নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন এটিই হোক আগামী সব নির্বাচনের মডেল

9

 

গত ৮ মাস ধরে সারা দেশে কয়েক ধাপে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিত্ব স্তর ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এসব নির্বাচনের আগে-পরে এবং নির্বাচনকালীন সংঘাত-সংঘর্ষ ও খুনাখুনির ঘটনা শুনতে শুনতে সাধারণ মানুষ যখন তিক্ত-বিরক্ত তখন নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচন আশার আলো দেখালো। স্বস্তি ও শান্তির আবহে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনকে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনের এক সদস্য সর্বোত্তম নির্বাচন বলে অভিহিত করলেন। নির্বাচনে কে জিতল সেটা বড় কথা নয়, বরং ভোটারগণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারাটাই বড় কথা। সম্প্রতি ইউনিয়ন ও পৌরসভার নির্বাচনী সংস্কৃতি দেখে সকলের মধ্যে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও অভিযোগ ও আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সব শঙ্কা-সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণ করে সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অত্যন্ত সুন্দর, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। করোনা ভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ’র আতঙ্কের মধ্যেও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল লক্ষ্য করার মত। কোথাও উল্লেখ করার মতো কোনো গোলযোগ দেখা যায়নি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক এবং বেশ কিছু বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছিল এটি। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভী নৌকা প্রতীক নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৫৯ হাজার ৯৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার। তিনি ভোট পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৬৬ ভোট। তৈমুর আলম খন্দকার একসময় বিএনপির শীর্ষ নেতা ছিলেন। এ নির্বাচন করতে গিয়ে দল থেকে বহিষ্কার হন। আমরা জানি, আর দুই বছর পর জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচনটি নানা দিক থেকেই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের জনপ্রিয়তা বিবেচনার একটি মাপকাঠিও হতে পারে এই নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দল ভালোভাবেই সেই পরীক্ষায় উতরে যেতে পেরেছে নিঃসন্দেহে। আইভীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও এ ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকারকে এবার দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তিনি দলের অমতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। দল তাঁর বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছে। তাই দলের অনেক নেতাকর্মী তাঁর পক্ষে কাজ করলেও এটি বিএনপির দলগত নির্বাচন ছিল না। অ্যাডভোকেট তৈমুর অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনিক চাপ ও ইভিএমে কারচুপির কারণেই তাঁর পরাজয় হয়েছে।
কি জাতীয়, কি স্থানীয় প্রায় সব নির্বাচনেই বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ থাকে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে যেমন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকে, তেমনি অভিযোগ থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধেও। অভিযোগ থাকে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়েও। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে এমন অভিযোগ নেই বললেই চলে। এতে প্রমাণিত হয়, আমাদের নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন আন্তরিক হলে অনেক ভালো নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। অবশ্য এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্ব›দ্বী পক্ষগুলোর সদিচ্ছা এবং গণতান্ত্রিক আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রেই দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। নারায়ণগঞ্জে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের কাছ থেকে আমরা প্রত্যাশিত আচরণই পেয়েছি। নির্বাচনের কয়েকদিন পর ডা. সেলিনা হায়াত আইভি পরাজিত প্রতিদ্বন্ধি তৈমুর আলম খন্দকারের বাড়িতে গিয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের একটি উত্তম কর্মকে পুরুজ্জীবিত করেছেন। আমরা তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। এটিই হোক আগামী সব নির্বাচনের জন্য মডেল। বিজয়ের পর সেলিনা হায়াত আইভী বলেছেন, দলীয়ভাবে নির্বাচন করলেও তিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নারায়ণগঞ্জবাসীর সেবা করতে চান, সব মানুষের জন্য কাজ করতে চান। এটাই হওয়া উচিত একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধির অঙ্গীকার। আমরা আশা করি, অতীতের দুই মেয়রদের মতোই তৃতীয় মেয়াদেও তিনি নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবেন। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করে নারায়ণগঞ্জকে তিনি আরো আধুনিক, মাদক, সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ ও সমৃদ্ধ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। নবনির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকে উষ্ণ অভিনন্দন।