নদী শাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

1

 

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার যে অবস্থা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও হালদার অবস্থা একই। এক প্রকারের ভূমিদস্যু ও স্বার্থান্বেষী দুর্নীতিবাজ দেশের নদীগুলোর উপর তাদের অবৈধ দখলের নীলনক্সা বাস্তবায়নে তৎপর। নদীমাতৃক বাংলাদেশে তিন শতাধিক নদী-উপনদী প্রবহমান। যে সকল নদীর পাশে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে সেখানে নদীর চর এবং নদী অববাহিকায় এক শ্রেণির সুবিধাবাদী লোক চর দখল করে। আবার কখনোবা নদী ভরাট করে নদীর প্রকৃতি ধ্বংসের খেলায় মাতে। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক সুবিধাবাদী এবং ভূমিদস্যুরা এর সাথে জড়িত। যা আমরা দেশের বিভিন্ন নদী বিষয়ে পত্রপত্রিকার সরেজমিন অসংখ্য প্রতিবেদন হতে জানতে পারি। বাংলাদেশে বহমান নদীসমূহ এদেশের জলবায়ু, পরিবেশ এবং কৃষি অর্থনীতির জন্য খুবই জরুরি। এদেশে প্রথমে সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পূর্বে নদী ও সমুদ্র পথে দেশের মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভরশীল ছিল। যে জন্য নদীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে গঞ্জ ও নদী বন্দরসমূহ। বন্দর ও গঞ্জকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জ, খাতুনগঞ্জের মতো বাণিজ্যকন্দ্র গড়ে উঠেছিল এদেশে। যুগ যুগ ধরে এদেশে নদী ও সমুদ্র বন্দরগুলো দেশের অর্থনীতিতে নিরন্তর ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ¯েøাগানের ভাষায় বলতে হয় ‘নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ।’ নদীসমূহের কারণে এদেশ খুবই সুজলা-সুফলা। দেশের কৃষিকে বাঁচাতে, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে নদীসমূহের নাব্যতা প্রয়োজন। নদীর বিশুদ্ধজল, মাছ এবং নদীর জীববৈচিত্র্য আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। এ সম্পদকে সচল রাখতে দেশের সকল নদীর ধারা প্রবহমান রাখা, পানি দূষণ হতে নদীর পানিকে মুক্তরাখা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নদীভরাট রোধ, নদী শাসন ইত্যাদি বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
বলাবাহুল্য যে, এদেশের অনেক নদী ভরাট হয়ে তার প্রবাহ হারিয়ে ফেলছে। আবার বহুনদী যথাযথ শাসনের অভাবে দু’কূলের অধিবাসীকে নিঃস্ব ও বাস্তুহারায় পরিণত করছে। নদীর উপর বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ নির্মাণের ফলে বহু স্থানে নদীতে বালির চর জাগছে। খর¯্রােতা নদীসমূহের ভাঙ্গন দেশের বিভিন্ন নদীকেন্দ্রিক জনপদের দুর্ভোগের প্রধান কারণ। এর ফলে দেশে নদী সিকস্তির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। নদী দেশের মানুষের উপকার করছে সন্দেহ নেই। কিন্তু নদী কোন কোন স্থানে মানুষের জীবনযাত্রাকে ধ্বংসও করছে। সুতরাং নদীসমূহের লালন ও শাসন দু’দিকেই সরকার ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক নজরদারির বিকল্প নেই।
চট্টগ্রামের হালদা নদীতে কলকারখানার বর্জ্য পড়ে পানি দূষণের কারণে হালদার জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখিন। ভূমিদস্যুরা হালদা ভরাট করে বিভিন্ন স্থানে ছোট করে ফেলছে। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের নদী হালদা রক্ষা বিষয়ে পত্রপত্রিকায় বহু প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। হালদাকে রক্ষায় আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি।
সরকারি জরিপ কার্যক্রমে দেশের নদীগুলোর দৈর্ঘ্য প্রস্থ, আয়তন নির্ধারিত থাকে। প্রাকৃতিকভাবে নদী তার দিক পরিবর্তন করে বাঁক পরিবর্তন করে। একূল ভেঙ্গে ওকূলে চর গড়ে তোলে। এ প্রক্রিয়ায় স্বার্থান্বেষি মানুষ নদীর জায়গা দখলে মত্ত হয়। বাংলাদেশের সকল নদী ও তার জায়গার মালিক সরকার। সরকারি এই সম্পত্তি যারা অবৈধভাবে দখল করে অর্থবিত্তের মালিক হতে চায় তারা আইনত অপরাধী। তাদের এই অপতৎপরতা রোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু নানা কারণে নদীর ভূমি দখলকারী অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে যুগ যুগ ধরে অনেকে এই সরকারি সম্পত্তি দখলে রেখে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়।
দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার এক প্রতিবেদন হতে জানা যায় চাক্তাই খালের মোহনা এলাকয় কর্ণফুলীর চরের জায়গা অবৈধ দখলদাররা দখল করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, আড়ৎ, মার্কেট ইত্যাদি নির্মাণ করে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক হচ্ছে। এগুলো কারা করে, কিসের জোরে করে, কোন অপকৌশল অবলম্বন করে অর্থ রোজগার করে তা অস্পষ্ট নয়। টাকার জোরে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারিতার ছত্রছায়ায় এসব হয়ে থাকে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় পদক্ষেপের অভাবে এই সকল ভূমিদস্যু পার পেয়ে যায়। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ দখল উচ্ছেদের সরকারের যে দৃঢ় পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে তা জেনে স্থানীয় জনগণ কর্ণফুলীর তীরে চাক্তাই অঞ্চলের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ব্যাপারে আশাবাদি। কর্ণফুলী দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। এ নদীতেই চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর অবস্থিত। সরকারি রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ যোগান দেয় কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দর। অথচ কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা স্বাভাবিক নেই। আবার নদীর চরসমূহ অবৈধ দখলদারদের হাতে জিম্মি। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে কর্ণফুলীর ড্রেজিং কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি চাক্তাই খালের মোহনাসহ কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা সকল অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীকেন্দ্রিক সরকারি এই সম্পত্তি হতে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা জরুরি। দেশের সম্পদ এক শ্রেণির সুবিধাবাদীরা লুটেপুটে খাবে এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। চট্টগ্রাম শহরের সাথে লাগোয়া কর্ণফুলী নদীর তীরের সকল স্থাপনা উচ্ছেদে মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রীর নির্দেশনাকে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ স্বাগত জানায়। এইভাবে দৃঢ়তার সাথে সরকারি সম্পত্তি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পরিকল্পিতভাবে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হলে দেশ দ্রæত অর্থনৈতিক সাফল্যের পথে আরো এগিয়ে যাবে।