ বিল দেয়ার জন্যও সিডিএ’র কোনো ফান্ড নেই। শহরের এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অযতেœ-অবহেলায় পড়ে আছে। মানুষ এটা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।
তিনি বলেন, পতেঙ্গায় এখন দেশি পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও আসছেন। সবার সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সিডিএ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পতেঙ্গার কিছু জায়গা আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করবে। সেখানে প্রায় শত কোটি টাকার বিনিয়োগ আশা করছে সিডিএ। যে বা যাদের কাছে এটা লিজ দেয়া হবে, তাদের এটার রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাসহ সবকিছুর দায়িত্ব দেয়া হবে। যারা এখানে বিনিয়োগ করবে, তারা অবশ্যই লাভের আশায় বিনিয়োগ করবে। লাভের একটি অংশও সিডিএ পাবে। প্রকল্পটি মূল সমুদ্র সৈকত অংশে হবে না। আর এটার জন্য যে সমুদ্র সৈকত বন্ধ করে দেয়া হবে, বিষয়টি এরকম না। আউটার রিং রোড অংশ এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এক কিলোমিটারের মত অংশে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
পতেঙ্গা বিচ ইজারা দেয়ার ব্যাপারে সিডিএ’র সিদ্ধান্ত দ্রæত বাতিলের দাবি জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, সরকারি জায়গা সিডিএ চাইলেই বেসরকারি অপারেটরের হাতে তুলে দিতে পারে না। পুরো পতেঙ্গা এলাকা সিডিএ’র সম্পত্তি না। পতেঙ্গা হচ্ছে নগরবাসীর একমাত্র উন্মুক্ত বিনোদনের জায়গা। নগরবাসী স্বস্তির আশায় দূর-দূরান্ত থেকে সপ্তাহে ছুটির দিন কিংবা যে কোন উৎসব পার্বনের সময়ে বা সরকারি বন্ধের দিনে ছুটে আসে পতেঙ্গা বিচে।
বলা হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকার সাথে ইপিজেডের সাগরপাড় এলাকা যুক্ত করে উন্নয়ন করা হবে। পুরো এলাকাটিকে দু’টি জোনে ভাগ করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় করা হবে। সৈকতের কিছু অংশ উন্মুক্ত রেখে বাকি অংশ ইজারা দেয়া হবে। ফলে নির্ধারিত প্রবেশমূল্য দিয়ে পর্যটকদের সমুদ্র সৈকতে প্রবেশ করতে হবে।
এদিকে সৈকত ইজারা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ডা. শেখ শফিউল আজম, মহাসচিব এইচএম মুজিবুল হক এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের বৃহত্তম বন্দরনগরী হওয়া সত্তে¡ও এখানে বিনোদনের জন্য উল্লেখযোগ্য কোন জায়গা নেই। তাই চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড দেখতেও বিনোদন পিপাসুরা সে স্থানে ছুটে যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, উন্মুক্ত বিনোদন স্পটে ফি নির্ধারণ করলে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিনোদন পিপাসুরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
ইজারা দেয়ার বিপক্ষে স্থানীয় ক্ষুদ্র দোকানী, ভাসমান ব্যবসায়ীরাও। তারা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, বিচের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের পুনর্বাসন না করে আবার পতেঙ্গা বিচ এলাকাকে ইজারা বা প্রবেশে গেট ফি নির্ধারণ করলে ক্ষুদ্র দোকানীরা চরমভাবে আর্থিক কষ্টে পড়বেন। বিচ দোকান মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক মো. ওয়াহিদুল আলম মাস্টার বলেন, পতেঙ্গা বিচকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেআইনি-অমানিবক। আমরা সমিতির সদস্যরা এই বে-আইনি, একতরফা ও অমানবিক সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না।
তিনি আরো বলেন, এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা জীবন-সংগ্রাম করে, প্রকৃতির সাথে লড়াই করে পতেঙ্গা বিচকে সৌন্দর্যমÐিত করতে সহায়তা করার পরে কোন এক অদৃশ্য কালো থাবায় তা উচ্ছেদ হোক কেউ কি তা মানতে পারবে?