নির্বাসন শেষ হতে দেরি নেই

10

করিম রেজা

কবিতার অভিজাত পাঠক শ্রেণির মনোজগতে সযত্নে লালন করা একটি নাম কবি ময়ুখ চৌধুরী। চর্যাপদে আমরা দেখেছি ‘শবরিবালিকা’ পাহাড়ে বসবাস করেন। আর এই একুশ শতকে দেখা যাচ্ছে কোনো শবরি বালিকা নয়, স্বয়ং কবিই বসবাস করছেন টারশিয়ারি যুগের অনুচ্চ পাহাড়ের পাদদেশে। ময়ুখ চৌধুরী আড্ডা প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও কোলাহল বিমুখ। ‘নগর বাহিরে’ থাকেন কবি, তাই নাগরিক সভা বা আলোচনায় তাঁর শারীরিক উপস্থিতি প্রত্যাশিতভাবেই বিরল। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিপ্লবের যুগে, স্মার্ট ফোনের কাচের পেছনে কবি ময়ুখ চৌধুরীর আনাগোনানা থাকাটা যেন পাহাড়ী নির্জনতা বা নীরবতার মতো রহস্যময়।
ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ জীবনানন্দ দাশ এবং ময়ুখ চৌধুরীকে এক অদৃশ্য সুতোয় যেন বেঁধে রেখেছে চিরদিনের জন্য। ২২ অক্টোবর প্রথম জনের প্রয়াণ দিবস আর দ্বিতীয় জনের শুভস্য জন্মদিন! এই দুই কবির একই তারিখে যাওয়া আসার মধ্যে প্রকৃতির কোনো গোপন আঁতাত ছিল কি-না তা কখনো জানা যাবে না। তবে আধুনিক বাংলা কবিতার গতি প্রকৃতিতে এই দু’জনের কাব্য ভাষা নিঃসন্দেহে ব্যবচ্ছেদ করা যাবে। দুর্ভিক্ষ, মহামারি আর যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ সময়ের কবি জীবনানন্দ দাশ। অন্যদিকে ময়ুখ চৌধুরী বেড়ে উঠেছেন বিশ্ব যুদ্ধের ছায়ায়; বিশ্বযুদ্ধের পরিণতির নির্মম আঘাতের ভিতর দিয়ে। কবিতার পঙক্তি দিয়েই দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক:
তোমার দেখার কথা নয়
সেই দীর্ঘদেহীতামাদি ডাকাত, যার
রেঙ্গুন-যুদ্ধের কালে বোমার আঘাতে মুখ ঝলসে গিয়েছিল
মায়াবী জ্যোৎস্নার রাতে আমিতাকে ভিক্ষা করতে দেখেছি
(মৃত্যুর জীবনী গ্রন্থ/পলাতক পেন্ডুলাম)
অন্যদিকে রক্ত ফেনা মাখা মুখ, লাশ কাটা ঘর, প্লেগ মহামারি, অজস্র মৃত্যুর পাশাপাশি বাংলার চিরায়ত সবুজ প্রকৃতির অনন্য কাব্যভাষা সৃষ্টি করেছেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের ‘লক্ষীপেঁচা’ আর ময়ুখ চৌধুরীর ‘মোমবাতি’ কে-তাঁদের কাব্যভাষার দুটি টোটেম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করা যায়। লক্ষী পেঁচা আছে জীবনানন্দ দাশের অজস্র পঙক্তিতে। আর মোমবাতির কান্না, সারারাত মোমবাতির জেগে থাকাসহ আরো বৈচিত্র্যময় উপমা ইঙ্গিতে ময়ুখ চৌধুরী ব্যবহার করেছেন মোমবাতিকে। যার সর্বশেষ পরিণতি দেখা যায় তাঁর এ পর্যন্ত সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থে নিম্নরূপ:
সব শেষে মোমবাতির শিখাটিও এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দিয়েছি।
তারপর পিপাসার্ত ভারী অন্ধকারে
বিড়ালের চোখ পরে বসে আছি।
(ট্যাপেটাম লুসিডাম/ চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন)
নিঃশব্দ নীরবতা আছে ময়ুখ চৌধুরী আর জীবনানন্দ দাশ, উভয়ের কবিতায়। জারুল তলার কাব্যের ‘সবচেয়ে ভালোবাসি যাকে, তার মুখোমুখি হলে’ কবিতাটিতেই আছে ময়ুখীয় নীরবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর কালো বরফের মধ্যেও কি অন্য রকম রহস্য লুকিয়ে নেই? এই যে কালো বরফ, আমরা শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্র লোকেরা যার প্রতিবেশী, সেই কালো বরফও তো রহস্য ঘেরা এক নিগূঢ় অন্ধকার। ভোগবাদী মানুষের হাতে শ্রমজীবী মানুষের লাঞ্ছনার অসমাপ্ত সাহিত্য আর অন্ধকার ইতিহাসের সাক্ষ্য হলো ময়ুখ চৌধুরীর ‘কালো বরফের প্রতিবেশী’। এই কাব্যের বরফ-মানুষ কবিতার শীতার্ত লোকটাকে একবার দেখুন:
শীতার্ত লোকটা ছোটে জোনাকী ও চুরুটের আলো দেখে-দেখে;
আলো নয়, চাই তার আগুন, এখন তার আগুন-পিপাসা।
বাঙালি জাতির ইতিহাসই হলো শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস। এই সব শ্রমজীবী মানুষের হাতে শিউলির সকাল তুলে দিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তখন ময়ুখ চৌধুরীর ক্ষোভ বিষ্ফারিত হয় দ্রোহের কারু কাজে। সেই সব শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন সংগ্রামের বিরুদ্ধে কারা দাঁড়িয়ে ছিল আমরা ইতিমধ্যে তাদের চিনে নিয়েছি।
দো-আঁশ মাটির বুক চিরে
সবুজের প্রতিশ্রুতি তুলে আনে যারা,
তাদের ঘর্মাক্ত হাতে শিউলির সকাল তুলে দেওয়া-
এতোই দোষের!
দিন রাত্রি চাকা ঘোরে শহরে বন্দরে;
সেই সব জীর্ণ হাতে শিশিরের শীতল বিশ্রাম তুলে দেওয়া
এতোই দোষের!
(অপরাধ ১৯৭৫/চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন)
মুন্ডহীন চরণগুলো হাঁটতে থাকুক ময়ুখ চৌধুরীর নির্বাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত। আমরাও অন্ধকারে বিড়ালের চোখ পরে বসে আছি তাঁর নির্বাসন শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। এই নির্বাসন শেষে কী হবে? যা-ই হোক না কেন, একদিন এমন দূরে থাকা শেষ হবে কোনো এক স্নিগ্ধ সকালে। কবিতার পঙক্তিই বলছে নির্বাসন শেষ হতে দেরি নেই-
মন্থরা, মন্থর পায়ে জারজ সন্তানসহ ফিরে যাও
চোখের আড়ালে।
নির্বাসন শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই।
(২১ বছর মুখে মুখে রাখা একটি পদ্য/চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুন্ডহীন)