নির্বাচন আর সম্মেলনেই বছর পার

11

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বিদায় নিচ্ছে ২০২২ সাল। নানা কারণে এবারও বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের রাজনীতি। মাঠ দখলে রাখতে বছরের শুরু থেকে নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে নিজেদের সরব উপস্থিতির জানান দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। সংগঠন গোছাতে নানা পর্যায়ের সম্মেলন ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বছরব্যাপী ব্যস্ত সময় পার করেন দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলটির নেতাকর্মীরা।
বছরের শুরুতে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও শেষ সময়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে দলটির নেতাকর্মীদের। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে মহানগর, জেলা, উপজেলা ও থানা-পর্যায়ের সম্মেলন করেছে দলটি। সমান তালে চলছে প্রচার-প্রচারণাও। দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের পর দীর্ঘদিন সভা-সমাবেশ এড়িয়ে চলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে, বছরের শেষ দিকে এসে কয়েকটি বিভাগীয় শহরে জনসমাবেশে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে যশোর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মহাসমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। এছাড়া তিনি ছাত্রলীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও অংশগ্রহণ করেন।
১০ ডিসেম্বর ঘিরে উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ
গত ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ছিল উত্তেজনা। সেদিন ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ ডেকেছিল বিএনপি। সমাবেশের স্থান নির্ধারণ নিয়ে শুরু থেকেই চলছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার যুক্তি-তর্ক। শুরুতে সরকার বিএনপিকে সমাবেশের জন্য ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দেয়। কিন্তু সেখানে সমাবেশ করতে রাজি হয়নি বিএনপি। তারা (বিএনপি) নয়াপল্টনের রাস্তায় সমাবেশ করতে চেয়েছিল। সমাবেশের চার দিন আগেই বিএনপির নয়াপল্টন অফিসে সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা। তখন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এরপর সরকারের কাছে নতুন স্থানের আবেদন করে বিএনপি। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গোলাপবাগ মাঠে অনুমতি পায় দলটি। সেখানেই ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, সমাবেশের দুই দিন আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে গ্রেপ্তারের কারণে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সর্বত্র বিরাজ করে চরম উত্তেজনা। সেই উত্তেজনার মধ্যে, বলা যায় বেশ শান্তিপূর্ণভাবে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ১০ দফা দাবি’ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিএনপির বিভাগীয় সম্মেলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর বিএনপির কোনো কর্মসূচি ঘিরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় দলটির সভাপতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রের অধিকাংশ নেতার বক্তব্যে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তার নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেন। তার এমন নির্দেশনার পর রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন।
তিন মহাসমাবেশ
গত ২৪ নভেম্বর যশোর, ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও ৭ ডিসেম্বর কক্সবাজারে মহাসমাবেশ করে আওয়ামী লীগ। ওই তিন মহাসমাবেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি মহাসমাবেশে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন। করোনা-পরবর্তী সময়ে যশোরে জনসভার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু হয়। প্রতিটি জনসভা জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে বলে দাবি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের।
সমাবেশের দুই দিন আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে গ্রেপ্তারের কারণে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সর্বত্র বিরাজ করে চরম উত্তেজনা। সেই উত্তেজনার মধ্যে, বলা যায় বেশ শান্তিপূর্ণভাবে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ১০ দফা দাবি’ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিএনপির বিভাগীয় সম্মেলন।
ছাত্রলীগের সম্মেলন, শেষ হয়েও হইল না শেষ
গত ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলন সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। এটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান মেহের আফরোজ চুমকি এবং সাধারণ সম্পাদক হন শবনম জাহান শিলা।
কার্যনির্বাহী ও উপদেষ্টা পরিষদের সভা
চলতি বছরের ৭ মে ও ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে, গত ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় দলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান, জাতীয় কাউন্সিল, সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সভাগুলোতে সমসাময়িক বিভিন্ন এজেন্ডা নিয়েও আলোচনা হয়।
স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহীদের দাপট
চলতি বছরের শুরুতে আওয়ামী লীগের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে বিদ্রোহীদের দাপট! এ নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবির অন্যতম কারণ ছিল বিদ্রোহীদের দাপট আর তৃণমূলের পাঠানো তালিকায় অনিয়ম। সবমিলিয়ে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছর। সেই নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল আওয়ামী লীগ।
বিনা ভোটে বিজয়ীদের নিয়ে অস্বস্তি
চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর সারাদেশে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলা পরিষদ নির্বাচন আদালত কর্তৃক স্থগিত করা হয়। ভোলা ও ফেনী জেলার সব পদে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হন প্রার্থীরা। ২৬ জেলায় চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদে ১৮ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে ৬৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হন। বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
তৃণমূলের সম্মেলন
করোনার কারণে গত দুই বছর জেলা, উপজেলা কিংবা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন, বর্ধিত সভা ও যৌথ সভা করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। চলতি বছর ঢাকা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, ভোলা, টাঙ্গাইল, জামালপুর, বরগুনা, কুমিল্ল­া মহানগর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝিনাইদহ, ল²ীপুর, পিরোজপুর, কুমিল্ল­া দক্ষিণ, জামালপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, মাগুরা, নওগাঁ, নাটোর, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শতাধিক উপজেলা ও বেশ কয়েকটি মহানগরের সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়। তৃণমূলের এসব সম্মেলন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
২০২২, অনবদ্য সাফল্যের বছর
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ২০২২ সাল করোনার সংকট মোকাবিলার বছর হিসেবে নিতে পারি। করোনা সংকটের পর অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব সৃষ্টি হয়েছিল, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেটি আরও গভীর হয়। তারপরও ২০২২ সাল শেখ হাসিনার সরকারের একটি অনবদ্য ও সাফল্যের বছর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। কারণ, এ বছরই স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়। এ বছরই চালু হচ্ছে মেট্রোরেল।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, ২০২২ সালে বিএনপিকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ১০ ডিসেম্বর বিএনপি একটি ষড়যন্ত্র করেছিল। জনগণ তা সফল করতে দেয়নি। বিএনপি দেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। বরং বাংলাদেশের ২০টি খাত আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান থেকে সব উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটা বাংলাদেশের অর্জন।
‘বিদায়ী বছরে (২০২২ সাল) পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল হয়েছে, ১০০টি ব্রিজ হয়েছে, অর্থনৈতিক জোন হয়েছে। বিশেষ এসব জোনে প্রায় এক কোটি মানুষের চাকরি হবে। এ বছরই মেট্রোরেলের উদ্বোধন হবে। এগুলো তো সরকারের অর্জন।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। নির্ধারিত সময়েই দলের কাউন্সিল হচ্ছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃণমূল সুসংগঠিত হচ্ছে। ২০৪১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’- এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি, বলেন এস এম কামাল হোসেন।