নিরন্তর রক্তক্ষরণের দিন : ১৫ আগস্ট

7

এমরান চৌধুরী

জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির সবচেয়ে শোকাবহ দিন। কান্নার দিন। নিরন্তর রক্তক্ষরণের দিন। আজ এমনই এক বেদনাদায়ক, বিষাদসিন্ধুর দিন যা বাঙালি মাত্রই একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারবে না। ৪৭ বছর আগে এদেশীয় কিছু কুলাঙ্গার তাদের পাকিস্তানি প্রভুদের প্ররোচনায় তথা পলাশীর প্রান্তরের সাজানো নাটকের কুশিলব মীর জাফর, ঘষেটি বেগম,রায় দুর্লভ, রাজ বল্লভ আর মীরনের উত্তরসূরিরা যে ঘটনা ঘটিয়েছিল সভ্যতার ইতিহাসে তা রীতিমতো অকল্পনীয়। এ ঘটনাটি এতই বর্বরোচিত, নৃশংস ও অমানবিক ছিল যে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টকর। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রনায়ক আততায়ীর হাতে, সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় ভারতের জাতিরজনক মহাত্মা গান্ধীর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল উগ্রবাদী ঘাতকের বুলেট। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার প্রধান রূপকার আহমদ সুকর্ণের অন্তিম সময় কেটেছে কারাগারে। শ্রীলংকার স্বাধীনতার মূল নায়ক বন্দর নায়েক প্রাণ হারান ঘাতকের হাতে। আলজেরিয়ার স্বাধীনতার নায়ক আহমেদ বেন বেল্লারও শেষ দিনগুলো কেটেছে কারগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে।
ইতিহাসের বাঁক নির্মাণের ভূমিকা রাখার কারণে ঘাতকের হাতে প্রাণ গিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি এবং কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিং এর। কৃষ্ণ আফ্রিকার প্রথম সূর্যোদয়ের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল মোশে শোম্বে কাসুভুর চক্র। বলিভিয়ার জঙ্গলে প্রাণ দিতে হয়েছিল কিউবা বিপ্লবের অন্যতম রূপকার চে গুয়েভারাকে। চিলির আলেন্দেও নিঃশেষে প্রাণদানের আর এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু শিশু ও মহিলাসহ পরিবারের সকল সদস্যকে নির্বিচারে হত্যার ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম। তাই এ জঘন্যতম ঘটনার দায়ভার, লজ্জা বাঙালি জাতিকে কাল থেকে কালান্তরে বয়ে বেড়াতে হবে। তারা এদিন বাঙালি জাতির কাÐারীকে খুন করে জাতিকে অভিভাবকশূন্য করার অপপ্রয়াসই শুধু চালায়নি, সে সাথে সে মহাবৃক্ষের শেকড়শুদ্ধ উৎপাটনের উদ্দেশ্যে চালিয়েছিল একের পর এক স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ার। বাঙালির কষ্টার্জিত অর্থে কেনা গোলাবারুদ যেখানে বহিঃশত্রæর আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের কথা, সেখানে তা ব্যবহৃত হয়েছে একটি পরিবারের কনিষ্ঠতম, ফুলের মতো কোমল শিশুকেও নির্মমভাবে হত্যার কাজে।
পাকিস্তানি হায়েনারা নির্মম ছিল। বর্বর ছিল। পিশাচ ছিল। সর্বোপরি তারা দু’পেয়ে মানুষ হলেও তাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের কোন রেশ ছিল না। কারণ তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশকে মানবশূন্য করতে। বাংলার পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের ভূ-খÐকে মহাশ্মশানে পরিণত করতে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দোসর টিককা খান সদম্ভে সে কথাই ঘোষণা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে অংশ নেওয়া সৈনিকদের উদ্দেশ্য, “আমি বাংলার মানুষ চাই না, মাটি চাই”। ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, সাড়ে সাতকোটি মানুষের নয়নমণি, হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও তাঁর পরিবারকে হত্যার উদ্দেশ্যে এ দেশীয় টিক্কা খানরা যে নির্দেশ দিয়েছিল তার উদ্দেশ্যেও ছিল এক ও অভিন্ন, “মানবশূন্য বত্রিশ নম্বর বাড়ি চাই”। সে কাজটিই অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে করেছিল পঁচাত্তরের কালরাতে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে অংশ নেওয়া মানবরূপী দানব-সৈনিকেরা, বাঙালি নামধারী নরাধমরা।
মানুষ হতে হলে মানুষের মধ্যে কিছু হুঁশ থাকা চাই। আর এই হুঁশটা যদি না থাকে তাহলে সে তো মানুষ নামের খোলস মাত্র-তাকে রোবটের সাথেই তুলনা করা চলে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত-সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু সৃষ্টির সেরা জীবেরা যখন সৃষ্টি জগতকে নরকে পরিণত করার কর্মকাÐে লিপ্ত হয় তখন তারা পরিগণিত হয় কীট হিসেবে। যে কীট মানুষের কোন কাজে আসা দূরে থাক, নিয়ত ক্ষতির কারণই হয়ে থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে পঁচাত্তরের খুনিরা মানুষতো নয়ই—সৃষ্টির অধম কীটের সাথেও তারা তুলনার অযোগ্য। তারা একটি জাতির জনককেই শুধু হত্যা করেনি, হত্যা করেছে একটা পুরো জাতিকে, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক, ভবিষ্যতের চলার পথের পাথেয়-জাতির কাÐারীকে। তারা শুধু এ কাজটি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা একের পর এক নারকীয় হত্যাকাÐে মেতে উঠে। এ যেন মানুষ হত্যার মহোৎসব। তারা হত্যা করে বঙ্গজননী বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিবকে। হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামালকে। হত্যা করে দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রাজিয়া সুলতানাকে। তাদের বর্বরোচিত হত্যাকাÐের শিকার হন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের, নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল শাফায়াত জামিল, কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও ব্যক্তিগত কর্মচারী।
এছাড়া ঐ দিন ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর মেজ বোনের ছেলে শেখ ফজলুল হক মণি। তাঁর স্ত্রী বেগম আরজু মনি। বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত। তাঁর কিশোরী কন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী বেবী সেরনিয়াবাত। তাঁর কনিষ্ঠপুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ছাত্র আরিফ সেরনিয়াবাত। আবদুর রব সেরিনয়াতের নাতি ৪ বছর বয়সী মাসুম শিশু সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু। সে ঢাকায় দাদা আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ভাইয়ের ছেলে, দৈনিক বাংলা’র বরিশালের সংবাদদাতা শহীদ সেরনিয়াবাত। আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাত ভাই আবদুল নঈম খান রিন্টু। তিনি একটি সাংস্কৃতিক দলের সংগে ঢাকায় এসেছিলেন এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় অবস্থানকালে নিহত হন।
বত্রিশ নম্বর বাড়িতে যখন এ নারকীয় তাÐব চলছিল তখন আট বছরের একটি শিশু থর থর করে ভয়ে কাঁপছিল। তাঁর নাম শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য। একটা নয় দুইট নয়, দু’চার, দশটাও নয় দুই নরাধম পিশাচের চেয়েও ভয়ংকর আক্রোশে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে বঙ্গবন্ধুর বিশাল মাপের বুকটা ঝাঁঝরা করে দেয়। এ বীভৎস চিত্র দেখে ছোট শিশুটি বুক চাপড়িয়ে আহাজারিরত মায়ের হাত ধরে বিড়াল ছানার মতো মুখ লুকোবার জন্য মায়ের আঁচল খুঁজছিল। সে মুহূর্তে খুনিরা তার সামনেই তাঁর প্রিয় মাকে হত্যা করে। নিজের চোখের সামনে বাবা-মায়ের স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা মুখ ছোট শিশুটির মনে কী ধরনের রেখাপাত করেছিল তা ভাববার বিষয়। বাপ-মা হারা শিশুটিকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন পুলিশ অফিসার অনেক অনুনয় করেছিল। বিনিময়ে তারও ভাগ্যে জুটেছিল ব্রাশ ফায়ার।
মাকে হারিয়ে মায়ের ক্ষতবিক্ষত শরীরের ওপর লুটিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল রাসেল। জল্লাদেরা তাকে টেনেহিঁচড়ে মা’র কাছ থেকে আলাদা করলে, রাসেলের মুখে করুণ আকুতি ঝরে পড়ল, “আমাকে মেরো না, আমি কোন অন্যায় করিনি।” কিন্তু ঘাতকের কর্ণকুহরে জাতির জনকের এ মাসুম শিশুটির আবেদন পৌঁছাল না। কারণ তারাতো মানুষ ছিল না-ছিল পিশাচ।
এরপর রাসেল এক দৌড়ে বড়ভাবী সুলতানা কামালের কাছে আশ্রয় নেয়। সুলতানার পাশে ছিলেন ছোটভাবী রাজিয়া। তাঁরা দু’জনই মাসুম শিশুটিকে বুকে আগলে রেখে তাকে রক্ষার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালান। কিন্তু ঘাতকেরা কাউকেই ছাড়বে না। এক এক করে সবাইকে সরিয়ে দেবে এ পৃথিবী থেকে। তার পরক্ষণেই তারা বঙ্গবন্ধু দুই পুত্রবধুকে একত্রে হত্যা করে। একের পর এক মৃত্যুর মিছিল আর বিভীষিকায় হতবিহŸল রাসেল এবার ঠাঁই খুঁজে বেড়ায় বাড়ির কাজের লোকজনের কাছে। বাড়ির লোকজনকে জড়িয়ে কান্নারত রাসেলকে টেনে অন্যত্র নিয়ে যায় একজন মেজর। আট বছরের একটা শিশুর প্রাণ বধের জন্য উপরে তুলে একটা আছাড় অথবা বন্দুকের একটা সজোরে গুঁতো কিংবা বেয়নেটের একটা খোঁচাই তো যথেষ্ট। কিন্তু না, তারা এ অবুঝ শিশুটাকে এতো বেশি ভয় পাচ্ছিল, যদি না শিশুটি কোন রকমে বেঁচে যায় তাহলে তো তাদের সাত-পুরুষের ভিটেয় ঘুঘু চড়বে। তাই তারা মরিয়া হয়ে উঠে বাংলাদেশের ভাবীকালের যীশু নিধনে। তারা এ কচি প্রাণটার ওপর (যে প্রাণ মৃত্যুর মিছিলে আগেই একাকার হয়ে গেছে) একটা, দুইটা নয়, বেশ ক’টা গুলি চালায। মুহূর্তে ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশুটি জান্নাতের সিঁড়ি বেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসে পৌঁছে যায়।
কী দোষ ছিল এ মাসুম শিশুটির। কী দোষ ছিল বাংলার বুক তাঁর প্রিয়তম পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। একটি স্বাধীন ভূ-খÐ, একটি লাল-সবুজের পতাকা, একটি আলাদা পরিচয়, একটি জাতীয় সংগীত ও সর্বোপরি একটি সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার পুরস্কার কী এই বুলেট? পুত্রের সামনে পিতাকে অমানবিক ও বর্বরোচিত কায়দায় হত্যা। একজন মানুষের প্রাণস্পন্দন থামিয়ে দিতে কয়টা গুলি প্রয়োজন? আজ বড় প্রয়োজন এ সব নিয়ে ভাববার, আজকের প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐ নিয়ে যতই বিচার বিশ্লেষণ করবে তাতে করে খুব সহজে স্বাধীনতার আসল শত্রæর মুখোশ আমাদের চোখের সামনে স্বচ্ছ আয়নার মতো প্রতিভাত হবে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক