“পটিয়ারত্ন”

120

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

পটিয়াকে এক সময় মানুষ চিনতো ডা. অন্নদা খাস্তগীর, ষষ্ঠীবৈদ্য, যাত্রামোহন সেন, দেশপ্রিয় জেএম সেনগুপ্ত, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, সাহিত্য বিশারদ, শরচ্চন্দ্র দাশ প্রমুখ মনীষীর নামে। সেদিন হয়েছে বাসি। এখন পটিয়াকে চেনে মানুষ এস আলম, কেডিএস, টিকে’র নামে। যদিও এখনো পটিয়ার পরিচয় জ্ঞাপনের মতো বিদ্বান, জ্ঞানী, গুণী মানুষ-যেমন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম, সিএসপি এ জেড এম নাসিরউদ্দিন, দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউস, সাবেক সচিব ও স্বাস্থ্য দপ্তরের মহাপরিচালক ড. কে.এম ফরিদ উদ্দিন, পটিয়ার এক একটি উজ্জ্বল রতœস্বরূপÑ এসব মানুষই তো যথেষ্ট পরিচয়ের জন্য। তথাপি যেহেতু এটা যুগপৎ বাণিজ্য এবং বিজ্ঞাপনের যুগ, অতএব এস আলম, কেডিএস এবং টিকেরই জয়।
এমনভাবে তিনটি নামের ব্রান্ডিং হয়ে গেছে যে, এস আলমের মালিক মাসুদ সাহেবের চেয়ে মানুষ এস আলমকে বেশি চেনে। অনুরূপভাবে খলিল সাহেবের চেয়ে কেডিএস এবং কালাম সাহেবের চেয়ে টিকে-কে বেশি চেনে। সাইফুল আলম মাসুদ, তিন শব্দের নাম, কিন্তু দুটি শব্দের মধ্যে মাসুদ সাহেব আটকা পড়ে গেছেন। খলিলুর রহমান, তাঁর স্ত্রী দিলুয়ারা বেগম এবং পুত্র সেলিম রহমানের নামের প্রথম তিনটি শব্দ নিয়ে কেডিএস শব্দ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু মানুষের কাছে কেডিএস-এর এমন জাদুকারী প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে, যে খলিল, দিলুয়ারা, সেলিম নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, কেডিএসই সই।
আবু তৈয়ব ও আবুল কালাম-দু’ভাইয়ের নামের শেষ শব্দের আদ্যক্ষর নিয়ে টিকে’র সৃষ্টি। কিন্তু টিকে এত জনপ্রিয় যে, তৈয়ব-কালামের খোঁজ রাখার প্রয়োজন কেউ মনে করে না।
তিনজনের মধ্যে বেশ বড় একটা মিল দেখতে পাচ্ছি। সেটা হচ্ছে তাঁরা তাদের জন্মস্থান পটিয়াকে প্রচÐভাবে ভালোবাসেন। পটিয়া-মাতার প্রতি তাঁরা যে ঋণের বন্ধনে বাঁধা পড়ে আছেন তাঁরা জানেন সে ঋণ অচ্ছেদ্য ও অপরিশোধ্য। ঋণ শোধ করতে না পারলেও স্বীকার করতে তো দোষ নেই। সুতরাং মাতৃস্তন্য পানের ঋণ স্বীকারের জন্য তাঁরা তাঁদের অর্জিত ধন সম্পদ পটিয়ায় উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন। এস আলম দিয়েছেন মিল-কারখানা, চাকরি-বাকরি, কেডিএস দিয়েছেন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, টিকেও স্কুল কলেজের জন্য অনেক টাকা-পয়সা দিয়েছেন। আর দান-খয়রাত, যাকাত, ফিতরা, তিনজনেই ম্ক্তু হস্তে দিয়ে যাচ্ছেন। একবার তো দেশে হাঁড় কাপানো শীত পড়লে টিকে গ্রæপ পরিচয় গোপন করে শহরময় ঘুরে ঘুরে রাস্তা, ফুটপাত, বস্তি, বাস স্ট্যান্ড, রেল স্টেশনে শীতের কামরে জীবন্মৃত বা অর্ধমৃত হয়ে পড়ে থাকা বস্তিবাসী, ছিন্নমূল, ফকির, ভিখারী, কুলি কামিনের গায়ের ওপর কম্বল বিছিয়ে দিয়ে এক বিশাল মহৎ মানবিক কর্মযজ্ঞ সাধন করেছিলেন। টিকে গ্রæপের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আবু তৈয়ব স্বয়ং সারারাত শীতে কেঁপে কেঁপে কম্বল বিলি করেছিলেন। আহা সেই ভালো মানুষটি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। বহুদিন হলো তিনি তাঁর প্রভুর কাছে চলে গেছেন। টিকের বেশ ভারি কল-কারখানা, তাতেও পটিয়ার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
কেডিএস চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান পটিয়ার আলোকিত বাতিঘর। তিনি একদিকে পশ্চিম পটিয়া, অন্যদিকে মধ্য পটিয়ায় একটির পর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ঘরে ঘরে সন্ধ্যা হলে যেখানে সাঁঝ বাতি জ্বলে সেখানে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিম পটিয়ায় কলেজ ছিলো না, সেখানে তিনি কলেজ করে দিয়েছেন; পটিয়ায় নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য তিনি প্রথমে স্কুল, পরে কলেজও করে দিয়েছেন। কোন একক ব্যক্তির পক্ষে শিক্ষার জন্য এত রকম আয়োজন, প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম সম্পাদন সম্ভব কিনা আমি মাঝে মাঝে ভাবতে বসে বিমূঢ় হয়ে যাই। এই হারকিউলিয়ান টাস্ক তিনি কি করে সম্পন্ন করলেন ভেবে কুলকিনারা করতে পারি না। আল্লাহ খলিল সাহেবকে কী অসীম ক্ষমতা, মানবতাবোধ, বিদ্যানুরাগ দিয়ে তৈরি করেছেন। খলিল সাহেব যে কাজ করেছেন, তা’ একমাত্র সরকারের পক্ষেই করা সম্ভব।
খলিল সাহেব নীরব দানবীর। আমাদের দেশে বিভিন্ন উপলক্ষে দান-খয়রাত করার রেওয়াজ আছে। শুক্রবার মসজিদ, দরগায়, শবেরবরাত, শবে কদর, ঈদ, মহররম-এ গরিব, মিসকিন, ভিখারি, দীন, দুঃখীকে টাকা-পয়সা দিয়ে অনেকে সাহায্য করেন। খলিল সাহেব তা নয়, তিনি প্রতিদিন দান করেন। রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামলে দান করেন, অফিসে বসে বসে দনা করেন, হাঁটতে হাঁটতে দান করেন, উপলক্ষের দান তো আছেই। তাই তাঁর দানের কোন পরিমাপ করা যাবে না। এখন তো প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে পুরাতন বাড়ি থেকে সরে এসে বড় একটি বাড়ি করেছেন। সেই বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন। সকালে অন্তত ৩০/৪০ জন খাড়া প্রতিবেশি নিয়ে সকালের চা নাস্তা সারেন। নতুন বাড়িতে পুকুর আছে, বাগান আছে। বাগানের শাক-সব্জি এবং পুকুর থেকে ধরা মাছ দিয়ে অন্তত শ’খানেক মানুষকে ভুরিভোজ করাবেন। তবে প্রায় সব সময় গরু জবাই করে অনেক লোককে নিয়ে খেতে তৃপ্তি বোধ করেন তিনি। শুক্রবার দিনটা শুধু দান-খয়রাত করে কাটান।
সুবেহ সাদেকের পর প্রকৃতি ফর্সা হতে থাকে এবং এক সময় নবরবির উদয়ে প্রভাতকিরণে যখন দিগ্বলয় ঝলমল করে ওঠে, তেমনি একদা পটিয়ার অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি প্রদেশ থেকে উদিত হয়ে যিনি নব রবিকিরণে শুধু পটিয়া নয়, চট্টগ্রামকেও আলোকিত করে তোলেন, তিনি আমাদের খলিলুর রহমান। তাঁকে নিয়েই তো অধুনা চট্টগ্রাম স্তুতিমুখর। খলিলুর রহমান আল্লাহর নেকবান্দা, অফিসের মধ্যেই তসবিহ, জায়নামাজ, অজিফা, কোরান মজুদ। যত গুরত্বপূর্ণ কাজ, এমনকি বোর্ড মিটিংয়েও যদি ব্যস্ত থাকেন, বারবার ঘড়ির দিকে নজর, সময় হলে সব ফেলে জায়নামাজ নিয়ে নামাজে দাঁড়িযে যান। প্রতি বছরই রুটিন করে মূল হজ, ওমরা হজ করেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ কিংবা কেউ টাকা পয়সার জন্য নিয়ত করেও হজে যেতে পারছেন না শুনলে তিনি তাদেরও খরচাপাতি দিয়ে হজ করতে নিয়ে যান। খলিল সাহেব দানে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাঁকে দানবীর বললেও অত্যুক্তি হয় না।
তিন নম্বরে যাঁর কথা বলছি, তাঁকে আমি এক নম্বরেই স্থান দিতে চাই। তিনি আমাদের সাইফুল আলম মাসুদ, যাঁকে সবাই এস আলম নামে চেনে। মাসুদ ভাইও ধার্মিক, বায়তুশ শরফের মুরিদ। হজ-রোজা-যাকাত তাঁর জন্য অবশ্য পালনীয় কর্ম। নামাজ পড়তে পড়তে মাসুদের কপালে কালো দাগ পড়ে গেছে। অত্যন্ত নামাজি যাঁরা তাঁদের কপালে আমি কালশিরা পড়তে দেখেছি। কিছুটা টাকের লক্ষণ থাকায় তাঁর কপালের দাগটা চোখে পড়ে বেশি। তবে তাতে মাসুদ ভাইকে আরো সুন্দর দেখায়। তিনি যখন হাসেন, তখন তাঁর চেহারা থেকে নুরানী ঝলক বের হয, মাসুদ সাহেব যখন আকর্ণবিস্তৃত ভুবনমোহিনী হাসি দেন, তখন চেহারা এত খোলতাই হয় যে, একটা রাজসিক ভাব চলে আসে।
শিল্পপতি হিসেবে মাসুদ ভাইয়ের উত্থান ঢাকডোল পিটিয়ে হয় নি। খুব ধীরে নীরবে অর্থের ভুবনে বিচরণ শুরু হয় তাঁর। মাসুদ ভাই অঢেল ধন সম্পদের মালিক, ডজন ডজন শিল্প-কারখানার মালিক তিনি; পশ্চিম পটিয়ার মইজ্যার টেকে এস আলমের নামের কত যে শিল্প আমি গুণে শেষ করতে পারি না। সে এলাকার নাম এস আলম শিল্পনগরই রাখা যেত। খুব ধীরে, প্রায় নিঃশব্দে তিনি অর্থের ভুবনে বিচরণ শুরু করেন যে, তাঁর পদচারণা থেকে প্রায় কোন শব্দই উৎপন্ন হয়নি। আল্লাহ যখন মুখ তুলে চেয়েছেন, মাসুদ ভাইয়ের হাতে কিছু টাকা-পয়সা আসতে থাকলো; কিন্তু সেজন্য তাঁর মনে কোন অহংকার নেই। অনেকের নাকি টাকা-পয়সার গরমে মাটিতে পা পড়ে না, কিন্তু মাসুদ ভাই মাটির মানুষ, নরম তুলতুলে তাঁর ব্যবহার। কাউকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেন না, মাথা গরম করেন না, মুখের হাসিটা ধরে রেখে শান্ত ভাবে ধীর স্থির হয়ে কথা বলেন, ধৈর্য ধরে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে দেন। ফলে তাঁর কোন শত্রæ হয় না। অজাতশত্রæ সাইফুল আলম মাসুদ।
মানুষকে বশ করার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহর তাঁকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। মধ্যবিত্ত অবস্থান থেকে উচ্চবিত্ত অবস্থানে উপনীত হওয়ার সময় সবার মন জয় করে চলতে হয়েছে তাঁকে। কাউকে শত্রæভাবাপন্ন মনে হলে তাঁর সঙ্গে গায়ে পড়ে যেচে কথা বলে শত্রæতার অবসান ঘটিয়ে ফেলতেন। অকারণেও মানুষ শত্রæতা করতে চায়, কেউ হিংসা করে, ঈর্ষায় জর্জরিত হয়ে যায় কেউ কেউ; এইসব মানুষেরও মন জয় করে তাঁর অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন মাসুদ ভাই।
মাসুদ ভাইয়ের পিতা-মাতার নাম মোজাহেরুল আনোয়ার ও চেমন আরা বেগম। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। ব্যাংকের প্রতি মাসুদ ভাইয়ের দুর্বলতা সম্ভবত পিতার কাছ থেকেই পাওয়া। নইলে তিনি একে একে ৬টি ব্যাংকের মালিক বা বৃহৎ শেয়ার হোল্ডার হতে যাবেন কেন ?
৭ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে মাসুদ ভাই ৪র্থ। রামের ভাই লক্ষণের মত তাঁর খুব অনুগত এক ছোট ভাই আছেন, তাঁর নাম আবদুস সামাদ লাবু। আমি তাঁকে খুব ভালোবাসি। ইঞ্জিনিয়ার শহীদ সম্ভবত বড় ভাই, প্রয়াত মোর্শেদ আলমের ছোট। শহীদও আমার খুব পছন্দের মানুষ।
হাইলধরের জমিদার নুরুজ্জামান চৌধুরী মাসুদ ভাইয়ের মাতামহ। শিল্পপতি বশিরুজ্জামান চৌধুরী ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী তাঁর মামা। তাঁর সবচেয়ে ছোট মামা বশরুজ্জামান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বর্তমান ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাভেদ তাঁর মামাত ভাই।
আল্লাহ যাঁকে প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, স্কুল-কলেজের ক্লাস তাঁকে আকর্ষণ করে নি। ফলে মাসুদ ভাইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে নি। এইচএসসি পাস করার পরই প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটান তিনি। আল্লাহ তাঁকে বাণিজ্য প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রতিভাই তাঁকে বাণিজ্যের পথে ধাবিত করে। খাতুনগঞ্জে টিনের এজেন্সি নিয়ে ব্যবসার জগতে পদার্পণ করেন। তাতেই সফল, পরে পরিবহন ব্যবসায় হাত দেন। সেই ব্যবসাই কপাল খুলে গেল তাঁর, যেন জ্যাকপট মেরে দিয়েছেন মাসুদ ভাই। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সারাদেশে সড়ক, মহাসড়ক ধরে ছুটছে এস আলম বাস। সব যে তাঁর তা নয়। কিন্তু এস আলম নাম এমন পয়মন্ত যে সে নামের জন্য অনেক বাস ব্যবসায়ী নিজ নিজ বাস এস আলম বাসের বহরে অন্তর্ভুক্ত করে স্বস্তি বোধ করেন।
মাসুদ ভাই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান করেন সিমেন্ট, ভেজিটেবল অয়েল, স্টীল, সি আর কয়েল, চিনি পরিশোধনাগার ইত্যাদি ফ্যাক্টরি। বর্তমানে এস আলম শিল্পগোষ্ঠীর অধীনে ৩৭টি ইউনিট আছে। এসব ইউনিটের নাম এখানে সম্ভবত উল্লেখ করা যেতে পারেÑ
এস আলম স্টিল, এস আলম ভেজিটেবল, এস আলম সয়াসিড এক্সট্র্যাকশন প্ল্যান্ট লি., এস আলম সুপার এডবিন অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড চিনি শিল্প লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি. (ইউনিট-২), এস আলম ট্যাঙ্ক টার্মিনাল লি., এস আলম সিমেন্ট লি., পোর্টম্যান সিমেন্টস লি.,এস আলম স্টিলস লি., এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লি., এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লি. (এনওএফ), গ্যালকো স্টিল (বিডি) লি., গ্যালকো স্টিল (বিডি) লি. (ইউনিট-২), কর্ণফুলী প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লি., শাহ আমানত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লি., এস আলম পাওয়ার প্লান্ট লি., এস আলম পাওয়ার প্লান্ট লি. (ইউনিট-২), এস আলম পাওয়ার জেনারেশন লি., এস আলম লাক্সারি চেয়ার কোচ সার্ভিসেস লি., বেরিং সি লাইন, এস আলম ব্যাগ ম্যানুফ্যাকচারিং মিলস লি., এস আলম প্রোপার্টি লি., হাসান আব্বাস (প্রা.) লি., মডার্ন প্রোপার্টিজ লি., ওশেন রিসর্টস লি., প্রসাদ প্যারাডাইজ লি., মেরিন এম্পায়ার লি., এস আলম হ্যাচারি লি., ফতেহাবাদ ফার্ম লি., এস আলম ব্রাদার্স লি., এস আলম ট্রেডিং কোং (প্রা.) লিমিটেড, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, সোনালী কার্গো লজিস্টিক্স (প্রা.) লি., সোনালী ট্রেডার্স, গেøাবাল ট্রেডিং কোম্পানি লি. ও এস আলম পাওয়ার ওয়ান লি.।
ব্যাংকিং খাত : ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবি গেøাবাল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক।
মিডিয়া খাত : একুশে টেলিভিমন, রংধনু মিডিয়া লিমিটেড
এস আলম একটি মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। সেটি হলোÑ ২০ হাজার কোটি টাকার টাকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প। বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে এটিই দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার গÐামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনায় চায়না সেবকো এইচটিজির সঙ্গে যৌথভাবে ৬০০ একক জমির ওপর ২০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এস আলম গ্রæপ। কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৭০ শতাংশের মালিকানা এস আলম গ্রæপ, ৩০ শতাংশের মালিকানা দুটি চিনা প্রতিষ্ঠানের।
এস আলম করপোরেট শিল্পগোষ্ঠী দেশের গÐি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। মাসুদ ভাই পটিয়ার জন্য অনন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানা সমূহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদনে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি জাতীয় রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। এস আলম গ্রæপ কমপক্ষে দেশের অর্ধডজন ব্যাংকের মালিক। দেশের ব্যাংকিং জগতকে সমৃদ্ধ করা ছাড়াও পটিয়ার হাজার হাজার বেকার যুবক, ছাত্র, শিক্ষিত মানুষ চাকরি পেয়েছেন এস আলম গ্রæপের ব্যাংক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে। কোন একক ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এত বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের নজির আর কোথাও আমি খুঁজে পাই নি। হিসেব করলে হয়তো দেখা যাবে, সমগ্র পটিয়ায় সরকারের চাইতেও বেসরকারি খাত অর্থাৎ এস আলম গ্রæপের কর্মচারীর সংখ্যাই বেশি হবে।
গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও তিনি বিপ্লব সাধন করেছেন। শত শত এস আলম বাস কোচ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাতায়াতের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
ভারতে সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব হচ্ছে “ভারতরতœ”। পটিয়া কোন রাষ্ট্র নয়, পটিয়া পৌরসভা কোন সরকারও নয়। তবু পটিয়া পৌরসভা মাসুদ সাহেব ও খলিল সাহেবকে “পটিয়ারতœ” উপাধি দিতে পারেন। তাতে এই দুই পটিয়াপ্রেমী, জনদরদী শিল্পপতির প্রতি পটিয়াবাসীর পক্ষ থেকে একটা সম্মান প্রদর্শন করা হবে। তাঁরা তো পটিয়াকে অনেক কিছু দিয়েছেন, কিন্তু কিছু পান নি। এখন পটিয়ার জনসাধারণের দায়িত্ব দুই শিল্পপতিকে যতোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা।
আর একটা কাজ করা যায় বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ধনী এবং শীর্ষ কর্পোরেট ক্রোড়পতি জনাব সাইফুল আলম মাসুদ ১৪ নম্বরের বাসিন্দা। সেখানে শামসু পেশকার, আবদুল আলিম দারোগা, ছৈয়দ আহমদ বিকম এবং আরো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব থাকেন। মাসুদ সাহেবের নামে এই এলাকাটির নাম “এস আলম নগর” নামকরণ করলে কেমন হয় ? যেমন ভারতে টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজী টাটার নামে আছে টাটানগর। মাসুদ সাহেব আমাদের গর্ব, তিনি হাজার হাজার মানুষের সংস্থান করেছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক, বিমা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে। এস আলম নগরের উন্নয়নে তিনি নিশ্চয়ই কিছু বিনিয়োগ করবেন। একইভাবে ১৩ নম্বরে কেডিএস চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের শিক্ষা কমপ্লেক্স আছে। সেটাকে যদি “খলিলুর রহমান বিদ্যানগরী” নামকরণ করা হয়, তাহলে তিনিও নিশ্চয়ই সেখানে বাড়তি বিনিয়োগ করবেন।
টিকে গ্রুপের কালাম সাহেব পরহেজগার মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কাজা করেন না, হজ্ব করেন, যাকাত দেন, গরীব-দুঃখীকে দান-খয়রাত দেন, কিন্তু কাউকে জানান দেন না। নরম মনের মাটির মানুষ কালাম সাহেবকে আল্লাহ শতায়ু দান করুন, যাতে তিনি দেশ ও দশের সেবায় নিজেকে আরো নিবিড়ভাবে নিয়োজিত করতে পারেন।
শেষকথা : টিকে’র কালাম সাহেবকে পটিয়া সমিতি থেকে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম বলে মুশতারী আপা আমার উপর রাগ করেছেন। কিন্তু যে কারণে তাঁর রাগ, আমি তার কোন প্রমাণ পাই নি। ফলে কালাম সাহেবকে নিয়ে আমি আবার লিখলাম। কিন্তু মুশতারী আপার কোন লেখায় তাঁর বাসায় চৌধুরী হারুন সাহেব অস্ত্র রেখেছিলেন বলে তাঁর স্বামী শহীদ ডা. শফি এবং ভাই শহীদ আহসানুল হক (নামটা শুদ্ধ হলো কিনা আমি বলতে পারছি না)-কে পাকিস্তানি বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে-এমন অনুযোগ তিনি করেছেন। শফি সাহেব কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি সহানুভুতিশীল ছিলেন। কমরেড শাহ আলম ভাইরা প্রগতি যোদ্ধা নামে যে বই বের করেছেন তাতে শফি সাহেবের ছবি আছে। সুতরাং হারুন সাহেব যদি আপার বাসায় অস্ত্র গুদামজাতও করে থাকেন, সেটা হয়তো দলীয় সম্পর্কের কারণেই করেছেন। এতে আমি হারুন সাহেবের কোন দোষ দেখতে পাচ্ছি না।
এস আলমের চেয়ারম্যান ও এমডি সাইফুল আলম মাসুদ কোন এক সময় আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ানের মাধ্যমে কোন এক হোটেলে আমার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তিনি এক বিষয়ে আমার সহযোগিতা চেয়েছিলেন, আমি অনেক বিষয়ে সহযোগিতা করেছি। এরপর মাসুদ ভাই আমাকে নিয়ে নাসিরাবাদ সোসাইটির ১নং গলিতে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু সাতকানিয়ার এক চেয়ারম্যানের বাসায় অনেকবার গেছেন। তাঁর মামা বাবু ভাই যখন ঢাকায় মামলায় হাজিরা দিতে কোর্টে আসতেন, তখনও মাসুদ ভাইয়ের সঙ্গে দু’একবার ঢাকায় আমার দেখা হয়েছে। এসব কথার হয়তো মাসুদ ভাইয়ের কাছে এখন কোন মানে নেই, তবু কলমের আগায় চলে আসলো বলে লিখে ফেললাম। আমার যদি ঘাট হয়ে থাকে, তাহলে মুশতারী আপা এবং মাসুদ ভাইয়ের কাছে আমি করজোড়ে মিনতি করছি আমাকে ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা