নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছে যে নারী

44

রত্না চক্রবর্তী
স্বামী: বাদল কান্তি চক্রবর্তী, মা: চবলা বালা চক্রবর্তী
সুখছড়ি, আমিরাবাদ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম

লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি গ্রামের ব্রাহ্মণপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। বাবা যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মা চবলাবালা চক্রবর্তী খুব আদরেই তাঁকে বড় করে তুলেছিলেন। এরই মাঝে রতœা চক্রবর্তীর জীবনে নেমে আসে এক ভয়াল অন্ধকার। ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল সুখছড়ি গ্রামটিতে যেন নেমে আসে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জনৈক স্থানীয় ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে ব্রাহ্মনপাড়া, রাজাবাড়ি ও কলাউজানে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় ব্রাহ্মণপাড়ার হিন্দু পরিবারের লোকজন ঝোপ ঝাড়ে লুকিয়ে পড়েন। লুকিয়ে থাকা সাত ব্যক্তিকে বের করে এনে গুলি করে পাকিস্তনি সৈন্যরা। এতে নিহত হন পুলিন বিহারী দাশ, হিমাংশু বিমল দাশ, রনজিত দত্ত, দুলাল দাশ ও উপেন্দ্র লাল দাশ। আরো অনেকে আহত হন। হত্যা, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগেই সৈন্যরা ক্লান্ত হননি। তারা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা ১৮ বছরের রত্না চক্রবর্তীকে টেনেহিচঁড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় দোহাজারী ক্যম্পে। প্রায় এক মাস রত্না চক্রবর্তীর ওপর চলে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর পাশবিক নির্যাতন। এক পর্র্যায়ে তাকে মৃত ভেবে ক্যম্পের বাইরে ফেলে দেয়। এ সময় দোহাজারী সেতুর পাশে তাঁকে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পায় বাদল চক্রবর্তী। বাদল চক্রবর্তী তার এক বন্ধুসহ পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং সেখানেই রতœা চক্রবর্তীর চিকিৎসা হয়। রতœার আত্মীয় স্বজন সব জেনে তাঁকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিতে চান।
অবশেষে বাদল চক্রবর্তী পরিবারের অমতেই তাকে বিয়ে করেন। উদার মানসিকতার বাদল চক্রবর্তীর সাথে তার সংসার খুব সুখেই কাটছিলো। তাঁর স্বামী বাদল চক্রবর্তী হঠাৎ করেই স্ট্রোক করেন। আর তাই আটকে যায় তাঁর দু’মাসের বাসা ভাড়া। স্বামীর চিকিৎসা খরচ, দুই মাসের বাসা ভাড়া যখন আর বহন করা সম্ভব হচ্ছিলো না তখন ২০১২ সালে চট্টগ্রাম নগরীর আফমি প্লাজার বিপনী-বিতানে ঝাড়ুদারের কাজ নেন। বর্তমানে তিনি নগরের দেওয়ান বাজারের ডিসি রোডের ভরা পুকুর পাড় এলাকায় পাঁচ হাজার টাকা বাসা ভাড়া করে তার ছেলের সাথে থাকেন।
রতœা চক্রবর্তী এমনই এক আত্মপ্রত্যয়ী ও দেশপ্রেমিক নারীর নাম যিনি জীবনের সমস্ত বিভীষিকাময় অধ্যায় মুছে ফেলে আজও জীবন সংগ্রমে লড়ে যাচ্ছেন দৃঢ় মনোবল নিয়ে। অনুকরনীয় অনুসরনিয় রতœা চক্রবর্তীর কাছ থেকে আমাদের নারী সমাজের শিখবার রয়েছে অনেক কিছু। ৬৬ বছর বয়সী এই নারী আজও সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রম করে নিজের জীবনের কালো অধ্যায়কে পাথর চাপা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নিরন্তর।