নবনির্বাচিত মেয়র মহোদয়ের নিকট নাগরিক প্রত্যাশা

26

আবু নাছের মুহাম্মদ তৈয়ব আলী

লেখার শুরুতে অভিনন্দন জানাতে চাই, নবনির্বাচিত নগর পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. রেজাউল করিম চৌধুরীকে। একইসাথে তাঁর সফলতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, নির্বাচিত মেয়র মহোদয়ের নিকট নগরবাসীর প্রত্যাশা অনেক। যেহেতু বিগত করোনার কারণে নির্বাচিত মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পেতে অনেক দেরী হয়েছে। ফলে মাঝখানে বিশাল গ্যাপ সমস্যাসঙ্কুল নগরে সমস্যার পাহাড় জমেছে। তবে বিগত ছয় মাসের জন্য নিযুক্ত প্রশাসক অতি কম সময়ে তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে আন্তরিক ভূমিকা পালন করে দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে কাজ করতে হয়-কাজ আদায় করতে হয়। বিগত প্রশাসক সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হওয়ায় তিনি কোনরূপ পিছুটান ছাড়া দলমত নির্বিশেষে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে তার কাজে গতি ছিল। যাই হোক বর্তমান নব নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের সমীপে কিছু প্রত্যাশা পেশ করবো। প্রথমেই আমরা কামনা করবো একটি পরিচ্ছন্ন পরিকল্পিত দৃষ্টিনন্দন নগরী। দেশের অন্য জেলা থেকে যদি কেউ চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে নেমে নিউ মার্কেট হয়ে নগরীতে প্রবেশ করে, দেখতে পাবে প্রতিটি ফুটপাত হকারের দখলে এমনকি যান চলাচলের জন্য নির্মিত সড়কের একাংশ দখল করে চলছে রমরমা বাজার। শার্ট, প্যান্ট, গ্যাঞ্জি, জুতার মার্কেট। অথচ এসব ভাসমান হকারের পাশেই রয়েছে বড় বড় মার্কেট ও ঐতিহ্যবাহী আধুনিক বিপনী বিতান। হকারদের এ দৌরাত্ম্য শুধু রেলস্টেশন, নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত বা সড়কে নয় পুরো নগরজুড়ে একই অবস্থা। এককথায় নগরীর সবকটি মোড়, সড়ক ও ফুটপাত ভাসমান হকারদের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, এসব হকার থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করে থাকে কতিপয় ব্যক্তি ও পুলিশ। এখাতে লাখ-লাখ টাকা আয় হয়। তবে সিটি কর্পোরেশন বা সরকার বড় অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব হকারকে যদি পরিকল্পিতভাবে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন করা যায় তাহলে ভাসমান হকার মুক্ত হবে। সুলভমূল্যে একটি ভাড়া আদায় করে কর্পোরেশনের আয়ও বর্ধিত করা যাবে। নগর ভবন সংলগ্ন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের প্রধান গেইট থেকে শুরু করে বক্সির বিট পর্যন্ত ভাসমান হকারদের অস্থায়ী দোকানে (অনেকটা স্থায়ীর মত)পরিপূর্ণ এতে মুসল্লিদের মসজিদে যাতায়াত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে পুলিশ এদের উচ্ছেদ করলেও পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবার দখলে নিয়ে নেয়। বিদ্যমান সড়ক ও ফুটপাত হকার মুক্ত করলেই পরিচ্ছন্ন নগরে রূপ পাবে এবং নগরবাসী স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবে।
নগরীর চারপাশ থেকে নগরবাসীর আসা যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিতে গণপরিবহনের রুটগুলোর পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। এজন্য পুলিশ প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একটি স্ন্দুর সুশৃঙ্খল নগর বাস্তবায়ন ও নগরবাসীর সার্বিক সেবা দানে নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর গণের সমন্বিত ও আন্তরিক ভূমিকা রাখতে হবে। নগরের কিছু কিছু ওয়ার্ড অত্যন্ত সুন্দর সাজানো গোছানো। পরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন চোখে পড়ে। অন্যদিকে কিছু কিছু ওয়ার্ডের রাস্তার পাশে সড়কের প্রান্তে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। সড়কগুলো ও সড়ক পার্শ্বের নালাগুলো আবর্জনার স্তুপে পরিণত। ওয়ার্ডবাসী নির্বাচিত কাউন্সিলরদের থেকে নিয়মিত সেবা সহযোগিতা পান না। তাই নগরের প্রত্যন্ত এলাকার সমস্যাগুলো মেয়র মহোদয়ই সমাধান করবেন তা-না স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণও সচেতনতার সাথে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করলেই নগরবাসী প্রত্যাশিত সেবা পাবেন।
নাগরিকদের অন্যতম সমস্যা হলো নগরবাসী বিভিন্ন সময় পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে, এটা স্বাভাবিক। এসব বিরোধ নিষ্পত্তি কল্পে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিরপেক্ষ ভূমিকা কামনা করে। তাই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি কল্পে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের পারিবারিক আদালত গঠনের উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন। কারণ এসব বিরোধ মিমাংসার জন্য যদি থানা পুলিশ ও আদালতের উপর নির্ভর করতে হয় তাহলে জনগণ সুষ্ঠু, সৎ ও ন্যায় বিচার হতে বঞ্চিত হবে। যেহেতু থানা-পুলিশ-আদালত এসব দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপার। তাই প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটি জুরিবোর্ড গঠন করে জনগণের বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রয়োজনে অতি গুরুতর বিরোধ সমূহ যেগুলো সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে নিষ্পত্তি অসম্ভব ঐগুলো সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট’র উপস্থিতিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও প্রত্যেক ওয়ার্ডে কিশোর গ্যাং নিরীহ জনগণকে প্রতিনিয়ত হয়রানী করে থাকে এর সাথে মাঝেমধ্যে যুক্ত হয় থানা পুলিশের কিছু অপরাধপ্রবণ সদস্য, বিশেষত গার্মেন্টস চাকুরিরত নারীরা এদের উৎপাত আক্রমণ ও জ্বালাতনের শিকার। এসব সমস্যায় ভুক্তভোগী জনগণ সমাজপতি কিংবা এলাকার মুরব্বিদের কাছে বিচার চেয়েও বিচার পায়না। যেহেতু বর্তমান সমাজের মুরব্বিও সমাজ পতিরা এসবকে উটকো ঝামেলা মনে করে থাকে। তাই নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে এসব বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রয়োজনে মাননীয় মেয়র মহোদয়ের তত্ত¡াবধানে নগরীর প্রত্যেক ওয়ার্ডে যোগ্য সমাজপতি সমাজ কমিটি নির্বাচন করা যেতে পারে, যারা সমাজের অন্যায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ও নির্মূলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা দেবেন।
নগরীর জলাবদ্ধতা একটি পুরনো সমস্যা। দেখা গেছে নগরে অবস্থিত সড়ক পার্শ্বের নালা নর্দমাগুলো বিগত ত্রিশ বছর পূর্বে যা ছিল বর্তমানে ও তা অথচ নগরে বাড়ী ঘর বেড়েছে পূর্বের চেয়ে কয়েকগুণ। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়মিত নালা নর্দমা পরিষ্কার হয় ঠিক, কিন্তু বিদ্যমান নালাগুলো বর্তমান সময়োপযোগী আরো বড় করা না হলে নগরের অলিতে গলিতে জলবদ্ধতা থেকেই যাবে। তাই স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণ নিজ নিজ এলাকার নালা নর্দমাগুলো বর্তমান সময়োপযোগী করার বিষয়ে একটি বিশেষ পরিকল্পনা পেশ করে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন। নালা নর্দমা গুলো দ্রুত ভরাট হয় পলিথিন ব্যবহারের কারণে। পলিথিন নগরবাসীর জন্য বর্তমান মারাত্মক ক্ষতিকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিথিন ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ খুবই জরুরি। আমরা আশা করবো নবনির্বচিত মেয়র মহোদয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এ পলিথিন বন্ধে জোর প্রচারণা চালাবেন নগরবাসীকে পলিথিন ব্যবহার না করতে উৎসাহিত করবেন। বিকল্প পাট’র ব্যাগ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবেন। নগরবাসী বিদ্যুৎ, ওয়াসা, সিডিএর নকশা, নকশা বহির্ভূত স্থাপনাসহ প্রতিনিয়ত বহু সমস্যার সম্মুখীন হন। এসব সমস্যা লাঘবে অন্তত একটি তরিৎ নির্দেশনা যদি কাউন্সিলরগণ নেন, তাহলে নগরবাসী হয়রানী মুক্ত জীবনযাপন করতে পারবে।
বিভিন্ন উদ্ভুত সমস্যায় নগরবাসী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশে পেতে চাই। নগরবাসী কাঙ্খিত সেবা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে নির্ধারিত ট্যাক্স দেবে হাসি মুখে। তাই মাননীয় মেয়র মহোদয় এসব বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ের মাধ্যমে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসবেন এ প্রত্যশা রাখি।

লেখক : সহ-সম্পাদক, মাসিক তরজুমান