নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক আবির্ভাব

10

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, নীল আসমান, গাছপালা, তরুলতা, ফুল-ফল, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়, ঝর্ণা আর হাজারো নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী যাঁর উসিলায় সৃজিত; তিনিই আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
বেলাদত বা জন্ম প্রত্যেক মানুষের জন্যই খুশি ও আনন্দের পরিচায়ক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জন্মদিনের একটি নির্দিষ্ট গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায়। আর এই গুরুত্ব সে সময় আরও বেড়ে যায় যখন সে দিনগুলোর সম্পর্ক আম্বিয়া আলাইহিমুস্সালাম-এর সাথে হয়। আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্ম আসলেই আল্লাহ তাআ’লার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এবং সৃষ্টির জন্য সকল প্রকার নেয়ামতের উৎস। তাঁদের ওসীলায় আসমানী হেদায়েত, নিয়ামত, নুযুলে কোরআন, মাহে রমযান, জুমা, দুই ঈদ ইত্যাদি নেয়ামতরাজি আমরা পেয়েছি।
তাই হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় বেলাদতের উপর খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা ঈমানের আলামত এবং স্বীয় পথপ্রদর্শক নবীয়ে মুকাররাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেলাদতের বর্ণনা দিয়েছেন পবিত্র কুরআনে, ‘আমি এই শহরের (মক্কা) শপথ করছি, (হে হাবীব!) এ জন্য যে, এই শহরে আপনি তশরীফ আনায়ন করেছেন। হে হাবীব! আপনার পিতার [হযরত আদম আলাইহিস সালাম অথবা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের] শপথ এবং (তাদের) শপথ, যারা জন্মগ্রহণ করেছে।’ (সূরা বালাদ : আয়াত ১-৩)।
হযরত আমিনা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার গর্ভে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকাকালে তাঁর মা হযরত আমিনা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর উদর থেকে এমন একটি আলোকরশ্মি প্রকাশিত হলো যা দিয়ে তিনি সিরীয় ভূখÐের বুসরার প্রাসাদসমূহ দেখতে পেলেন। (আহমদ-৩৯৫)
হযরত আমিনা বলেন, অতঃপর তিনি গর্ভে বড় হতে লাগলেন। আল্লাহর কসম, এত হালকা ও সহজ গর্ভধারণ আমি আর কখনো দেখিনি। যখন তাঁকে প্রসব করলাম তখন মাটিতে হাত রাখা ও আকাশের দিকে মাথা উঁচু করা অবস্থায় তিনি ভূমিষ্ঠ হলেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মা হযরত আমিনা বিনতে ওয়াহাব বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্ভে আসার পর তাঁর কাছে কোন এক অপরিচিত আগন্তুক আসেন এব্ং তাঁকে বলেন, “তুমি যাঁকে গর্ভে ধারণ করেছ, তিনি মানব জাতির মুক্তিদাতা। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন তখন তুমি বলবেঃ সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এই শিশুকে এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অতঃপর তাঁর নাম রাখবে মুহাম্মাদ।” (দালায়েলুন নাবুয়্যাহ-৩৩)
হযরত আমিনাকে স্বপ্নযোগে ধারাবাহিক সুসংবাদ : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় আবির্ভাবের পূর্বেই হযরত আমিনাকে ধারাবাহিকভাবে মোবারক স্বপ্নে সুসংবাদ জ্ঞাপন করা হয়। তিনি বলেন, যখন আমি আমার প্রাণপ্রিয়কে রজব মাসে গর্ভে ধারণ করি তখন লাবণ্যময় চেহারা বিশিষ্ট সুঘ্রাণে ভরপুর এক আলোকোজ্জ্বল ব্যক্তি আমার কক্ষে প্রবেশ করে বলেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে স্বাগতম। আমি প্রশ্ন করলাম: আপনি কে? তিনি বললেন, আমি মানব জাতির পিতা হযরত আদম। আমি বললাম, আপনার অভিপ্রায় কি? তিনি বললেন, হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনি মূলতঃ ধারণ করেছেন সাইয়্যিদুল বাশার এবং রবিয়া ও মুদার গোত্রের ফখরকে। দ্বিতীয় মাসে (শাবান) হযরত শীশ আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ধারণ করেছেন রহস্যের উন্মোচক এবং জাওয়ামিউল কালিমের ধারককে।”তৃতীয় মাসে (রমযান) হযরত ইদ্রীস আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। নিশ্চয় আপনি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সর্দারকে ধারণ করেছেন।”চতুর্থ মাসে (শাওয়াল) হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। নিশ্চয় আপনি ধারণ করেছেন সাহায্য ও বিজয়ের অধিকারীকে।”পঞ্চম মাসে (জিলক্বদ) হযরত হুদ আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি ধারণ করেছেন প্রতিশ্রুত দিবসের শাফায়াতে উযমার অধিকারীকে।”ষষ্ঠ মাসে (জিলহজ্জ্ব) হযরত ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি ধারণ করেছেন মহাসম্মানিত নবীকে।”সপ্তম মাসে (মহররম) হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি ধারণ করেছেন সবিশেষ লাবণ্যময় নবীকে।”অষ্টম মাসে (সফর) হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি ধারণ করেছেন কুরআনুল কারীমের ধারককে।”নবম মাসে (রবিউল আওয়াল) হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এসে বললেন, “হে হযরত আমিনা! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি ধারণ করেছেন সম্মানিত নবী ও মহিমান্বিত রাসূলকে। আপনার থেকে দূর হয়ে গেল সব প্রকার দুঃখ-কষ্ট রোগ-যন্ত্রনা।” (আন নি’মাতুল কুবরা আলাল আলাম, ইবনে হাজার হায়সামি)
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক আবির্ভাব : মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার আসহাবে ফীল (হস্তী বাহিনী)’র কাবা ঘর আক্রমণের বছর। কায়েস ইবনে মাখরামা বলেন, “আমি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবরাহার হামলার বছর জন্মগ্রহণ করি। তাই আমরা সমবয়সী”। (দালায়েলুন নাবুয়্যাহ-৪৬)
হযরত হাসসান ইবনে সাবিত বলেন, “আমি তখন সাত/ আট বছরের বালক হলেও বেশ শক্তিশালী ও লম্বা হয়ে উঠেছি। যা শুনতাম তা বুঝতে পারার ক্ষমতা তখন আমার হয়েছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম জনৈক ইহুদী ইয়াসরিবের (মদীনার) একটা দূর্গের ওপর উঠে উচ্চস্বরে, ওহে ইহুদী সমাজ!’ বলে চিৎকার করে উঠলো। লোকেরা তার চারপাশে জমায়েত হয়ে বললো, তোমার কী হয়েছে?” সে বলল, আজ রাতে সেই নক্ষত্র উদিত হয়েছে।” (সীরাতে মোগলতাঈ পৃঃ ৫।)
মহান আল্লাহ পাক হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের বংশধর কিনানা গোত্রকে বাছাই করেন এবং কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশ বংশের হাশিমের সবচয়ে প্রভাবশালী ও উত্তম ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ও হযরত মা আমেনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার ঘরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম লাভ করেন।
নবীজির শুভাগমনকালীন অবস্থা : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন এমন কিছু আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল যা সচরাচর দেখা যায় না। হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, যখন আমার প্রসব ব্যাথা শুরু হয়তখন ঘরে আমি একা ছিলাম এবং আমার শশুর হযরত আব্দুল মোত্তালিব ছিলেন কা’বা ঘরে তাওয়াফরত। আমি দেখতে পেলাম, একটি সাদা পাখির ডানা আমার বুকেকী যেন মালিশ করছে। এতে আমার ভয়ভীতি ও ব্যথা-বেদনা দূরীভূত হয়ে গেল। এরপর দেখতে পেলাম এক গøাস শ্বেতশুভ্র শরবত আমার সামনে। আমি ঐ শরবতটুকু পান করলাম। অতঃপর একটি উর্দ্ধগামী নূর আমাকে আচ্ছাদিত করে ফেললো। এ অবস্থাদেখতে পেলাম, আবদে মানাফ (কোরাইশ) বংশের মহিলাদের চেহারা বিশিষ্ট এবং খেজুর বৃক্ষের ন্যায়দীর্ঘাঙ্গিনী অনেক মহিলা আমাকে বেষ্টন করে বসে আছেন। তাঁদের একজন বললেন, আমি ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া। আরেকজন বললেন, আমি ইমরান তনয়া বিবি মরিয়ম এবং আমাদের সঙ্গীনীগণ হচ্ছেন বেহেস্তি হুর। আমি আরো দেখতে পেলাম, অনেক পুরুষবেশী লোক শূন্যে দÐায়মান রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে রুপার পাত্র। আরো দেখতে পেলাম, একদল পাখি আমার ঘরকে বেষ্টন করে আছে। আমি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম সব দেখতে পেলাম। আরো দেখতে পেলাম, তিনটি পতাকা। একটি পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তে স্থাপিত, অন্যটি পশ্চিম প্রান্তে এবং তৃতীয়টি কাবা ঘরের ছাদে। এমতাবস্থায়আমার প্রিয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হল। ” (হযরত ইবনে আব্বাস সূত্রে মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়া)
বিবি আমেনা আরো বলেন, “আমার প্রিয়পুত্র সাজদারত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হল। তারপর মাথা ঊর্ধ্বগামী করে শাহাদাত আঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করে বিশুদ্ধ আরবী ভাষা পাঠ করছে “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নি রাসূলুল্লাহ”(ইবনু সা’দ: আতত্ববক্বাত-০১/১০২)
সহীহ্ হাদীসসমূহে বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের সময় তাঁর মাতার উদর থেকে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয় যার দ্বারা পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম আলোকিত হয়ে যায়। এমনকি মা আমেনা মক্কা থেকে সিরিয়ার বুসরা শহরের দালানগুলোও দেখতে পান। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদারত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন এবং তখন তাঁর শাহাদাত আঙ্গুলী মুবারক আসমানের দিকে ছিল। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভূমিষ্ঠ হয়ে উভয় হাতের উপর ভর দেয়া অবস্থায় ছিলেন অতঃপর তিনি এক মুষ্টি মাটি তুলে আকাশের দিকে তাকালেন। (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)
একদিকে পৃথিবীতে নবুওয়াতের সূর্য প্রকাশিত হল, আর অন্য দিকে পারস্য রাজা কিস্রার রাজ প্রাসাদের ১৪টি গুম্বুজ ধসে পড়ল। পারস্যের শ্বেত উপসাগর একেবারে শুকিয়ে যায়, পারস্যের অগ্নিমÐপের হাজার বছরের প্রজ¦লিত অগ্নি স্বেচ্ছায় নিভে যায়, যা কখনও নির্বাপিত হয় নাই। (দুরুসুত্ তারীখুল ইসলামী লিল হাইয়াত পৃঃ ১৪, সীরাতে মোগলতাই পৃঃ ৫)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, সাদার্ন
বিশ্ববিদ্যালয়, খতীব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ