নৌ-শ্রমিকদের ধর্মঘট দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে

21

বেশ কয়েকবছর ধরে দেখা যাচ্ছে, দেশের নৌযান (পণ্যবাহী যান) শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কথায় কথায় ধর্মঘটের ডাক দিয়ে আমদানিকৃত বা এক বন্দর থেকে অন্যবন্দরে নিয়ে যাওয়া পণ্য খালাসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এতে পণ্যবাহী জাহাজ বা লাইটারাজ জাহাজের মালিক-শ্রমিকের তেমন কোন ক্ষতি না হলেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সূত্র জানায়, খোরাকি ভাতাসহ ১১ দফা দাবিতে নৌ শ্রমিক (পণ্যবাহী যান) ধর্মঘটে সারা দেশে নদীপথে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ঘাটে ঘাটে পণ্য নিয়ে অলস বসে রয়েছে লাইটার জাহাজ। গত সোমবার মধ্যরাত থেকে পণ্য ও তেলবাহী নৌযানে লাগাতার এ ধর্মঘট শুরু করে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। এ ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে মালিক-শ্রমিক মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলেও সংকটের সমাধানে কোন পক্ষই এগিয়ে আসছেনা। এমনটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোন উদ্যোগ নিয়েছেন-এমনটি আমাদের কাছে জানা নেই। সম্প্রতি মালিক পক্ষের সাথে শ্রমিক নেতাদের একটি বৈঠক হলেও তা কোনরকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ফলে ব্যর্থ ওই বৈঠকের পর শ্রমিকের ধর্মঘটের মত কঠিন অবস্থানে গিয়েছেন বলে সূত্র জানায়। মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ধর্মঘট ডাকায় শ্রমিক ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করবে। তবে নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহারে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে চিঠি দিয়েছে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম। মঙ্গলবার এ চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে চেম্বার সভাপতি বলেন, ১৯ অক্টোবর রাত থেকে নৌযান শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট পালন শুরু করেছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল না করায় সারা দেশে এসব কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্দরে জাহাজ জট এবং কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়ে নতুনভাবে সঙ্কট তৈরি করবে। জাহাজের টার্ন এরাউন্ড টাইম বৃদ্ধি এবং ওভার স্টে’র কারণে ডেমারেজ চার্জসহ পণ্য আমদানি-রফতানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং সাধারণ ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব মহামারী করোনাভাইরাসের এই সময়ে আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষ আরও চাপের মুখে পড়বে। অর্থনীতির গতিধারা পুনরুদ্ধারে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীরা নতুন করে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। চিঠিতে চেম্বার সভাপতি আরও উল্লেখ করেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরনের ধর্মঘট অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকারক। এতে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যাবে। ফলে বাজার অস্থিতিশীল হবে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাবে যা সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক উভয় পরিসরে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা ব্যবসায়ী সংগঠনের এ নেতার বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে বলতে চাই, সরকার মালিক-শ্রমিকের অলৌকিক কোন সমঝোতার দিকে থাকিয়ে থাকলে সংকটের সমাধান হবে বলে আমাদের মনে হয়না। কারণ এ ধর্মঘটে মালিক-শ্রমিকদের তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে না, শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পাবেন আর মালিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার হলে যেকোনভাবে ক্ষতি পোষিয়ে নেবেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ী এবং সরকার। সুতরাং আর কালবিলম্ব না করে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে অচলাবস্থা নিরসনে। আমরা আশা করব, চেম্বার সভাপতির চিঠির আলোকে মন্ত্রী মহোদয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন এবং উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। একইসাথে মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষকে পরস্পরের প্রতি সহানুভুতিশীল হতে হবে। শ্রকিদের যে দাবি তার যৌক্তিক ভিত্তি থাকলে মালিক পক্ষ তা সহমর্মিতার সাথে বিবেচনায় রাখবেন-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।