নিঃশব্দে নীরবে বইছ কেন?

17

মুশফিক হোসাইন

প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকার এই গানটি মনে পড়ে গেল। আসলে ফেবুকে বিখ্যাত গায়িকা শাকিরার কণ্ঠে ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দিতে শুনে বিমোহিত হলাম। তরুণ বয়সে গত শতাব্দির সত্তরের দশকে এই গানটি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। তা ছিলো তারুণ্যের উন্মাদনা। কিন্তু এবার শাকিরার কণ্ঠে গানটি শুনে তার ভাবার্থ নতুন করে খুঁজে পেলাম। আসলে বয়স মানুষকে নানাভাবে শিক্ষা দেয়। তারুণ্যে যা বুঝেছি প্রৌঢ়ত্বে এসে ঠিক তার উল্টোটাই হৃদয়ঙ্গম করলাম। এ হচ্ছে অভিজ্ঞতার নির্যাস। প্রবীণরা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বলেই তাদের কথা তুনের মতো ধাপিত হয়। একারণেই হয়ত উন্নত বিশ্বে প্রবীণদের এতো মর্যাদা। যাই হোক পাঠকদের গানটি পড়ার সুযোগ করে দেই; বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনতেও/নিঃশব্দে নীরবেÑও গঙ্গা তুমি/গঙ্গা বইছ কেন?/—-নৈতিকতার স্খলন দেখেও/ মানবতার পতন দেখেও/ নিলর্জ্জ অলসভাবে বইছ কেন? সহস্র বরষার/ উন্মাদনার/ মন্ত্রলয়ে লক্ষজনেরে/ সবল সংগ্রামী আর অগ্রগামী/ করে তোলো না কেন/ এই গানের মূল বাণী এখানেই প্রতিভাত হচ্ছে। এটা শুধু নদীর কথা নয়। নদী হচ্ছে গতিশীল একটি সত্তা। তারুণ্যকে গতিময় সত্তা মনে করা হয়। আজ বাংলাদেশের তারুণ্য যে গতিহারা। গতিময় গঙ্গা যেমন লক্ষ জনকে সবল, সংগ্রামী আর অগ্রগামী করে তোলে না, তেমনি দেশের ক্রান্তি তরুণরাও নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের ব্যাপক জনগণকে পরিচালিত করতে পারছে না, তারা আজ যেন পথহারা। এর পেছনে একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয়। বাংলাদেশে এখন এমন কোন খাত নেই যা দুর্নীতি মুক্ত। দুর্নীতির সর্বগ্রাসী হাত আজ সমাজকে কলুষিত করে রেখেছে। দেশের স্বাস্থ্য তার অন্যতম। এ খাতের চরম নৈতিকতা ও মানবতার পতন দেখেও সবাই নির্বিকার।
গঙ্গার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বের নদীগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। বিশ্বের পানি কমিশনের এক জরিপে জানা যায় যে, “বিশ্বের পঞ্চম ভাগেরও বেশি প্রধান নদ-নদী দূষিত ও রিক্ত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় বিষাক্ত করে তুলছে চারপাশের পরিবেশ। যা কয়েক কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও নদীর প্রতি এ দেশের মানুষের ভালোবাসা ও মমতার ঘাটতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ থেকে ৬০/৭০ বছর আগেও নদীর প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসা লক্ষ্যণীয় ছিল। কোন কোন সম্প্রদায় নদীকে সম্মান করে পূজো করতো। এখন হয়ত কেউ কেউ করে। তবে তা এখন আচার সর্বস্ব। মহান আল্লাহ্তায়ালা পবিত্র কোরআনে বারবার বলেছেন; বেহেস্তবাসীগণ যেখানে থাকবে, তার নিচে প্রবাহিত সুমিষ্ট পানির ধারা। এতে আল্লাহ্্পাক নদীর প্রতি মানুষের মমত্ব প্রকাশের কথাই নির্দেশ দিচ্ছেন। কখনও বা নদীর আচরণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, একথা সত্য যে, নদী মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ। আদি মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছিল মিসরের নীল নদের তীরে ।
ইতিহাস ও প্রতœতত্ত¡বিদরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর সকল সভ্যতা বিভিন্ন নদী অববাহিকায় গড়ে উঠেছে। প্রাচীন ভারত উপমহাদেশের মহেঞ্জেদারো ও হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদ অববাহিকায়। আমাদের চট্টগ্রামের হাজার বছরের সভ্যতা ‘কর্ণফুলি’ অববাহিকা ঘিরে। অথচ হালের কর্ণফুলির দিকে তাকালে মনটা বিষন্ন হয়ে যায়। পলি আর পলিথিনের স্তর জমে এই নদী ভরাট ও ছোট হয়ে আসছে।
তাহলে কি আমরা জাতি হিসাবে ‘নদী বিমুখ’ এই পরিচয়ে আখ্যায়িত হবো? দেশের সকল নদীগুলো অবৈধ দখলদারেরা ভোগ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে জানা যায় বাংলাদেশে ৩০১টি নদী আছে। মনে হয় বাস্তবে তাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবৈধ দখলদারের করালগ্রাস থেকে এই নদীগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না। দেশে আইন আছে। নদী নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় আছে। তারপরও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। আসলে যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষের নৈতিকতা অধপতিত হলে, সেখানে আইন বা রায় বাস্তবায়ন করা কঠিন বৈকি?
অবৈধ দখলের কারণে নদীর পানি প্রবাহ যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি নদীও শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে নদী দূষিত হওয়ার কারণে নদী মরে যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, বিগত ৫৭ বছরের বাংলাদেশের ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে কিছুদিন পরপর রক্ষার অঙ্গীকার করে থাকে।
নদী বাঁচাতে মামলায় আদালত থেকে নানান পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশনা দেয়া হয়। নদী রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ফলাও করে উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদও প্রচার হয়ে থাকে। বছরজুড়ে এ সংবাদ শোনা গেলেও বাস্তবে তার সুফল চোখে পড়ে না। বরঞ্চ দেখা যায় ক্ষমতার আশীর্বাদে দখল ও দূষণ শেষ পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্যই থেকে যায়। ফলে নদী রক্ষার জন্য উচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রæতি কথার জালে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাস্তবায়িত হয় না সকল অভিযান ও নদী রক্ষার স্মরণ। ফলে নদীগুলো মরে শুকিয়ে যায় দিনে দিনে। খরস্রোতা নদীগুলো রবি ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’র মতো কৃষকায় হয়ে ধু ধু বালিয়াড়ির স্মৃতি বহন করে থাকে। কবিতাটি এ সুযোগে পাঠ করা যাক; “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু, পার হয়ে গাড়ি,/ আমাদের নদীগুলোতে এখন হাঁটু জল থাকে। পার হয় মানুষ, গরু, গাড়ি। তার বুকে চিকচিক বালুরাশি। এভাবে নদীগুলো মরে মরে একদিন বাংলাদেশ মরুভূমিতে রূপান্তরিত হলে আশ্বর্য্য হওয়ার কিছু নেই।
বাংলাদেশের উজানে ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান। ঐ সকল দেশে অর্থাৎ উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে তারা পানি ছেড়ে দেয়। ফলে প্রায় প্রতি বছর ভাটির দেশ বাংলাদেশে বন্যা হয়। এ বন্যায় বাংলাদেশের হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীগুলোর উৎস ভারতে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। যেগুলোর অধিকাংশ সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। ভৌগলিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ভারত এসব নদ-নদীর উজানে বাঁধ এবং তীর বরাবর ত্রোয়েন নির্মাণ করেছে। ফলে ভাটিতে শুষ্ক মৌসুম পানি সংকট দেখা দেয়। আবার ভারী বৃষ্টি হলে নির্বিচারে পানি ছেগে বন্যার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের বন্যা এবং সাম্প্রতিক বন্যা এ কারণেই সৃষ্টি। উজান থেকে নদীর পানি ভাটিতে ধাবিত হয়ে ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে ভারত বাংলাদেশের উজানে হওয়ার বাংলাদেশের নদী ভাঙ্গনের সুবিধা তারা ভোগ করে। বাংলাদেশের ভাটিতে নদী ভাঙ্গলে ভারতের উজানে জেগে ওঠে চর। ফলে সীমান্ত এলাকায় নদীগুলোর জমি হারাচ্ছে। ফলে সংকুচিত হচ্ছে বাংলাদেশের আয়তন। এক তথ্যে জানা যায়, গত পঞ্চাম বরে প্রতিবেশি ভারতের কাছে প্রায় ৩ হাজার একর ভূমি হারিয়েছে। (সূত্র, মিজানুর রহমানের পত্রিকা : নদী সংখ্যা)।
১৯৬৩ হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৫৭ বছরে বাংলাদেশের নদ-নদীর সংখ্যা কতো কমলো, তার পরিসংখ্যান চলে। এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা ২০১০ সালে প্রকাশ করে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরাম, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল বিভাগের একদল গবেষক এই তালিকা তৈরির সাথে যুক্ত ছিলেন। তাতে বলা হয় দেশের ১১৫টি নদ-নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায়। অন্যদিকে নদী পানি ও প্রকৃতি নিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণ। উত্তরণের সমীক্ষা অনুযায়ী গত বিশ বছরে ২০০০-২০২০ জানুয়ারি দেশে ৪৩টি নদী শুকিয়ে গেছে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও নদীতে নানা অবকাঠামো নির্মাণ ও দখলের কারণে নদীর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।
২০১৯ সালের পহেলা জুলাই বাংলাদেশের নদ-নদীর জন্য বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ঐতিহাসিক একটি রায় প্রদান করে। ২৮৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে দেশের নব নদী এখন “জীবন্ত সত্তা”। রায়ে নদীর ক্ষতি করাকে ফৌজদারী মামলার অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সকল নদীর অভিভাবক হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এই রায়ে দেশপ্রেমিক, নদীপ্রেমিক, প্রকৃতি প্রেমিক এবং নদীকর্মীরা যাঁরা নদী বাঁচানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁরা উল্লসিত হয়েছিলেন। কিন্তু রায় ঘোষণার প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হলেও এই রায়ের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশের সব নদীগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যেমনি জরুরি কর্তব্য তেমনি নদী বিষয়ক দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা ও জরুরী। বাস্তবে আমরা কী সে দিকে এগুচ্ছি?
নদীগুলোর অবস্থা খুবই মর্মান্তিক। দখল ও দূষণে তার মৃত্যু প্রক্রিয়া তরান্বিত হচ্ছে। একটা সময় ছিলো, মানুষ নদীর পানি পান করতে এখন পানি পান করা দূরের কথা, শৌচকর্মের জন্যও অনেক নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় বুড়িগঙ্গা ও বালু নদীর নাম।
আমরা মনে করি চট্টগ্রামের কর্ণফুলি সেই ভাগ্য বরণ করতে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে। কর্ণফুলি নদীর আচরণকে মাথায় না রেখে নদীর উপর যে পদ্ধতিতে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। তাতে করে কর্ণফুলির বুকে প্রতিনিয়ত জমছে চর। অন্যদিকে অবৈধ দখলের কারণে খরস্রোতা কর্ণফুলি স্রোতহারা হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নদীর বুকে যে সকল বেসরকারি ঘাটগুলো ছিল, সেখানে এখন মালামাল ও যাত্রী পরিবহন করা যাচ্ছে না ভাটির সময়ে। পলি জমে একাকার। অন্যদিকে পলিথিনের যে স্তর নদীর বুকে জমেছে, তাতে করে নদীর ড্রেজিং প্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাণ কর্ণফুলিসহ দেশের সকল নদীর মরণ প্রক্রিয়া বন্ধে দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে অনতি বিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। বহু নদীকে জীবন্ত সভা ঘোষণা করে তাদের বাঁচানোর উদ্যোগ দেখা যায়। মহামান্য আদালত কর্তৃক দেশের নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার পরও অবহেলা, স্পষ্ট। দখল ও দূষণ রোধ করা না গেলে প্রকৃতি নিজেই তার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)