নামাজে জানাজার গুরুত্ব

18

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

প্রত্যেক মুসলমানের জানাজার নামাজ আদায় করা জীবিতদের ওপর কর্তব্য। প্রসিদ্ধ ফিকাহবিদদের মতে নামাজে জানাজা ফয়জে কিফায়া। জীবিতদের পক্ষে যে কেউ এ নামাজ আদায় করলে সকলের পক্ষে আদায় হয়ে যাবে। যদি কেউ আদায় না করলে সকলে গুনাহগার হবে। ( ফতোয়ে আলমগীরী)
যারা মৃত্যুর খবর পাবে তাদের মধ্যে হতে মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের লক্ষ্যে নামাজে জানাজা আদায় করবে। কোন ব্যক্তি যদি এ নামাজ একাও আদায় করে তবে ফরজে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী)
এ নামাজের মূলস্তম্ভ দু’টি চার তাকবীর উচ্চারণ করা এবং দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা। (নুরুল ইজাহ)
পাঁচওয়াক্ত ফরজ নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য যে সকল শর্ত জানাজার নামাজের ক্ষেত্রেও এসবই প্রযোজ্য। কিন্তু এ নামাজে ওয়াক্ত শর্তটি প্রযোজ্য নয়। নিষিদ্ধ সময়ে জানাজার নামাজ পড়া যাবে না। করু, সিজদা, কাওমা, বৈঠক, জলসা ও আত্তাহিয়্যাত এ নামাজে নেই।
দৈনিক পাঁচওয়াক্ত নামাজের জামাতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারার আশংকা থাকলেও তায়াম্মৃম করার বিধান নেই। কিন্তু জানাজার নামাজে এ ক্ষেত্রে তায়াম্মৃমের বিধান আছে।
জানাজার নামাজে অনেক ব্যক্তিকে আমারা দেখতে পাই জুতোর উপর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছে। জুতোরতলা পাক না হলে নামাজ বৈধ হবে না কারণ নামাজের জন্য স্থান পাক হওয়া শর্ত।
এ নামাজের আটটি শর্ত কিতাবের মধ্যে পাওয়া যায়।
(১) মৃত ব্যক্তি মুসলমান হওয়া (২) মৃত ব্যক্তির শরীর ও কাফন পাক হওয়া (৩) সতর ডেকে রাখা (৪) মৃতের লাশ মুসল্লিয় সম্মুখে রাখা (৫) লাশে অর্ধেক অংশের বেশী উপস্থিত থাকা (৬) ভূমির উপর লাশ রাখা (৭) ঈমাম রালেগ হওয়া (৮) ঈমাম লাশের কোন অংশের বরাবরে দাঁড়ানো।
কোন মুসলমানকে যদি বিনা জানাজায় কবর দেওয়া হয়, তাহলে কবরের উপরই তার জানাজার নামাজ আদায় করবে। যতদিন পর্যন্ত লাশ অক্ষত থাকবে মনে করা হবে ততদিন নামাজ আদায় করতে পারবে। (ফাতাওয়া ও মাসাইল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)
লাশের সংখ্যা একাদিক হলে একসাথে এক জমাতে নামাজ আদায় করা যায়। এক্ষেত্রে ঈমাম সাহেব উত্তম ব্যক্তির (মৃতদেহ) বরাবরে দাঁড়াবে। (প্রাগুক্ত)
জানাজার নামাজের একটি মাত্র ওয়াজিব তা হলো দুইদিকে সালাম ফিরানো। চারটি সুন্নাতের কথা ফিকাহর কিতাবে উল্লেখ আছে। (১) ঈমাম সাহেব মৃত ব্যক্তির বুক বরাবর দাঁড়ানো (২) প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়া (৩) দ্বিতীয় তাক্বিরের পর দরুদ শরীফ পাঠ করা (৪) তৃতীয় তাক্বিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা।
জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম হলো, নামাজের নিয়ত করে কান পর্যন্ত হাত তুলে আল্লাহু আকবর তাকবির বলে দু’হাত নাভীর নিচে বেঁধে নিম্নোক্ত সানা পাঠ করবে ‘সুবহানাকা আল্লাহুমা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তা আলা জাদ্দুকা ওয়া জাল্লা সানাউকা ওয়া লা ইলাকা গাইরুকা’। অতঃপর হাত আর না তুলে তাক্বির উচ্চারণ করে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করবে। এরপর আবার তাক্বির উচ্চারণ করে সকল ঈমানদার জীবিত মৃত্যুর ব্যক্তিবর্গের পাপ মার্জনার লক্ষ্যে দোয়া মাছুরা পাঠ করবে ‘আল্লাহুম্মাগফিব লিহায়্যেনা ওয়া মাইয়্যেতে না ওয়া শাহেদেনা ওয়া গায়েবেনা ওয়া ছাগীরেনা ওয়া কবিরে না ওয়া যাকেরেনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহ ইয়াইতাহু মিন্না ফা আহয়িহী আলাল ইসলাম ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিল্লা ফাতাওয়াফফাহু আলাল ঈমাম’।
দোয়া পাঠের পর চতুর্থ তাক্বির উচ্চারণের সাথে সাথে ডাকদিকে অতঃপর বামদিকে সালাম ফিরাবে। মনে রাখতে হবে একজন মানুষের একবারই জানাজার নামাজ পড়া যায়। এটি হানাফী মাজহাবের সিদ্ধান্ত। মৃত ব্যক্তির অলীর অনুমতি ছাড়া যদি নামাজে জানাজা আদায় করে তবে তলীর জন্য পুনরায় জানাজা পড়ার অনুমতি রয়েছে। অলী নামাজ পড়ার পর আর কোন জানাজার বৈধতা নেই। আজকাল একব্যক্তির যেভাবে একাধিক জানাজার নামাজ পড়া হয় তা জায়েজ নেই।
আমাদের সমাজে আরেকটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে স্ত্রী মারাগেলে স্বামী স্ত্রীর লাশ দেখতে পারবে না। এ ধারণাটি সঠিক নয়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী তার স্ত্রীর লাশ দেখা খাট বহন করা ও খাট কাঁধে নেওয়া জায়েজ আছে। কিন্তু লাশ স্পর্শ করা বা চুম্বন করা নিষেধ। (দুররুল মুখতার)
গায়েবানা জানাজা পড়া একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে প্রচলিত আছে। এই নামাজের কোন ভিত্তি নেই। হযরত ঈমাম আবু হানিফা (রা.) এবং হযরত ঈমাম মালেক (রা.) মত অনুসারে জানাজার নামাজ বৈধ হওয়ার জন্য মৃত ব্যক্তির লাশ ঈমামের সামনে উপস্থিত থাকা শর্ত। অনুপস্থিত মাইয়োতের জন্য দোয়া করা যায় কিন্তু জানাজার নামাজ পড়া বৈধ নয়। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দূর দূরান্ত অনেক সাহাবীর ইন্তেকালের সংবাদ আসতো। নবীজী তাদের জন্য শুধু দোয়াই করতেন, গায়েবানা নামাজ পড়তেন না। এ নামাজ বৈধ হলে অনেক সাহাবী এবং শহীদদের বঞ্চিত করতেন না তিনি। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও কোন গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হায়াতে জিন্দেগীতে শুধু মাত্র দুইবার গায়েবানা নামাজে জানাজা পড়েছেন বলে হাদিসে উল্লেক রয়েছে। এদু’টি ঘটনা ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই। ব্যতিক্রম ইসলামের আইন হতে পারে না।
যে দুই ব্যক্তির গায়েবানা জানাজা তিনি পড়েছিলেন তাদের একজন হাবশার বাদশাহ নাজজাশী অপর জন হযরত মু’আবিয়া ইবনে মু’আবিয়া (রা.)। এদু’টি ঘটনা নবীজীর কাছে বিশেষ ভাবে অনুমতি দিল। বিশেষ ঘটনা আমল যোগ্য নয়। তাই সাহাবায়ে কেরামও আমল করেননি।
এদু’টি মৃত ব্যক্তির লাশ আল্লাহ পাক বিশেষভাবে নবীজীর সামনেই হাজির করেদিলেন বলে একটি মত প্রতিষ্ঠিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, নাজজাশী বাদশাহ’র লাশ এবং নবীজীর মধ্যবর্তী সকল অন্তরায় তুলে দেওয়া হয়েছিল। লাশ মহানবী (দ.) স্বচক্ষে দেখেই জানাজার নামাজ পড়েছিলেন। (ওয়াহিদী ও আস্বাবুন নুজুল)
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) বলেন, এসময় প্রিয় নবী (দ.)’র পেছনে সাহাবীগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন সকল সাহাবী (রা.)’র বিশ্বাস ছিল যে নাজজাশীর লাশ তাঁর সামনেই ছিল। (ইবনে হিব্বান)
হযরত মু’আবিয়া ইবনে মু’আবিয়া (রা.)’র বিষয়টিও ছিল অনুরূপ। তিনি যখন মদীনা শরীফে ইন্তেকাল করেন তখন প্রিয় নবী (দ.) ছিলেন তাবুক নামক স্থানে। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হযরত জিব্রাইল (আ.) হাজির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! মু’আবিয়া ইব্নে মু’আবিয়া ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর জানাজার নামাজ আপনি পড়তে চান ? নবীজী বললেন, ‘হ্যাঁ’। অতঃপর জিব্রাইল (আ.) নিজের পাখা সঞ্চালন করেন। তুলে ধরেন তাঁর লাশ মোবারক। মহানবী (দ.) লাশের দিকে থাকিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করেন। প্রিয় নবী (দ.)’র পিছনে দু’কাতার ফেরিস্তাও ছিল। প্রতি কাতারে ফেরেস্তার সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। (তাবরীন, বায়হাকী)
লাশ হাজির থাকলে জানাজা গায়েবী হয় না এবং এ দু’টি ঘটনা ছিল মহানবী (দ.)’র মোজেজারই অংশ।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক