নারীর ক্ষমতায়ন: বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

50

 

বহুকাল ধরে সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীরা শোষিত নির্যাতিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় নিপীড়ন, বৈষম্য, ধর্মীয়-গোড়ামী, সামাজিক-কুসংস্কার ও শাসন-শোষণের কারায় অবদমিত করে রাখা হয়েছে নারীদের। মূল্যায়িত হয়নি নারীর মেধা ও শ্রম। গৃহস্থালি কাজ, সংসার ও পরিবার সামলানো ও সন্তান লালন-পালন কাজে নারীর অর্থনৈতিক অবদানকে কখনোই দেয়া হয়নি যথাযথ স্বীকৃতি ও করা হয়নি মূল্যায়ন। নারীরা দেশ-মাতৃকার কল্যাণেও রাখছেন অশেষ অবদান। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, ৫২’র ভাষা আন্দোলনে, ৬৯’র গণ-আন্দোলনে, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল অনন্য। দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য নারী-পুরুষের সমতা প্রতিবিধান জরুরি। লিঙ্গ-বৈষম্য বজায় রেখে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নতি কখনো সফল ও সার্থক হতে পারে না। সুষম-উন্নয়ন ও প্রগতির জন্য প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান্তরাল কর্মযোজনা। অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য নারীর ক্ষমতায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারীর ক্ষমতায়ন মূলত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবকাঠামোতে অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উপায়, যার মাধ্যমে নারীরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতাকে প্রকাশ করতে পারেন এবং নিজেদের অধিকারগুলো আদায়ে সচেষ্ট হতে পারেন। নারীর-ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন কোনও বাধা ছাড়াই নারীরা শিক্ষা, কর্মজীবন এবং নিজেদের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যবহারের সুযোগ পান। নারীর-ক্ষমতায়নই হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি। নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘ প্রথম-নারী সম্মেলনের বছর ১৯৭৫ সালকে ‘নারী-বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘ ১৯৭৬-১৯৮৫ সালকে ‘নারী-দশক’ হিসেবে ঘোষণা করে। যার লক্ষ্য ছিল সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি। ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নারী-সম্মেলনে ‘নারী-দশকের’ আওতায় আরো তিনটি লক্ষ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান অর্ন্তভুক্ত করা হয়। ১৯৯৪ সালের জাকার্তা ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনায় বলা হয় ক্ষমতার বন্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে তীব্র অসমতা বিদ্যমান। এই অসমতা ও সীমাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নিতে সরকারসমূহকে তাগিদ দেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে বেইজিং সম্মেলনে নারীর উন্নয়নে ১২টি ক্ষেত্র চিহিৃত হয়। এগুলো হলোঃ নারীর ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য; শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অসম সুযোগ; স্বাস্থ্যসেবার অসম সুযোগ; নারী নির্যাতন; সশস্ত্র সংঘর্ষের শিকার নারী; অর্থনৈতিক সম্পদে নারীর সীমিত অধিকার; সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতায় অংশগ্রহণে অসমতা; নারী উন্নয়নে অপর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো; নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন; গণমাধ্যমে নারীর নেতিবাচক প্রতিফলন এবং অপ্রতুল অংশগ্রহণ; পরিবেশ সংরক্ষণে ও প্রাকৃতিক সম্পদে নারীর সীমিত অধিকার এবং কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য। বিশ্বের অনেক দেশে এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্পদ ভোগের অধিকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য বিদ্যমান। নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করে কিন্তু মজুরি পায় কম। প্রতিটি দেশে দরিদ্র পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি। নারীরা ভোটাধিকার পেলেও অনেক দেশে সংসদ ও মন্ত্রী পরিষদে নারীর সংখ্যা খুবই নগন্য। নারী সাংসদ ল্যাটিন-আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ২৩শতাংশ; সাব-সাহারান আফ্রিকান অঞ্চলে ১৯শতাংশ; মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ১২শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার মাত্র ৮শতাংশ। নারীর প্রতি সহিংসতা এখন বিশ্বের প্রধান মানবাধিকার সমস্যা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (২০০৮) এক রিপোর্ট মতে, প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে একজন শৈশবে যৌন-নির্যাতনের শিকার হয়। ৪শতাংশ থেকে ১২শতাংশ নারী গর্ভকালীন শারিরীক-নির্যাতনের শিকার হয়। যৌন-নির্যাতনের শিকার হয় ১৫শতাংশ থেকে ৭১শতাংশ নারী। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫হাজার নারী নিজ পরিবার কর্তৃক হত্যার শিকার হয়। ১০শতাংশ মেয়েশিশু হারিয়ে বা পাচার হয়ে যায়, ২১শতাংশ মারা যায় প্রজননকালীন সময়ে আর ৩৮শতাংশ মারা যান ৬০বছর বয়সের আগেই। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০শতাংশই নারী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি নারীদের ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ। ১৯৬৭ সালে মহিলা-লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নারীদের মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন সুসংহতকরণে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে এবং রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়। ৬৫(২) অনুচ্ছেদে ৩০০আসনে আবার নারীর সরাসরি অংশগ্রহণেও কোনো বাধা রাখা হয়নি। দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে শর্ত রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ১৯(৩)অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে মর্মে অঙ্গিকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নারীর-ক্ষমতায়নে গৃহিত কার্যক্রম প্রশংসিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশে^র রোল-মডেল যার স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউএন উইমেন ‘প্লানেট ৫০:৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম ‘এজেন্ট অফ চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড -২০১৬ লাভ করেন। শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অভাবনীয়।
নারীদের সমান সুযোগ তৈরীর জন্য ২০১১ সালে জাতীয় নারী-নীতি প্রণীত হয়। তারই আলোকে বর্তমানে নারীরা উদ্যোক্তা হয়ে ব্যবসা করছেন; সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, নিরাপত্তাবাহিনীতে, শিক্ষা ও শিল্প-সাহিত্যে, সাংবাদিকতা, শিল্পকলকারখানা, কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, বিচার-বিভাগে পেশাগত দায়িত্বপালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিমন্ডলেও নিজেদের মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। দেশ ও জাতি গঠনে, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এবং দেশের উন্নয়নে নারীরা অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। তবে এই সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়। তাই প্রান্তিক পর্যায়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক