নৈরাজ্যকর বাজারমূল্য সাধারণের কষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নিন

5

দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে চলছে এক অস্বাভাবিক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এমন কোন পণ্য নেই যার মূল্য বাড়েনি। সম্প্রতি কয়েক দফায় ঘোষণা দিয়ে তেল ও চিনির দাম বাড়ানো হয়, সর্বশেষ গত বুধবার সোযাবিন তেলের বোতল প্রতি লিটার নির্ধারণ করা হয় ১৯০ টাকা আর চিনির প্রতি কেজি ১০৮ টাকা। এর পাশাপাশি ডাল, লবন, আটা, ময়দাসহ শাক-সবজি, মাছ-মাংসের বাজারেও চলছে অগ্নিমূল্য। বলা যায়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক বাড়ানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যে যুক্তি দিচ্ছেন তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। স্থির ও নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে অনেকেই পরিবারের সদস্যদের খাদ্য থেকে অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বোর ধানের উৎপাদন ভালো হলেও চালের দাম দিন দিন বাড়ছে। ৫০ কেজির প্রতিবস্তা চালে ১৫০ থেকে ২০০টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে আটা ও ময়দার সরবরাহ কমে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা যে যতটা পারেন দাম নিচ্ছেন। বাজারে প্যাকেটের আটা ও ময়দার সংকট রয়েছে। গত সপ্তাহে খোলা আটা ৬৫ টাকা এবং খোলা ময়দা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। চীন থেকে আমদানি করা আদার কেজি ছিল ২০০ টাকা। গত বুধবার চিনি ও বোতলজাত সোয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির পর দোকানে দোকানে ঘুরেও অনেকের বোতলজাত সয়াবিন তেল ভাগ্যে জোটেনি। পাওয়া যায়নি প্যাকেটজাত চিনিও। ১০৭ টাকা দাম নির্ধারণ করে দেওয়া খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছিল ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। মূলত, বাজার স্থিতির জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে। এক লিটারের বোতলের দাম ১২ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৯০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৮৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯২৫ টাকা। বেড়েছে পাম অয়েলের দামও। প্যাকেটজাত চিনির দাম কেজিপ্রতি ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১০৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর খোলা চিনির দাম নির্ধারিত হয়েছে ১০২ টাকা কেজি। কিন্তু এই দামে কবে এসব পণ্য পাওয়া যাবে তা নিয়েও ভোক্তাদের মধ্যে রয়েছে সংশয়।
আমরা লক্ষ্য করে আসছি, আমাদের বাজার ব্যবস্থার নৈরাজ্যের পেছনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতায় দায়ি। তারা সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতি ও কষ্টের দিকে না দেখে নিজেদের আখের গোছানোই মুখ্য মনে করেন। ফলে কোনো ধরনের যুক্তি তারা মেনে চলে না। কোনো কারণে বাজারে কোনো পণ্যের সংকট হলে কিংবা অবৈধ মজুদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়তে থাকে। আর এ জন্য ব্যবসায়ীদের অজুহাতের অভাব হয় না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি আরো কত কী! কিন্তু কোন কারণে কতটা দাম বাড়ছে তার ব্যাখ্যা কেউ দেয় না। এক সপ্তাহে এক কেজি আদার আমদানি খরচ কি ২০ টাকা বেড়ে গেছে? কিছুদিন আগে ডিমের দাম ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তেলের বর্ধিত দাম হিসাব করে দেখা যায়, ডজনপ্রতি পরিবহন খরচ বেড়েছে ৫০ পয়সারও কম। আবার দেখা যায়, আমদানির ঘোষণা দেওয়ার পর ডিমের দাম কমেও গিয়েছিল। আসল কারণ বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা। প্রশাসনের সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণেই কোনো কোনো সিন্ডিকেট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে থাকে। আবার ব্যবসায়ে নৈতিকতার অভাবও এ জন্য দায়ী। দেখা যায়, দেশের যেকোন উৎসব পার্বণে অসাধু ব্যসাসায়ীরা চাহিদা বৃদ্ধি বা সরবরাহ কম বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির দাম বাড়িয়ে দেন। এ বিষয়টি কমবেশি সবার জানা থাকলেও এর বিরুদ্ধে কোন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়না। ফলে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমরা মনে করি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। এ ক্ষেত্রে সরকারের বেশ কিছু সংস্থা কাজ করে। তাদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভুমিকা থাকলে বাজারে পণ্যমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশা করা যায়।