নীল সমুদ্রে রূপালি ঢেউ

7

(শেষ কিস্তি)
টেবিলে রাতের খাবার সাজানো ছিলো। খেতে খেতে খুশির গলায় মার্গারেট বললো, আজকের দিনটা সত্যই অন্য রকমের। তাই না, শাশ্বত?
ঠিক তাই।
আমরা দু’জন দু’জনকে উম্মোচন করে চিনলাম, চিনিয়ে দিলাম।
ঠিক তাই। কেন না জীবনের প্রথম স্পর্শ, প্রথম আবেগ উষ্ণতা- এ সবকে তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মধ্যবিত্ত পরিবারের গড়পড়তা এক সাধারণ ছেলের কাছে ঘটনার আবেদনই অসীম। একটা কথা বলবো, মার্গারেট?
হঁ।
আমোরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়ে, যুবক-যুবতীরা যার সঙ্গে শরীরী সম্পর্কের ভালোবাসা তার সঙ্গে বিয়েÑ এই মতবাদে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে ভালোবাসা ও বিয়ে দু’টোই আলাদা ব্যাপার। ধরা-ছাড়ার এই মানসিকতা বা দর্শণের আমাদের ঠিক মেলে না। ব্যতিক্রম হয়তো কিছু আছে কিন্তু সেটাই সব নয়। আমাদের মূলধারা হলো, আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করতে পারলেই মন ভরে যায়। আর বিয়ের আগে ওই সব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা খুব একটা ভাবতেই পারিনা। রক্ষণশীল মনোভাব থেকে যেটা বলতে চাচ্ছি, আজকে যেটা হলো এটা তোমার কাছে বিনোদনের হলেও আমার কাছে এই ঘটনার গভীরতা অনেক বেশি বিস্তৃত। তুমি-তুমি কি আমাকে ফেলে চলে যাবে?
মার্গারেট খাওয়া থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কী মনে হয়।
দেখো, দুই দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, কালচার, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, অবস্থান সবই যখন আলাদা তখন তোমার চলে যাওয়াটাই সেই অর্থে নিয়মের মধ্যে, স্বাভাবিকতার মধ্যেই পড়ে। আমার এতো কথা বলার বিষয়টা হলো, একটু আগেই বললে না, এ্যাই শাশ্বত, শোন, তুমি আবার আমাকে ছেড়ে, চলে যাবে নাতো? খুব কষ্ট পাবো তা হলো।
হঁ, বলেছি তো-
আমি বলতে চাইছি, তোমার থেকেও বেশী কষ্ট পাবো আমি।
কিছুক্ষণ থেমে থেকে বললো, তোমার কষ্ট, আমার কষ্ট বলে, এখন আর আমাদের মধ্যে কিছু নেই। আমরা মিশে গেছি এক স্রোতে, এক ভাবনায়। এখন থেকে শুধু আমরা! আমরা!
হোটেলের সুগন্ধি সাবান দিয়ে স্নানটা করে পাজামা-পাঞ্জাবী গায়ে চাপিয়ে শাশ্বত যখন বেড়িয়ে এলো, তখন সারা ঘরটা অপূর্ব এক গন্ধে ভরে আছে।
শাশ্বত ওর মুখোমুখি বসে চোখের দিকে তাকাতেই মার্গারেট বললো, আমার জন্য হোয়াইট ওয়াইন আনিয়েছি। আমি এটা ছাড়া অন্য কোন ড্রিঙ্ক সাধারণত নেই না। তোমার জন্যে বিয়ার রয়েছে। তবেÑ মার্গারেট আদুরে গলায় বললো, তুমি না বলেছিলে, একদিন হোয়াইট ওয়াইন খাবে। আজ খাবে? একটা খেয়ে দেখো ভালো লাগবে।
নিজের জন্যে এবং শাশ্বতর জন্য ড্রিঙ্কটা বানিয়ে ফেললো। তারপর ছোট ছোট চুমুক বসিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে রোমশা জিজ্ঞেস করে, আমাদের তো দিনাজপুর কান্তিজির মন্দির দেখতে যাওয়ার কথা,
হ্যাঁ।
সকালেই হোটেল ছেড়ে দিচ্ছি।
তেমনটাই তো ঠিক।
ঢাকায় রাতে পৌঁছেই আবার পরদিন সকাল দশটায় ছুটতে হবে-
শাশ্বত হোয়াইট ওয়াইনের গ্লাস্ব চুমুক দিয়ে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, দশটায় আবার কোথায় ছুটবে?
এরি মধ্যে ভুলে গেলে?
আমি এখন সত্যিই হাল্কা মেঘের মতো ভেসে চলেছি। ভারি ভালো লাগছে মার্গারেট । অভাবী ঘরের একটা ছেলেকে তুমি যে ঐশ্বর্য স্বেচ্ছায় দিলে আবারও বলছি তোমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। আজীবন। এতো ফুরফুরে আনন্দে থেকে আমি অনেক কিছু ভুলে গেছি। সকাল দশটায় কোথায় যাবার কথা বলো তো?
এসিয়াটিকের অফিসে একবার যেতে হবে না? তোমরা বিশ জন যে ইন্টারভিউ দিয়ে এলে এর রেজাল্টটা তো জানতে হবে।
ওহ, ইয়েস। এবার মনে পড়েছে। শাশ্বত বললো, বারজনকে নেবে। বাদ পড়বে আটজন। কিন্তু মার্গারেট আমি তোমাকে বলে রাখছি, এবারে ওরা আমাকে বাদ দিতে পারবে না।
কেন? ইন্টারভিউ ভালো দিয়েছো বলে?
সেটাতো একটা আছেই। আরো বড়ো কারণটা হলো, আমার সঙ্গে মার্গারেট রয়েছে। একটা চাকরি তো সামান্য, আমি এখন এই পৃথিবীটা জয় করতে পারি।
আচ্ছা শাশ্বত—
বলো।
এই যে তুমি চাকরি-বাকরি খুঁজছো এটা ছাড়া তুমি অন্য কিছু করতে পারো না? মানে ব্যবসা। মার্গারেট উচ্ছ্বল হেসে বললো, আমি ব্যবসা করে এখন চারটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসের মালিক হয়েও মাঝে মাঝে একটা কথা ভাবি, চাকরি করে আর কতদূর এগোতে পারতাম?
শাশ্বতর গ্লাসটা ফাকা হতেই রোশমা ভালোবাসার গলায় বললো, অ্যাই শাশ্বত আর একটা নাও।
উহ! একটাতেই ভালো আছি।
আজ আমি তোমাকে আরো মন্দ করে দেবো।
মার্গারেট চোখের দিকে গভীরভাবে তাকালো। জাগতিক সব শব্দ যেন মুছে গিয়েছে। দু’জনেরই দৃষ্টি তখন স্থির। শাশ্বত নিচু গলায় বললো, মন্দ যদি বলো আমিতো মন্দ হতেই এসেছি। কিন্তু মার্গারেট মায়া স্পর্শে কেউ মন্দ হতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস। কথাটা শেষ করেই শাশ্বত মার্গারেটকে টেনে তুলে যে আগ্রহ এবং তীব্রতায় ওর ঠোঁটের দখল নিল, সেই দাবি ছাড়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ ছেলেটার মধ্যে দেখা গেল না। বরং ধীরে ধীরে সে এক সময় মার্গারেট পুরো শরীরটারও দখল নিয়ে ফেললো। আর শাশ্বতর সেই অনায়াস জয়ে সব থেকে বেশি সহযোগীতা করলো কিনা ওই মার্গারেটই। শরীরী সাম্রাজ্যেও ওই সম্রাজ্ঞী নিজের রাজ্যপাট, ঘর দোর সব হাট করে খুলে দিয়ে যদি লুন্ঠনের আহবান জানায় সেটা তখন হয়ে ওঠে সত্যিই এক আনন্দেরই মৃগয়াভূমি।
চল্লিশ মিনিট বাদে শাশ্বত মৃদু হেসে বললো, আমার নেশা টেশা সব কেটে গিয়েছে। আমাকে আর একটা দাও।
মার্গারেট চোখের কোনে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি, তার মানে আর একটা খেয়ে আরেকবার।
আজ আর কোন কিছুতেই গোনাগুনি নেই। শাশ্বত হেসে ফেললো। মন্দ যখন হয়েই গেছি সংখ্যাতত্তে¡ও হিসাব নিয়ে কী করবো? আর কখনো কি এ জিনিস খেতে পাবো? গ্রেট মার্গারেটের দয়ায় এই কদিন যে রাজকীয়ভাবে কাটালাম। তার জন্যে আমোরিকা থেকে আসা এই মার্গারেট কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। আমাকে আরেকটা দাও মার্গারেট। আমাকে আরেকটা-
নাহ তোমাকে আর দেবো না। অভিমানে মার্গারেট গলা বুজে যায়।
কিন্তু একি তোমার চোখে জল কেন? শাশ্বত ওর পাঞ্জাবির প্রান্ত দিয়ে পরম মমতায় সেইজল মুছিয়ে দিয়ে গম্ভীর সুরে বললো, হাসি ছাড়া ওই মার্গারেটকে যে আর কিছু মানায় না।
নিজেকে সামান্য একটু গুছিয়ে নিয়ে মার্গারেট বললো, আমি বাংলা দেশে এসেছি, চিটাগাং যাচ্ছি কেন জানো?
শাশ্বত মাথা নেড়ে জানালো, না।
চিটাগাং আমি একজন লোকের সন্ধানে এসেছি।
শাশ্বত জিজ্ঞেস করলো, তিনি কে, কী হন তোমার?
আমার বাবা।
মার্গারেট কথা শুনে শাশ্বত চমকে উঠলো। সে ফ্যাল ফ্যাল করে ওর মুখের দিকে তাকিয়েই রইলো।
মার্গারেট জিজ্ঞাস করলো বাবার নামটা জানতে চাইলে নাতো।
কী নাম তোমার বাবার?
কাওশিক মাইত্র।
কী বললে? শাশ্বত হতভম্ব। সে বুঝতে পারলো কাওশিক মাইত্র উচ্চারণটা হবে কৌশিক মিত্র। কিন্তু সঠিক উচ্চারণ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এটা নয়।
ইয়েস, আমার গায়ে ও বাঙ্গালির রক্ত। তাতে আমি গর্বিত নই। আমি আমার মায়ের পদবীটা ব্যবহার করি। আর বাবার নাম কৌশিক মিত্র। তাকে কতো দিনেই বা দেখলাম?
সানফ্রান্সকিকোতে মায়ের সঙ্গে প্রেম তারপর বিয়ে। তারপর অতি নিষ্ঠার সঙ্গে ঘর-সংসার করছেন সাত বছর। তারপর চট্টগ্রাম যাওয়া একটু প্রয়োজন মনে করে বাড়ি থেকে এসেছেন। আর ফিরে যান নি।
আমার মা হলেন ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে সচ্ছলতায় মোড়া আমাদের জীবন। ফলে অন্য কোন দিকে আমাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধে না থাকলেও আমাদের সংসারে ওই একজন মানুষের অভাবটা খুব বেশি বেশিই ছিলো। আমার পড়াশোনা, বড়ো হওয়া এবং আমাদের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সেও ব্যবসা দেখার ফাঁকে ফাঁকে মাকে কথা দিয়েছিলাম, বাংলাদেশে গিয়ে বাবার খোঁজ করতে আমি অবশ্যই চিটাগাং যাবো।
হ্যাঁ, তোমাকে যখন পেয়েছি তখন আমার চট্টগ্রাম যাওয়া আর আটকায় কে?
শ্বাশত, এই কাজটায় তুমি আমাকে সাহায্য করবে?
লোকটা কাওয়ার্ড। ধান্দাবাজ-প্রতারক। এছাড়া ওকে আর আমি কিছু ভাবতে পারছিনা। হয়তো গিয়ে দেখবে সে একটা বাঙ্গালি বিয়ে করে সেই নারীর উত্তাপ নিয়ে ঘর সংসার করছে।
তুমি এমন একটা মনগড়া কাহিনী সাজিয়ে বললে তা খুবই অন্যায়। না জেনে কারো উপর দোষ চাপানো উচিত নয়। তুমি যেমন বাঙ্গালি বিয়ে করে ঘর সংসার করছে বললে। তা না হয়ে উনি আমাদের মধ্যে নাও তো থাকতে পারেন। চট্টগ্রাম এর প্রতি তোমার বাবার কোন আকর্ষণ নেই। বাড়ির কথা তোমাদের বলেন নি। এর অর্থ পারিবারিক ইতিহাসটা উনি ভুলতে চান। সত্যিটা আমরা জানি না। কিন্তু এটা আমাদের বের করতে হবে। কৌশিক মিত্রকে আমরা
মার্গারেট বলে উঠলো, তুমি আমার বাবাকে খোঁজে দাও। শ্বাশত, আমি তোমর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।
এটা কৃতজ্ঞ থাকার ব্যপার নয়। এটা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য — তোমার প্রতি ভালোবাসা। কাজটা কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। একটু সময় লাগবে। এক-একটা পাড়া, এলাকার বাড়ি ধরে ধরে আমরা এগোবো। তারপর দেখা যাক তোমার বাবাকে উদ্ধার করতে পারি কিনা।
মার্গারেট বললো, তোমার নাম শ্বাশত। কাজটা পারলে তুমিই পারবে।
শ্বাশত মৃদু হেসে বললো আমার চেষ্টা তো থাকবে। কিন্তু যদি না পারি?
দেশে ফিরে গিয়ে আমি মায়ের সামনে একা দাঁড়াতে পারবো না। আমার সঙ্গে আমেরিকা গিয়ে মাকে সামলানোর দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। আমি শুধু মাকে একটা কথা বলতে পারি, তুমি যে ভুলটা করেছ আমি তা করিনি। শ্বাশতর বাড়ির ঠিকানা জেনে, ওর মা, দাদা-বৌদির সম্মতি নিয়েই এসেছি। ও আর কোথাও হারাবে না। ওকে আমরা হারাতেই দেবো না।