নির্বাচনী প্রচারণায় পদে পদে আচরণবিধির ‘বারোটা’

32

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীরা মানছেন না আচরণবিধি। গণসংযোগ শুরুর দশদিন পেরিয়ে গেলেও ‘ফ্রি স্টাইলে’ প্রচারণা চালাচ্ছেন। আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন অফিসের কঠোরতা ও মাঠে ম্যাজিস্ট্রেট নামলেও তা আমলে নিচ্ছেন না প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থিত অধিকাংশ কাউন্সিলর প্রার্থী দলীয় পরিচয়ে পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়েছেন। যা আচরণবিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
জানা যায়, আকারে বড় ব্যানার, প্রচারে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার, পোস্টারে দলীয় পরিচয় ব্যবহার, দলীয় প্রতীক দিয়ে পোস্টার সাঁটানো, শব্দদূষণ, অনুমতি ব্যতীত মাইক ব্যবহার ও সভা-সমাবেশ আয়োজন, মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর যৌথ ব্যানার, রঙিন পোস্টার সাঁটানো, ট্রাক-পিকআপে করে প্রচারণা, গাড়ি ও দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো, নির্বাচনী অফিসে টিভি ব্যবহার, উপঢৌহন প্রদান, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে হুমকি-ধমকিসহ পদে পদে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান পূর্বদেশকে বলেন, ‘আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে আছি আমরা। নির্বাচনী আচরণবিধি পর্যবেক্ষণে সার্বক্ষণিক ১৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। তারা বিভিন্ন স্থানে অ্যাকশনও নিয়েছেন। আমরাও যেসব অভিযোগ পাচ্ছি তা সাথে সাথে নিষ্পত্তি করছি। এমনকি ঘটনার খবর পেলেই তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠাচ্ছি। প্রচারকালে প্রার্থীদের কোনো অনিয়ম আমরা সহ্য করবো না। আচরণবিধি লঙ্ঘনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ১৩ নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী লাটিম প্রতীকের সমর্থনে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বলে উল্লেখ করেছেন। ৩৩ নং ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান রিপন ঠেলাগাড়ি প্রতীকে নিজেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বলে পোস্টারে তুলে ধরেছেন। সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড-১৩ এর আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী লুৎফুন্নেছা দোভাষও নিজেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দাবি করে পোস্টার লাগিয়েছেন।
ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন সাঁটিয়েছেন ভিন্নধর্মী পোস্টার। এক পোস্টারেই আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম ও নিজের জন্য ভোট চেয়েছেন তিনি। দুটি প্রতীক তুলে ধরে সাঁটানো পোস্টারে নিজেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বলেও দাবি করেছেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। একইভাবে পোস্টার সাঁটিয়েছেন আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জহরলাল হাজারী। সংরক্ষিত ওয়ার্ড-৭ এর কাউন্সিলর প্রার্থী রুমকি সেনগুপ্ত হেলিকপ্টার প্রতীকে নিজেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দাবি করে পোস্টার লাগিয়েছেন। সংরক্ষিত ওয়ার্ড-৫ এর কাউন্সিলর প্রার্থী আনজুমান আরাও বই প্রতীকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দাবি করেছেন নিজেকে। চকবাজারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টুও নিজেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দাবি করেছেন। ১৬ নং বাগমনিরাম ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন ও বিএনপি প্রার্থী চৌধুরী সায়েফুদ্দিন রাশেদ সিদ্দিকী নিজেদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দাবি করে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। ১৪ নং লালখান বাজার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত মো. বেলাল নিজেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী দাবি করে পোস্টার লাগিয়েছেন। ২ নং জালালাবাদ ওয়ার্ডে বিএনপি প্রার্থী মো. ইয়াকুব চৌধুরী নিজেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দাবি করে পোস্টার লাগিয়েছেন। এভাবে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি পোস্টারেই উল্লেখ করেছেন।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালার ৩১ (১ ও ২) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে ‘কোন প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোন বিধান লঙ্ঘন করিলে অনধিক ৬ (ছয়) মাস কারাদন্ড অথবা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন’।
জানা যায়, গত তিনদিনে সবচেয়ে বেশি কঠোর ছিলেন আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে শিশু কিশোরদের নিয়ে ভ্যান ও ট্রাক নিয়ে উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে প্রচারণা চালানোর দায়ে বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের দুই সমর্থককে সতর্ক করা হয়। বাগমনিরাম ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন একাধিক মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোয় এবং পোস্টারে দল মনোনীত প্রার্থী উল্লেখ করায় তার এক সমর্থককে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে অনুমতি ব্যতীত মাইক ব্যবহার করায় কাউন্সিলর প্রার্থী নাজমুল হক ডিউকের দুই কর্মীকে আটক করা হয়। পরে লিখিত মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। মেয়র প্রার্থী জান্নাতুল ইসলামের কর্মীরা যানবাহনে পোস্টার লাগানোয় সতর্ক করা হয়। এছাড়াও এক মেয়র প্রার্থীর রঙিন পোস্টার অপসারণ করা হয়। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী খোকন চৌধুরীর কর্মীগণ একাধিক মাইক যোগে প্রচার কার্যক্রম চালানোয় ও সিএনজি গাড়িতে পোস্টার লাগানোয় তার প্রচারকারীকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বন্দর এলাকায় দেয়ালে পোস্টার লাগানোয় একজনকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক পূর্বদেশকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে দেখা যায় বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী পোস্টার-ব্যানার ও লিফলেটে নিজেদের দলীয় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। যা আচরণবিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। আমরা যেসব প্রার্থী এমন পোস্টার সাঁটিয়েছেন তাদেরকে দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব পোস্টার সরানোর নির্দেশনা দিয়েছি। এছাড়াও কিছু অনিয়মের ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এবার সাতজন মেয়র প্রার্থী, ৫৭ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ১৭২ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী মিলিয়ে ২৩৬ জন প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন।